জ্ঞান চর্চাই মুসলমানদের এগিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার
চৌধুরী আতিকুর রহমান :: সাম্প্রতিক পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা ভোট হয়ে গেল। বলাইবাহুল্য এই ভোট পর্বে বিজেপির ভরাডুবি হয়েছে। বিজেপি যে দলিত, আদিবাসীদের দল নয় তা এই ভোট থেকে প্রমাণ হয়ে গেল। এটা কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রান্তিক মানুষেরও দল নয়। আমি সচেতনভাবেই বিজেপির মুসলিম বিরোধিতা্ উল্লেখ করলাম না। কারণ একমাত্র তেলেঙ্গানার কয়েকটি এলাকা ছাড়া মুসলিম ভোট খুব একটা প্রভাব ফেলে না। তাও হায়দরাবাদ কেন্দ্রিক সেই বিধানসভা এলাকাগুলির সাতটি আইমিমের দখলে গেছে। ছত্তিসগড়ের বস্তার জেলাটি ছাড়াও এই প্রদেশটি মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত এবং মুসলিম ৩ শতাংশের বেশি নয়। এই প্রদেশ ছাড়াও সংলগ্ন মধ্যপ্রদেশের মহাকোশল এলাকাটিও আদিবাসী অধ্যুষিত।
২০১৩-র ভোটে বিজেপি এই এলাকা থেকে ২৯ টি বিধানসভায় জিতে এসেছিল, কংগ্রেস জিতেছিল ১৩ টি। এবার ঠিক উল্টো ফল হয়েছে। কংগ্রেস পেয়েছে ২৮ টি বিজেপি ১৩ টি। অপর আদিবাসী এলাকা মালওয়া-নিমার ধরলে ৪২+৬৬=১০৮ টির মধ্যে ৪১ টি আসনে। মহাকোশল সংলগ্ন ছত্তিসগড়ে কংগ্রেসের জয় সর্বাপেক্ষা অধিক নির্ণায়ক। এমনকি রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ অপেক্ষাও। ছত্তিসগড়ে কংগ্রেস পেয়েছে ৬৮ টি বিজেপি ১৬ টি। এর থেকে প্রমাণ হয় মুসলিমরাই শুধু নয় আদিবাসী সহ প্রান্তিক মানুষরাও বিজেপির অন্তসারশূণ্য, বিভেদের রাজনীতির শিকার। মুসলিমদের উচিৎ হবে এই বঞ্চিত মানুষগুলিকে নিয়ে চলা। মুসলিমদের উঠতে-বসতে বিজেপি বিরোধিতা এই মানুষগুলির মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক করবে।
আফগানিস্থান, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন, ফিলিস্তিন সাম্প্রতিক চার-পাঁচটি স্থানে মুসলিম ও দখলদার বাহিনির মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। ইরাক অনেকটাই শান্ত হয়ে এলেও নিজভূমে পরবাসী হিসাবে ৭১.৭৫ লাখ রিফিউজি এখনও সেখানে তাঁবুতে বসবাস করছে। এই বিশালসংখ্যক মানুষের হারাবার কিছু নেই। তাই আপাত শান্ত ইরাক পুনরায় বিস্ফোরিত হবে এটা অবধারিত। সিরিয়ার স্বদেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে পড়া সোয়া দু কোটি জনতার অর্ধেক রিফিউজিদের ঘরে ফেরা আরও দুরূহ ব্যাপার। কারণ, তাদের ঘরবাড়ি, সম্পদ বাসার সরকার লুঠ করে নিজেদের পছন্দসই ধর্মমতের লোককে বসিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এ রকম তো হওয়ার ছিল না। আফগানিস্থান সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বহিরাগত ও অনারব দেশগুলি নাক গলিয়ে এদের যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে দিয়েছে। মানুষগুলি আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞা না বুঝেই ময়দানে নেমে পড়েছে। তার ফল ভোগ করছে। যুদ্ধের প্রস্তুতিতে আধুনিক সমরাস্ত্র বা যুদ্ধপদ্ধতি দরকার। তেমনই দরকার সবল ঈমানের। বদর যুদ্ধের ৩১৩ জন সাহাবির বিজয়লাভ ঈমানি শক্তিরই জয়ের ইঙ্গিত করে। বুকে হাত দিয়ে প্রতিটি সচেতন মুসলিম বলুক যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধ পদ্ধতি বা ঈমানি শক্তিতে মুসলিমরা প্রান্তিক মানুষ কি না? আফগানিস্থানে বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে যে টুকু জয়লাভ তা সামান্য পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র বা যুদ্ধ পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। বেশিরভাগই অটল ইমানের ফল।
ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ সন্ত্রাস, হত্যা, গুপ্তহত্যা ও দলাদলির শিকার। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মুসলিমরাই ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইমরানের ক্ষমতা পাওয়া ছাড়া কোন অবস্থাতেই বলতে পারছি না ওই দুটি দেশের সরকারে জনতা দ্বারা নির্বাচিত সরকার রয়েছে। বাংলাদেশে মুসলিমরা দেওয়ানবাগি, রাজারবাগি, জামাআতে ইসলামি, দেওবন্দি-কওমি, সালাফ বিভিন্ন দলে বিভক্ত। পাকিস্তানেও শিয়া, কাদিয়ানি, সুন্নি বিভিন্ন দলে সঙ্ঘাত বিদ্যমান। সবার উপরে রয়েছে ইসলামের নামে সন্ত্রাসে রত বিভিন্ন দল। এরা বাচ্চাদের স্কুলকেও রেয়াত করে না।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিকে বলা যেতে পারে ১৯৪৭-এর দেশভাগের শিকার। দেশভাগের আগে যেখানে মুসলিম ছিল ৩৪% বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১৭%-এ। দেশভাগের জন্যে জিন্না দা্য়ী না নেহরু-প্যাটেল দায়ী এই নিয়ে একটি অমিমাংসিত তত্ত্বের কচকচি চলেই আসছে। কিন্তু দেশভাগের বলি সাধারণ হিন্দু-মুসলিম। অথচ তারা দেশভাগের জন্যে দায়ী নয়। জিন্না ১৯৪০-এ দ্বিজাতিতত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ পাকিস্তান প্রস্তাবের সময় একবারও গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখেননি তামিল, তেলেগু, মালয়ালি, মারাঠি মুসলিমরা কোথায় যাবে। তারা তো উর্দুভাষী বা বাংলাভাষী নয়। ভারতে থেকে যাওয়া অল্পসংখ্যক মুসলিমদের কাছে দেশভাগের প্রথম নগ্ন আঘাত ১৯৪৯-এ বাবরি মসজিদের মিম্বরে রামলালার মূর্তি ঢোকানো। এরপর আর্থিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার জন্যে মিরাট, আহমেদাবাদ, কোয়েম্বাটোর, জামশেদপুর, ভাগলপুর দাঙ্গা হয়েছে।
দেখেছি দেশভাগের ফলে বাঙালির প্রবেশে স্বভূমে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভয়ে নেলি, বোড়ো দাঙ্গা। সব শেষে এনআরসি-র ভ্রূকুটি। দেখেছি গুজরাট দাঙ্গা এবং তাকে পুঁজি করে বহু চড়াই-উতরাই পার করে দিল্লির মসনদে বসা। গরু রক্ষার নামে মানুষ হত্যা এখন খবর হয়। গা জোয়ারি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে থানাতে ঢুকেও পুলিশকে মেরে ফেলা হচ্ছে। গা জোয়ারি করে বাবরি মসজিদ ভাঙা ও সেখানে রামমন্দির নির্মাণে অবস্থান বিপুল সংখ্যাগুরুত্বের ফলেই হচ্ছে। লাভ জেহাদ নামক উদ্ভট তত্ত্ব আমাদের খাওয়ানো হচ্ছে। তার জন্যে আইন-আদালতও হচ্ছে। এখন হাত পড়েছে জায়গার নামের উপর। আওরঙ্গজেব রোডের নামঁ পাল্টে যায়, মুঘলসরাই হয় দীনদয়াল, এলাহাবাদ হল প্রয়াগ। এসব মুসলিম অতীত ভুলিয়ে সাংস্কতিক আগ্রাসন ছাড়া আর কিছু নয়। এসব করছে, বিপুল সংখ্যাগুরুত্বের বলেই করছে। এই যে ডোন্ট কেয়ার ভাব তা এমনি এমনিই হয়ে যায়নি। বরং শ দুয়েক বছরের চক্রান্তের বহিঃপ্রকাশ।
এই ডোন্ট কেয়ার, গরম-গরম কথা, গা জোয়ারি এবং পিষে মেরে ফেলার তত্ত্বের বিপরীত কোন তত্ত্বটি কার্যকর হবে? নিশ্চয় গা জোয়ারি বা গরম কথা বলার তত্ত্বটি নয়। এমনকি মুসলিম দলগুলির কথায় কথায় রাস্তায় নেমে শক্তি প্রদর্শনের মধ্যেও অশনীসঙ্কেত পাচ্ছি। এ সব বার বার করলে মোদিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্যে প্রাপ্ত ৩৩%-এর বাইরের ৫০% হিন্দুও বিজেপির লাভ জেহাদ, মুসলিম সন্ত্রাস আর একদা ভারত মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হওযার তত্ত্বে বিশ্বাস করে ফেলতে পারে বলে মনে হয়। তা বলে প্রতিবাদ, মিটিং-মিছিল-জমায়েৎ হবে না? নিশ্চয় হবে, তবে বিজেপির ক্ষমতা বলয়ের বাইরে থাকা ৫০% হিন্দুকে সঙ্গে নিয়ে। তবে বেশি করে প্রতিবাদ হোক আদালতে, প্রতিবাদ হোক সাহিত্যে, সংস্কৃতি রক্ষার জন্যে প্রয়োজন আরও বেশি বেশি করে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা। লেখাপড়া করে সমাজে নিজের জায়গা করে নেওয়। আদালতই বাবরি মসজিদ মামলায়, গুজরাট দাঙ্গা, মালেগাও বিস্ফোরণ ইত্যাদি বিষয়গুলিতে কিছুটা হলেও ন্যায় দেওয়ার পথে।
রবিশকুমারের তত্ত্ব বলে একটা উপদেশাবলী কিছুদিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল। তাতে ছিল মুসলিমরা পাখির চোখ করুক শিক্ষাকে, জ্ঞানচর্চাকে। এই তত্ত্বের বাস্তব কয়েকটা উদাহরণ দিই। পার্শি ও শিখদের কোনক্রমেই বলা যেতে পারে না তারা মুসলিমদের থেকে সংখ্যাগুরু। বরং শিখ হল ২% পার্শি ১%-এরও নিচে। ১৯৮৪-তে শিখ দাঙ্গার পর শিখরা তাদের পদবলে বিচার আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু মুসলিমরা কোন দাঙ্গা দূর অস্ত বাবরি মসজিদের মত ঐতিহাসিক কাঠামো ভাঙার বিচারই পেল না। এর কারণ হচ্ছে ২% শিখ ২০% সামরিক পদগুলি দখল করে বসে আছে। সরকারি উচ্চপদেও তারা আসীন। ৫ টি পরমবীরচক্র, ৪০ টি মহাবীরচক্র ও ২০৯ টি বীরচক্র শিখদের ঝুলিতে। নেতাজির আইএনএ-র ৪২ হাজার ফৌজের ২৮ হাজারই ছিল শিখ। পাঞ্জাব ভারতের ৫১% গমের সরবরাহকারী, চালও র্পর্যাপ্ত দেয়।
এ হেন শিখদের প্রভাব কোনদিনই খর্ব হওযার নয়। একইভাবে বলা যায় পার্শিজাতিভুক্ত টাটা ও বোম্বে ডাইং-এর ওয়াদিয়াদের ক্ষেত্রে। দেখে শুনে মনে হয় বাণিজ্যিক রাজধানী পুরনো মুম্বাইয়ের অর্ধেকই পার্শিদের। পার্সিদের সকলেই টাটা-ওয়াদিয়া না হলেও এরা ব্যবসা-বাণিজ্যে এতোটাই প্রভাবশালী যে এদেরও কেউ ঘাঁটাতে সাহস পায় না। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের সংখ্যা ইসরায়েলে থাকা ইহুদিদের তুলনায় বহু বেশি। এদের সংখ্যা যতই কম হোক এরাই বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। রথসচাইল্ড পরিবার রয়টার, এপি সংবাদসংস্থার মালিক। তারা তাদের পছন্দসই খবর বিশ্বকে গেলায়। অথচ খোদ ইসরায়েলে ইহুদিরা ক্রমহ্রাসপ্রাপ্ত। ইসরায়েলে এখনও ১৮% মুসলিম বাস করে, ইহুদি ৭৫%। অথচ ১৯৫০-এ মুসলিম সংখ্যা ছিল মাত্র ৮.৫%, ইহুদি ৮৮%। অপর ধর্মীয় গোষ্ঠীর তুলনায় ইসরায়েলেও মুসলিমদের বৃদ্ধি হার বেশি। ইসরায়েলি মুসলিমরা ক্রমাগত বেশি সংখ্যায় স্কুল-কলেজ মুখি। তারা বুঝে গেছে এই মুহূর্তে লড়াই হল সুশীল সমাজে নিজের জায়গাটুকু করে নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক হতে হবে।
অষ্টম শতকে বাগদাদে জ্ঞান চর্চার জন্যে প্রতিষ্ঠিত হল বাইতুল হিকমা। ফতেমা আল ফিহরি হলেন সেই জ্ঞানী নারী যে মরক্কোর ফেজে নবম শতকেই বিশ্বের প্রথম খেতাব দানকারী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। মিশরের আল আজহার স্থাপিত হল দশম শতকে। স্পেনের কর্ডোবায় প্রতিষ্ঠিত হল বিদ্যালয়, জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র, গ্রন্থাগার। বাগদাদে একাদশ শতকে প্রতিষ্ঠিত হল নিজামিযা মাদ্রাসা। বাগদাদ ধ্বংসের পর ত্রয়োদশ শতকে মারাগেহতে প্রতিষ্ঠিত হল মারাগেহ মানমন্দির। চতুর্দশ শতকে ফিরোজ শাহ তুঘলক দিল্লিতে প্রতিষ্ঠিত করলেন তুঘলক মাদ্রাসা। পঞ্চদশ শতকে সমরখন্দে উলুঘ বেগের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হল মানমন্দির ও মাদ্রাসা।
যতদিন মুসলিমরা জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক চর্চা করেছিল ততদিন বিশ্বকে অনেক কিছুই দিয়েছিল। সবার উপরে বিশ্ব তার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল। এখনকার হিসাব হল মুসলিম দেশগুলি একত্রে যত গবেষণাপত্র প্রকাশ করে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলি এককভাবে তার থেকে বহু বেশি প্রকাশ করে। তাই মুসলিমরা সংখ্যায় ২য় বৃহত্তম হলেও (১৬০ কোটি) ধার ও ভার তলানিতে এসে ঠেকেছে। তাই সংখ্যাগুরু হওযা সত্ত্বেও আফগানিস্থান, ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তানে মার খেয়ে মরছে। আর ভারতে সংখাগুরু ইতিহাস, সংস্কৃতি ভুলিয়ে পিশে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে। এর উত্তর আরও বেশি বেশি করে বিদ্যাচর্চা, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতি চর্চা।
লেখক : কলামিস্ট
পশ্চিম বঙ্গ থেকে


