আদিল মাহমুদ ● স্রষ্টার সৃষ্টি এই সুন্দর পৃথিবীকে যারা কিছু দিতে পেরেছেন ভারতবর্ষ ও বিশ্বের মুসলমানদের জন্য যারা কিছু করেছেন। ইতিহাসের পাতায় তারা চির অমর হয়ে আছেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। তিনি ছিলেন সফল একজন ব্যক্তিত্ব, একজন সুপরিচিত বুদ্ধিজীবী কবি, লেখক, সাংবাদিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, চিন্তাবিদ, সক্রিয় রাজনীতিবিদ, মন্তব্যকারী, জাতীয় নেতা, ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। তার জ্ঞান-গরিমা বুদ্ধিমত্তার কারণে তাকে ইমামুল হিন্দ উপাধি দেয়া হয়েছিল।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রকৃত নাম মহিউদ্দীন আহমদ। লেখক হিসেবে তিনি আজাদ নামেই পরিচিত হয়েছেন। ১১ নভেম্বর ১৮৮৮ ইংরেজিতে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা ছিলেন একজন আরবীয় এবং পিতা মওলানা খায়র উদ্দীন ছিলেন আফগান বংশোদ্ভূত বাঙালি মুসলমান। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব-এর সময় খায়রউদ্দীন ভারত ছেড়ে মক্কায় চলে যান এবং সেখানে বসবাস করতে থাকেন। ১৮৯০ সালে তিনি সপরিবার কলকাতায় ফিরে আসেন।
আরবি মাতৃভাষা হওয়ায় এবং ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠ ও দৃঢ় বিশ্বাসী পারিবারিক পটভূমির কারণে প্রচলিত ধারায় নিজেকে একাত্ম করতে পারেননি তিনি। তবে ইসলামী শিক্ষাচর্চা ছাড়া আজাদের অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। মাওলানা আজাদ তাঁর পিতার কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন এবং তার মা ছিলেন তার নৈতিক ও ধর্মীয় প্রশিক্ষণদাতা। প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষা লাভ না করলেও ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়ন ও ব্যাপক পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে তিনি উর্দু, ফারসি, হিন্দি ও ইংরেজিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তার সময়ের অনেক যশস্বী ব্যক্তিদের মতো তিনিও নিজ চেষ্টায় শিক্ষিত হওয়ার পথ অনুসরণ করেন এবং বিশ্ব ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কে বিপুল জ্ঞানের অধিকারী হন। এরকম জ্ঞানী মানুষ ভারত উপমহাদেশেই বিরল।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ শৈশব থেকেই খুব বুদ্ধিমান ছিলেন, পড়ালেখার প্রতি তার খুব আগ্রহ ছিল। তিনি তার পকেট খরচ বাঁচিয়ে বই কিনতেন এবং বই পড়ায় প্রচুর সময় ব্যয় করতেন। তিনি লিখেন যে, ছেলেরা শৈশবে খেলাধুলা করতো, কিন্তু আমি একটা বই বাছাই করে ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকতাম যেন কেউ আমাকে দেখতে না পারে। কিশোররা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত তখন ভারতের ডেইলি পত্রিকায় প্রকাশিত হতো তার উর্দু-ফার্সি কবিতা।
পবিত্র কুরআন, হাদীস, ফিকাহ্ ও কালামের নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করে তিনি অনেক লেখা প্রকাশ করেন। তার পাণ্ডিত্যই তাকে ‘তাখলিক’ পরিহার এবং ‘তাজদিদ’ গ্রহণের পথে তাকে পরিচালিত করে। তাজদিদ সম্পর্কে তার ধারণা তাকে এ বিশ্বাসের দিকে চালিত করে যে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে ভারতের সকল ধর্ম ও গোত্রের জনগণ তাদের ধর্মবিশ্বাস ও কৃষ্টির সুসমন্বয় ঘটাতে পারে এবং তিনি বিশ্বাস করতেন, তা একমাত্র তখনই সম্ভব যখন সে রাষ্ট্র গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন রাষ্ট্র ভারতের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাভিত্তিক গণতন্ত্রের ধারণাকে ভারতের যেসব রাজনৈতিক চিন্তাবিদ সর্বাগ্রে সংজ্ঞায়িত ও ব্যাখ্যা করেছেন আজাদ সম্ভবত তাদের অন্যতম। তার ব্যাখ্যা এখনো শিক্ষা গবেষকগণ অনুসরণ করেন।
যে পারিবারিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন এবং যে ধরনের শিক্ষা লাভ করেছেন, তাতে তার ধর্মীয় নেতা হওয়ারই কথা। তার পূর্বপুরুষদের অধিকাংশই ধর্মবেত্তা ছিলেন বলে তিনি তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন।
বস্তুত, রাজনীতির প্রতি আজাদের ঝোঁক ছিল। খুব অল্প বয়সেই তিনি রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। জামালউদ্দীন আফগানির প্ল্যান ইসলামী মতবাদ ও স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলীগড় চিন্তাধারার প্রতি তিনি বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। প্ল্যান ইসলামী চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আফগানিস্তান, ইরাক, মিশর, সিরিয়া ও তুরস্ক সফর করেন। কিন্তু জীবন ও রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন এক উপলব্ধি নিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। ইরানে সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামরত নির্বাসিত বিপ্লবীদের সঙ্গে তিনি ইরাকে সাক্ষাৎ করেন। তিনি মিশরে শেখ মুহম্মদ আব্দুহ ও সাঈদ পাশা এবং আরব বিশ্বের অন্যান্য বিপ্লবী কর্মীদের সঙ্গে দেখা করেন। ধর্ম ও জীবনের সংকীর্ণ ধারণার শৃঙ্খলমুক্তির স্মারকস্বরূপ তিনি লেখক হিসেবে ‘আজাদ’ নাম গ্রহণ করেন।
সৈয়দ ফজলুল্লাহ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সম্পর্কে লিখেছেন, মুসলমানদের শিক্ষিত করার জন্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ অনেক কিছু করেছিলেন। তিনি ছিলেন কবি, লেখক, সাংবাদিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, সক্রিয় রাজনীতিবিদ, জাতীয় নেতা, ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। আজাদ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রবক্তা ছিলেন এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। তরুণ বয়সেই মাওলানা আজাদ উর্দু ভাষায় কবিতা এবং ধর্ম ও দর্শনসংক্রান্ত নিবন্ধন রচনা করতে শুরু করেন। ব্রিটিশ শাসনের তীব্র সমালোচনা করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে সমর্থন জানান। পরে তিনি খিলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সেই সময় তিনি মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে আসেন। ১৯২৩ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন ভারতের সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি। ১৯২৮ সালে আজাদ জাতীয় মুসলিম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন।
১৯৩১ সালে মাওলানা আজাদ ধারাসন সত্যাগ্রহ শুরু করেন। এই সময়ে তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন। তিনি ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণা প্রচার করেন। ভারতছাড় আন্দোলনের সময় তিনি পাঁচ বছর কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি তিন বছর কারারুদ্ধ ছিলেন।
স্বাধীন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার জন্য আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করেন। তিনি ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন স্থাপন করেন। ১৯৯২ সালে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্নে (মরণোত্তর) ভূষিত করা হয়। শিক্ষাবিস্তারে স্বাধীনতা সংগ্রামী এই নেতার উজ্জ্বল ভূমিকার কথা স্মরণে রেখে তার জন্মদিনটি ভারতে “জাতীয় শিক্ষা দিবস” হিসেবে পালন করা হয়।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে আছে আল বায়ান, তরজমান আল কুরান, তাজকিবাহ, গাবর-ই থাতির ইত্যাদি।
চিরন্তন সত্য একটি কথা এই পৃথিবীতে কেউ চিরস্থায়ী নয়। সাবাই সাড়া দিতে হয় মাওলার ডাকে, চলে যেত হয় নিজের আপন ঠিকানায়। আপন মহিমায় উন্নীত এই বিশাল মহিরূহ ও তার মালিকের ডাকে সাড়া দিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ ইংরেজিতে এই পৃথিবীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর আগে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার একটি কবিতায় লিখেছেন, তিনি এই পৃথিবীর সাথে বিচ্ছেদ করতে চান, তার এই কবিতার সেই কবিতাংশটি উল্লেখ্য করে আমি আমার লেখা শেষ করছি-
‘আজাদ সে তো বিচ্ছিন্নতা পছন্দ করে
একাকিত্ব ভালোবাসে
কীভাবে এই পৃথিবীতে থেকে বিচ্ছেদ হওয়া যায়
এই সম্পর্কে সে জমিনকে জিজ্ঞেস করে
জমিন বলে, আকাশকে জিজ্ঞেস করো!’
ভারতের আখবারে মাশরিকে প্রকাশিত হালিম সাবের— এর একটি নিবন্ধ অবলম্বনে
সম্পাদনা : মাসউদুল কাদির


