জামিআ ইকরার খতমে বুখারী ও মানুষ হওয়ার গল্প
মুহাম্মাদ আইয়ূব : জামিআ ইকরা বাংলাদেশ। যে কেউ শুনলে বলে মাদ্রাসা, দ্বীনী প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ইত্যাদি ব্যস। কিন্তু আমি আমার প্রিয় জামিআ ইকরাকে চিনি একটু ভিন্নভাবে। মাদ্রাসা বা দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের কোন অভাব তো এ দেশে নেই, নেই-ই! তার উপর যেখানে দরকার নেই সেখানেও অভাব নেই। বাসা, বাড়ি, হাফ ফ্ল্যাট, ফুল ফ্ল্যাট, অর্ধ বাড়ি, ফুল-বাড়িতে আকর্ষণীয় ডিজিটাল ব্যানারে মক্কী মাদানি বদরী উহুদী নেসাবে এক বছর দুই বছর পাঁচ বছর মেয়াদে হাফ ডে, ফুল ডে, দিবানিশি বালকবালিকা, পুরুষ মহিলা মাদ্রাসা চলছে মাশাল্লাহ। তবে আমার চোখে দেখা জামিআ ইকরা একটু ব্যতিক্রমধর্মী ও ভিন্নতর।
জামিআ ইকরার ছয় বছরের ইতিহাসে আমি দেখলাম দেওবন্দি চেতনা কাকে বলে। জামিআ ইকরার কথা বলতে গেলেই অটোমেটিক যে নামটি সামনে চলে আসে তিনি হলেন ইকরার প্রাণ পুরুষ আমাদের বড় হুজুর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ( দা:বা:)। তাঁর ও জামিআ ইকরার সাথে স্বজাতির চরম বিদ্বেষ আর বৈরী মনোভাব থাকা সত্ত্বেও বিখ্যাত মাদানি পরিবারের সম্মানিত সদস্যরা ও দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম প্রতিবছর ইকরায় আসা বড় হুজুরের সাথে তাঁদের গভীর আন্তিরকতা শ্রদ্ধা, তাঁদের মাসকে মাস ইকরায় হাদিসের দরস দেওয়ার সুবাদে আমরা বড় হুজুরকে চিনেছি একটু ভিন্নভাবে। জামিআ ইকরায় পড়ার সুবাদে বড় হুজুর ও জামিআর আসাতিযায়ে কেরাম থেকে শিখেছি বড়দের ইজ্জত করা তাঁদেরকে হেয় না করা । উম্মতের জন্য পাগল হওয়া, না জেনে শুনে মুসলমানদের নাস্তিক মুরতাদ বলে মুসলমানদেরই মাঝে বিভেদ না করা, জিহাদের মত পবিত্র ইবাদাতকে জামাতিদের মত ভুলভাল ব্যখ্যা দিয়ে উম্মতের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি না করা, উম্মতকে এক ও নেক বানানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা। হকের মশাল নিয়ে আকাবিরে দেওবন্দের মত গঞ্জে গঞ্জে ছুটে বেড়ানো। সাহস থাকে তো বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, বাংলাদেশে এমন কয়টি প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে এমন শিক্ষা দেয় বা শিক্ষা দিয়ে তা কাজে রূপান্তর করা হয়! অথচ আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব এদেশে কীভাবে আল্লামাতুদ দাহাররা কোমলমতি শিশুদের নিষ্পাপ অন্তরগুলো হিংসা বিদ্বেষ দিয়ে ভরিয়ে দেয়; তাও আবার একজন বুজুর্গ মজলুম আলেমেদ্বীনের নামে। এমন প্রতিষ্ঠানের অভাব এ দেশে নেই।
সব অভিযোগ মাওলায়ে কারীমের দরবারে। মাদানী পরিবারের সম্মানিত সদস্যরা বা উলামায়ে দেওবন্দ এদেশে এলে সব হুজুরকেই শ্রদ্ধা করেন বলে কেউ কেউ বলতে পারেন, তবে দেওবন্দে যেয়ে এ দেশের সব বড় বড় হুজুররা রাজকীয় আতিথেয়তা পান একথা বলার সাহস আছে? হ্যাঁ, আমার আছে। ২০১৬ সাল, আমি তখন দেওবন্দে পড়ি। আমাদের বড় হুজুর, বড় সাহেবযাদাসহ হুজুরের সাথীরা দেওবন্দে এলেন। সাইয়্যেদ মাহমুদ মাদানী সাহেব তাঁর বাড়ির অভ্যন্তরে খাস কামরায় বড় হুজুরকে রাখলেন। প্রত্যেক বেলা হুজুরের জন্য রাজকীয় খাবারের ব্যবস্থা করলেন। সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী দা.বা., শায়খে সানী আব্দুল হক্ব আজমী রহ., ও রিয়াসাত আলী বিজনুরী রহ.গণ দেওবন্দের মাটিতে আমাদের বড় হুজুরকে যেই বিরল অভিধায়ে সিক্ত করলেন তাতে আমি আমার কানকে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হচ্ছিল যে, আমি এই মহান শায়খের, এই সম্মানিত শায়খের মাদ্রাসার নগন্য ছাত্র!
আলহামদুলিল্লাহ, ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ। ১৩ মার্চ ২০২০ শুক্রবার সন্ধ্যায় আমাদের প্রিয় জামিআ ইকরা বাংলাদেশের খতমে বুখারী। শুক্রবারের দোআ মাহফিলের মধ্য দিয়ে জামিআ তাঁর দশম বছর পূর্ণ করবে। জামিআর এ দীর্ঘ চলার পথে যে সব মহান মানুষরা জামিআর সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জামিআর সাহায্য করেছেন করে যাচ্ছেন আল্লাহ তাআলা সবাইকে কবুল করুন। দুনিয়া ও আখেরাতে ভরপুর কামিয়াবি দিন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


