চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরূ : জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য উন্নত টেকসই স্যানিটেশন ব্যবস্থা একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করতে হলে সবার জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দেশব্যাপী স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকারের প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে প্রতি বছর অক্টোবর মাসকে ‘জাতীয় স্যানিটেশন মাস’ হিসেবে উদ্যাপন করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২৮ জুলাই, ২০১০ সালে পানি ও স্যানিটেশনকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করে।
শুরু হয়েছে জাতীয় স্যানিটেশন মাস। পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সেক্টরের সকল কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন। স্যানিটেশন ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে সরকার জাতীয় স্যানিটেশন টাস্কফোর্স গঠন করেছে। জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে টাস্কফোর্স কাজ করছে। ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর অক্টোবর মাসকে ‘জাতীয় স্যানিটেশন মাস’ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে দেশব্যাপী উদযাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘের আহ্বানে ১৫ অক্টোবর দিনটি সমগ্র বিশ্বের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বাংলাদেশও ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’ পালন করে। এ বছর জাতীয় স্যানিটেশন মাস ২০১৮ এর মূল প্রতিপাদ্য হলো, ‘টেকসই উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন’ এবং বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস ২০১৮ এর মূল প্রতিপাদ্য হলো, ‘হাত ধুবো নিয়মিত, থাকবো স্বাস্থ্যসম্মত’।
প্রতি বছরের মত এবারও স্যানিটেশন মাস ও হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশব্যাপী পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সহকারী সংস্থা হিসেবে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া অন্যান্য সংস্থার মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে, যা এ সেক্টরের উন্নয়নে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-৬ বাস্তবায়ন সম্পর্কিত জাতিসংঘের হাইলেভেল প্যানেলের সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। এসডিজি বিশেষ করে পানি ও স্যানিটেশন সেক্টরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সেক্টরে বিদ্যমান জাতীয় নীতিমালা, কৌশলপত্র এবং নির্দেশিকায় হতদরিদ্র, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ক্ষতিগ্রস্থ ছিন্নমূল ও ভাসমান দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সমধারায় আনাসহ টেকসই উন্নয়নের মৌলিক বিষয়গুলোতে কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে এ ব্যাপারে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে ৬৭ ভাগ মানুষের কাছে উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেখানে অর্জিত হয়েছে ৬১ ভাগ। উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০০৩ সালে ৪২ ভাগ মানুষ উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ করত, ২০১৭ সালে তা প্রায় শূণ্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে দেশে সব মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। স্যানিটেশন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ সাফল্য আজ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।
২০১৪ সালে পরিচালিত জাতীয় হাইজিন জরিপ থেকে দেখা যায়, দেশের ৮৪ ভাগ বিদ্যালয়ে উন্নত টয়লেট আছে এবং ৩৫ ভাগ বিদ্যালয়ে পানি ও সাবানসহ হাত ধোয়ার সুবিধা রয়েছে। বিদ্যালয়ে ৪০ ভাগ ছাত্রী পিরিয়ডকালীন প্রতিমাসে তিনদিন ক্লাসে অনুপস্থিত থাকত। স্কুলের ছাত্রীদের কাছে স্বস্তি নিয়ে এসেছে ‘নোরা আপা’। ‘নোরা আপার’ মাধ্যমে ছাত্রীরা স্কুলকালীন প্রয়োজন মত হাতের কাছেই পাচ্ছে সেনোরা স্যানিটারি ন্যাপকিন। ২০১৭ সালে প্রথম এই উদ্যোগ শুরু হয়। প্রথমে ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহীসহ ৮টি জেলায় ১৩৮টি স্কুলে ‘নোরা আপা’ চালু হয়।
প্রতিটি স্কুলে একজন নারীকর্মী বা আয়ার কাছ থেকে প্রয়োজনের সময় পাওয়া যাবে সেনোরা স্যানিটারি ন্যাপকিন। তিনি মানসম্মতভাবে সংরক্ষণ করেন ও ছাত্রীদের কাছে নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করেন। এই উদ্যোগটির নামই ‘নোরা আপা’। বেসরকারি একটি সংস্থা পরিচালিত নোরা আপা চালুর পরপরই ব্যাপক সাড়া পড়ে। এ ধরনের বেশ কিছু সরকারি বেসরকারি প্রকল্প দেশব্যাপী কাজ করছে। স্কুলগামী ছাত্রীদের সঠিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন তথা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশরুম ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। ২০১৫ সালে এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন অর্জন করতে হলে অবশ্যই পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ইতিমধ্যে এ ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে উপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক অনুমোদন করেছে এবং এ ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজও এগিয়ে চলেছে। কিশোরী ও নারীদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও বিদ্যালয় ভিত্তিক স্যানিটেশন ব্যবস্থার বাস্তবায়নে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা প্রদান করেছে সরকার। পর্যায়ক্রমে যানবাহন, বাজার ও কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুবিধাকে অন্তর্ভূক্ত করে নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক স্যানিটেশন ও হাইজিন সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
জাতিসংঘ ২০১৬-২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ঘোষণা করেছে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিচর্যার পর্যাপ্ত ও সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের হার শূণ্যের কোটায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী ও কিশোরীদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৬ এর অন্যতম লক্ষ্য হল- সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন : সবার জন্য পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ। পৃথিবীর সকল মানুষের নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য সুপেয় পানির প্রাপ্যতা থাকতে হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। সরকার এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, এনজিও, গণমাধ্যম, বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী এবং সাধারণ জনগণের সমন্বয়ে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি চমৎকার অংশীদারিত্বমূলক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দূর্যোগজনিত স্যানিটেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহযোগী সংস্থা ও এনজিও সমূহের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিতকরণে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বদ্ধপরিকর। জাতীয় স্যানিটেশন মাস উদ্যাপনের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এ সামাজিক আন্দোলন আরও জোরদার ও বেগবান হবে। পাশাপাশি এসডিজি অর্জনে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ আরো একধাপ।
লেখক : প্রাবন্ধিক


