পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : জামিয়া ইকরা বাংলাদেশের সিনিয়র মুহাদ্দিস, বাড্ডা মসজিদে মদীনার খতিব মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান বলেন, ভারতের রাজধানী দিল্লির সহিংসতাকে ঘিরে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, গাযওয়ায়ে হিন্দের ডাক দেয়া, জাল হাদিসের আশ্রয় নিয়ে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, সাম্প্রদায়িকতার বিষ সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়।
দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে একথা বলেন তিনি। “সাম্প্রদায়িকতা নয়, চাই মানবিক বিশ্ব” স্লোগান নিয়ে এই মানববন্ধনের আয়োজন করে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা
তিনি বলেন, ভারতে ও চীনের উইঘুরে মুসলমানদের উপর নির্যাতন নীপিড়নের আমরা ঘোর প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই। কিন্তু প্রতিবাদের ক্ষেত্রে আমরা যেন সীমালঙ্ঘন না করি সেদিকেও সবিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। দিল্লির সহিংসতাকে কেন্দ্র করে অনেকেই সাম্প্রদায়িকতার বিষ সমাজে ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছে। তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা করছে। তাদেরকে আমাদের রুখে দিতে হবে। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে।
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান ক্ষমতাসীন ভারত সরকারকে মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর সাম্প্রদায়িক শান্তি-সম্প্রীতি সৌহার্দ্য রক্ষার পলিসি অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা ভারত উপমহাদেশের শান্তিকামী মানুষের শান্তি-সম্প্রীতি সৌহার্দ্য রক্ষার লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সেভাবে সম্প্রীতি সৌহার্দ্য রক্ষায় আপনারাও এগিয়ে আসুন।
এছাড়াও শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত উপমহাদেশের শান্তিকামী মানুষের শান্তি-সম্প্রীতি সৌহার্দ্য রক্ষার লক্ষ্যে রাষ্ট্র-রাজনীতির সাথে ধর্ম কোথায় থাকবে তা রাষ্ট্র-রাজনৈতিক পর্যায়ে একাত্ম হয়ে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত।
মানববন্ধনে রানা দাশ গুপ্ত বলেন, বেদনাবিধুর চিত্তে এখানে আজ উপস্থিত হয়েছি। অতি সম্প্রতি ভারতের নয়া দিল্লীতে যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছে আমরা বাংলাদেশের মানুষ কি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ কি খ্রিস্টান ঐক্যবদ্ধভাবে এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাই। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে ফেরার পথে নয়া দিল্লী বিমানবন্দরে নেমে ইন্দিরা গান্ধীকে পাশে নিয়ে বলেছিলেন, আমাদের সাথে আপনাদের যে সম্পর্ক তা ভ্রাতৃত্বের মিল, আদর্শের ও জনগণের মিল। কিন্তু আজকে স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে দাঁড়িয়েও লক্ষ্য করছি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র-রাজনীতির ক্রমাগত বিচ্যুতি ঘটেছে। সেখান থেকে আমরাও মুক্ত হতে পারিনি।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ধর্মীয় রাজনীতি রেখে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশের সংবিধান পাকিস্তানি আদলে শুধু নিয়ে যাওয়া হয়নি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নিষিদ্ধের অনুচ্ছেদ পর্যন্ত বিলোপ করা হয়েছে। যা আজও তা সংবিধানে সংযোজন করতে পারিনি। আজকে নয়া দিল্লীর দিকে তাকিয়েও ভিন্নতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যে ভারতবর্ষের জনগণ মহাত্মা গান্ধীকে জনক হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। সেই মহাত্মা গান্ধীর খুনি নাথুরাম গডসের নামে ভারতে ১৮০ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্য নির্মিত হচ্ছে। অর্থাৎ আজকে ভারতে একদিকে মহাত্মা গান্ধী, আরেকদিকে নথুরাম গডসের প্রেতাত্মারা। ভারতের রাজনীতিকে তারা দূষিত করতে চায়।
তিনি আরও বলেন, নয়া দিল্লীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাতে বাংলাদেশ কেউ সাম্প্রদায়িক সহিসংতা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস রাখতে হবে। নয়াদিল্লীর সহিংসতার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশে যেন ভারতের মতো কোনোরকম সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেজন্য সবাইকে সজাগ, সতর্ক ও সচেতন ভূমিকা রাখার কথা বলায় আলেম সমাজকেও ধন্যবাদ জানান তিনি।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের বক্তব্যের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, দিল্লীর ঘটনা ভারতের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর বড় ধরনের আঘাত। ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা থাকলেও দিল্লীর ঘটনা তার বিপরীত ও অসঙ্গতিপূর্ণ। দিল্লীতে যখন সহিংসতা কম ছিল তখন পুলিশ নির্বিকার ছিল। এটা হয় পুলিশের অদক্ষতা নয়তো উদ্দেশ্যপূর্ণ নীরবতা। যেটাই ঘটুক না কেন ভারতের মতো রাষ্ট্রের জন্য তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চার আহ্বায়ক ব্যারিস্ট্রার তুরিন আফরোজের সভাপতিত্বে ও সমন্বয়ক এফএম শাহিনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য চন্দন সেন, অপরাজেয় বাংলার সভাপতি এইচ রহমান মিলু প্রমুখ।


