- তাওহীদ শামস
কেমন করে জানি পাথর-পাহাড়কে মাড়িয়ে তাদের অন্তরায় যে নৈসর্গিকতা লুকিয়ে থাকে সেসব অপার্থিব নিরঙ্কুশ প্রেমময় সৃষ্টির মোহমায়া এই তনু মনে ঢুকে গেল। তাদের ভালোবাসতে শুরু করলাম।
সেই যাত্রায় নেমে হেঁটেছি বহু পথ। এরপরও জনা-জীবনের ক্লেশে যখন হাঁপিয়ে উঠি তখন এসব নৈসর্গিক মুহুর্ত আনন্দ দেয়। ইবনে বতুতা জীবনে যে, বড় হওয়ার চেয়ে বিস্তৃত হওয়ার কথাটা কেন বলেছিল খানিকটা টের পাই। সেই পথ মাড়াতে গিয়ে দেখেছি ও সম্মুখীন হয়েছি নানান রোমাঞ্চকর ও উত্তেজক মুহুর্ত।
অফ ট্রেইলের সে এক রোমাঞ্চকর যাত্রা। এ যাবৎ আমার লাইফের এক স্মরণীয় এডভেঞ্চার।
তখন দুই হাজার বাইশের ২৯শে নভেম্বরের দিন শেষে আমরা বান্দারবনের আকর্ষণীয় পাহাড় আলিকদমের অন্দরের টোয়াইন খালের ঝর্ণাগুলো দেখে আপন নীড়ের দিকে পা বাড়ালাম।
ছোট-বড় পাথরে পা জমিয়ে পাহাড়ি নিস্তব্ধতার কোলাহল সাথে করে যখন আমরা হাজিরাম পাড়া থেকে দুছরি বাজার রওয়ানা হই। তখন ঘড়িতে পৌনে চারটা।
পথও ভীষণ। দুছরি বাজার পৌঁছাতে যে সন্ধ্যা গড়াবে তা জেনেও পাহাড়ী পথের কোলাহল সাথে নিয়ে নিচের দিকে এগিয়ে গেলাম।
দুই দিন যাবৎ অফ ট্রেইলে পাহাড়ী পথ বেয়ে পায়ের অবস্থা সুবিধার না। শরীরের চেয়ে পা জোড়াই ভীষণ ক্লান্ত।
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামার সময় খুব ভালোভাবেই বুঝে গেলাম। পা আমাদের কন্ট্রোলে নেই। বাতাসে পাতাদের তিরতির কাঁপার মত করে কাঁপতেছে।
অমসৃণ পাহাড়ী ঢালু পথ। একটু এদিক সেদিক হলেই ২০০/৩০০ ফুট নিচে চলে যাওয়া এক মুহূর্তের ব্যাপার। এরপরও ফেরার তাগিদে অতি সাবধানে আল্লাহর দয়ায় নিচে নেমে গেলাম।
নিচে নেমে যেন অস্বস্তির শরীরে থানকোয়াইন ঝর্ণার নয়নাভীরাম রূপ স্বস্তির পরশ ছোঁয়ালো। সেখানে ছোট্ট একটা জুমঘর ছিলো। জুম ঘর থাকার সুবাদে একটু পানি খেয়ে আবার হাটা দিলাম দুছরি বাজারের দিকে।
মনে করতাম কেউ সাঙ্গুর স্থান দখল করতে পারবেনা। তার অপরূপ সেই কান্তিমাখা চোখ ধাঁধানো চোখের প্রশান্তি কোনোকালেই যেন ফুরাবার নয়।
২.
আজ অবধি দেখা আমার চোখে টুয়াইন খাল এক অপার্থিব সুন্দর দৃষ্টিমুগ্ধকর সৃষ্টি বিধাতার।
সাঙ্গুু নদী স্থান আমার কাছে প্রিয় প্রেমিকাতুল্য। তার স্থান কারো কখনো আমার হৃদয়ের গহীন মুগ্ধতা থেকে ছিন্ন করা সাধ্য নেই। সাঙ্গু নদীর কলকল বয়ে চলার একরঙা সুর আমার ভিতরে একতালে নানান নানান রূপে বাজে। সাঙ্গু নদীর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক মাধুর্যতা আমাকে এমন করে মাতিয়ে রাখে যেন আমি বাতাসের কোলে পাতাদের দোল।
মনে করতাম কেউ সাঙ্গুর স্থান দখল করতে পারবেনা। তার অপরূপ সেই কান্তিমাখা চোখ ধাঁধানো চোখের প্রশান্তি কোনোকালেই যেন ফুরাবার নয়।
কিন্তু টুয়াইন খাল দেখে আমার চোখ বিষ্ময়কর হয়ে ওঠে। আমি আর একক প্রেমিকায় আবদ্ধ থাকতে পারি না। সেদিন থেকে আমার অন্তরে সাঙ্গুর সাথে দ্বিতীয় প্রেমিকা হয়ে জন্ম নিল টুয়াইন খাল। আমরা টুয়াইন খালের পাড় ধরে হাঁটতে থাকি।
ট্রেইলে চলার সুবিধার্থে কিছুক্ষণ পরপর খালের এপার ওপার হয়ে চলতে হচ্ছিলো । পাথুরে পথ। তার উপরে পানির সংস্পর্শে শ্যাওলা জমায় পিচ্ছিল হওয়ায় খুব সুবিধে করতে পারছিলাম না। গুটি গুটি করে শক্ত পদপরিচালনায় এগিয়ে যাচ্ছিলাম একটু একটু করে।
টুয়াইন খালের পানির তীব্র স্রোত এখানে। পা ফেলা দায়। নামলেই ভাসিয়ে নিতে চায়। সাঙ্গুর মত হরেক বৈচিত্র্যতায়ও কম নয়।
দুছরি বাজারের কিলো দুয়েক আগে মইনোগহ ফ্রি স্কুলের কাছাকাছি পাহাড়ের এক বাকে এসে আটকে গেলাম।
টুয়াইন খালের পানির তীব্র স্রোত এখানে। পা ফেলা দায়। নামলেই ভাসিয়ে নিতে চায়। সাঙ্গুর মত হরেক বৈচিত্র্যতায়ও কম নয়। হঠাৎ করে এমন খরস্রোতা আর সর্বনাশা হয়ে উঠবে ভাবতেই পারিনি। কোনভাবেই খালের এপার ওপার হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এদিকে বিকেল ফুরিয়ে প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। কী যে করবো কিছুই বুঝতে পারতেছিলাম না।
যে গাইডের নির্ভরতায় এতদূর চলাফেরা করছি সে বেচারাও এমন দৃশ্যে হতভম্ব। বহু চেষ্টা তদবীরের পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সহকারী গাইড মিন্টু ভাই খালে নেমে গেলেন।
আমরা ভয়ে তটস্থ হয়ে গেলাম। যদি মিন্টু ভাই স্রোতের বেগে পাথরে আছড়ে পড়ে। তাহলে নির্ঘাত সেখানেই মৃত্যু। ওই যাত্রায় আল্লাহ সহায় হলেন। মিন্টু ভাই ওপারে গিয়ে বাশ দিয়ে অনেক চেষ্টা করলেন আর কাউকে পার করানো যায় কি না। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই আর সম্ভব হয়ে উঠলোনা।
তিনি বাধ্য হয়ে দুছরি বাজারের দিকে বোট আনতে চলে গেলেন। আমরা তার ফেরার অপেক্ষায় লেগে পরলাম। ততক্ষণে পাহাড়ের প্রতাপশালী বৃক্ষমালার ছায়ায় ভর করে পুরো পাহাড় জুড়ে সন্ধ্যা ছাপিয়ে নেমে এসেছে ভীষণ অন্ধকার।
৩.
মিন্টু ভাই কোন বোটের ব্যাবস্থা করতে পারলেন না। কারণ, বিকেল পাঁচটার পর বোট চলাচল নিষিদ্ধ। তিনি মর্জিনা তংচংগ্যা দাদাকে নিয়ে আসলেন। সাথে ছিলো দাদার ছোট ছেলে পাপু তংচংগ্যা। দাদা বড় একটা দড়ি এনে খালের এপাশ ওপাশ করে শক্ত করে বেঁধে দিলেন।
আমরা তাদের ভরসায় সাহস জোগালাম। একে একে অন্ধকারেই অনেক কষ্টে পার হলাম। পাপু তংচংগ্যা আমাদের ব্যাগগুলো পারাপার করে দিলো। অন্ধকারেই আবার আমরা গুটি পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। টুয়াইন খালের বাঁকে বাঁকেই তখন পানিদের তীব্র ঢল। জীবন হাতে দড়ি বেয়ে আরো কয়েকবার এমন খালের সাথে লড়তে হবে সেটা তখনও বুঝতে পারিনি। এরপর আরো চার জায়গায় জীবন হাতে নিয়ে এই টোয়াইন খাল এপার ওপার করে এগোতে হলো।
চারপাশে পাহাড়ী অন্ধকার। পাহাড়ের নিস্তব্ধতায় আওয়াজ তুলে বয়ে চলে টুয়াইনের স্রোতমুখী জল। পাথুরে পিচ্ছিল পথ। আঘাতে আঘাতে পা-ও ক্ষত-বিক্ষত। মাঝে মাঝে পাহাড়ী পতঙ্গের আনজান সুর সবার মনেই জাগিয়ে তুলছিলো শিহরণ।
আল্লাহর নাম জপতে জপতে আমরা দুছরি বাজার পৌঁছে গেলাম। ততক্ষণে গড়িয়ে গেছে এশার আজান।
৪.
দুছরি বাজার ঘাটে বোট আছে। কিন্তু কেউ আলিকদমের আমতলি ঘাটে যাবে না। আমতলি ঘাটের উপরেই সেনাবাহিনী ক্যাম্প। বোটের আওয়াজ শুনলে রক্ষা নেই। অবস্থা খারাপ করে দিবে। আর যদি এই রাতের বেলা বাজারে সেনাবাহিনী আমাদের দেখে ফেলে। তাহলে মেনকিউ পাড়ার দিকে পাঠিয়ে দিবে। যা আমাদের জন্য হয়ে যাবে আরেক বিপদ।
ট্রেক করার মত কোন অবস্থায়ই আর আমাদের ছিলো না। করুকপাতা ইউনিয়নের ক্রাতপুং ম্রো এর বড় ভাই আমাদেরকে তার দোকানে লুকিয়ে রাখলেন। পরিচিত এক বোট ড্রাইভারকে ডেকে এনে বুদ্ধি দিলেন যে, তুমি গিয়ে সেনাবাহিনী কে বলো আমার মা অসুস্থ। জরুরি আলিকদম নিয়ে যেতে হবে।
ক্রাতপুং ম্রো এর বড় ভায়ের কথামত কাজ করে ড্রাইভার সেনাবাহিনী থেকে পারমিশন নিয়ে আসলো। তার এই চিকন বুদ্ধিতে আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তবে রাত বেড়ে যাওয়াতে অতিরিক্ত এক হাজার টাকা বেশী দিয়ে আমতলির দিকে বোর্ড চলতে শুরু করলো। বোট চলছে শুধুমাত্র দুইটা টর্চ লাইটের আলোর উপর ভরসা করে। টুয়াইন খাল কিছু কিছু জায়গায় প্রশস্ত। আবার কিছু কিছু জায়গায় এত সংকীর্ণ যে, বোট কখনো জংলার ভেতর চলে যেতে চায় আবার কখনো বা বালির উপর। একবার তো বোট পাড়েই উঠে গেলো। অনেক কষ্টের পর ঠেলে ঠুলে আবার পানিতে নামালাম বোট।
৫.
আরবী মাসের প্রথম সপ্তাহ চলছে। আকাশে চাঁদ নেই। অজস্র তারকারাজির মিটিমিটি আলো নকশী কাঁথার মত ছড়িয়ে আছে বিশাল আকাশ জুড়ে। খালের বুক চিরে চলে যাচ্ছে বোর্ট। অজস্র জোনাক পোকার আলোয় জ্বলজ্বল করে খালের পাড়ে পাহাড়ের পাদদেশে। সাঙ্গুর স্রোতের মুর্ছণায় যেন ম্রিয়মাণ সবুজ আলোয় নেচে উঠে জোনাক পোকার দল। কল্পনার এক দোলাচালে দুলতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সম্মুখ পানে।
বোটে শুয়ে বসে মনের সুখে গুনগুন করছি। এই যে আমাদের এত ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়া শরীর, পরিশ্রান্ত পা সবই যেন ফিকে চলে যাচ্ছে। আবার ভয়ও পাচ্ছি। যদি কোন পাহাড়ি জন্তু আক্রমণ করে বসে। মাঝে মাঝে পাহাড়ের জংলী শেয়াল, বন বিড়ালের জ্বলন্ত চোখ শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিলো। সবকিছু ছাপিয়ে আমরা রাতের অন্ধকারেই আমতলী ঘাটে পৌঁছে গেলাম। সাথে নিয়ে এলাম বেমালুম অসংখ্যা স্মৃতি। জীবনের খাতায় যোগ হলো কিছু মন্থনীয় মুহুর্ত।


