ডিএনডিবাঁধ এলাকায় জলাবদ্ধতা

ডিএনডিবাঁধ এলাকায় জলাবদ্ধতা

নিজস্ব প্রতিবেদক ● গত তিন দিনের ভারি বর্ষণে (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডেমরা) ডিএনডির ভেতর আড়াই ফুটের বেশি পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিন মাস ধরে পানিবন্দি হয়ে আছে এ এলাকার কয়েক লাখ মানুষ। শিল্পকারখানার ক্যামিক্যালের বর্জ্র মিশ্রিত বিষাক্ত ও দূষিত পানিতে রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, স্কুল, কলেজ সয়লাব। দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে ঘরে টেকা দায়। ডিএনডির অভ্যন্তরে যারা বাস করে তারা মানবেতন জীবনযাপন করছে। অনেকের হাতে ও পায়ে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগ। ডিএনডির অভ্যন্তরে থাকা ফতুল্লার রামারবাগ এলাকার গৃহবধূ হালিমা বেগম জানান, ঘরের ভেতরে হাঁটু পানি। ছেলে মেয়েকে খাটের ওপর রেখেছি। রান্নাঘর ও বাথরুম ডুবে গেছে। টিউবয়েল মুখও পানির নীচে তলিয়ে গেছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির নেই। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। ঘরের ভেতরে সাপ, জোকসহ নানা কিছু ঢুকছে।

ফতুল্লার রামারবাগ, লালখা, লামাপাড়া, শেহারচারসহ বেশ কয়েকটি  গ্রামের কয়েক হাজার বাসিন্দা পানিবন্দি হয়ে আছে। প্রত্যেকের বাড়িতে পানি ঢুকেছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে ওই এলাকার মেট্রো, হাসান ডাইং, আজাদ ও রিফাতসহ কয়েকটি ডাইং কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত দূষিত পানি মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কুচকুচে কালো পানির উৎকট গন্ধে ঘরে টেকা দায়। পানির কারণে রামারবাগ বাজারের বেশিরভাগ দোকনপাট বন্ধ। ফলে লোকসানগুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এলাকার বাসিন্দা সবুর মিয়া, আয়েত আলীসহ বেশ কয়েকজন জানান, ভারি বষর্ণের যতটুকু না ভোগান্তি হচ্ছে তার চেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে শিল্পকারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত পানির কারণে। ডাইংয়ের গরম পানিও বাড়িতে ঢুকছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের পেছনে সুগন্ধা আবাসিক এলাকা। লিংক রোড থেকে ইসদাইর বাজার পর্যন্ত রাস্তায় কোমড় পানি। কোথাও নৌকা চলে।

আবার কোথাও ভ্যানে করে পার করা হয়। অবর্ণনীয় দুর্ভোগে নাকাল এলাকার মানুষ। শুধু সুগন্ধ্যা আবাসিক এলাকার নয়ম জালকুড়ি, মিজমিজি, পাইনাদী, গোদনাই, দক্ষিণ কদমতলী, শ্যামপুর, ডেমরা, ডগাইর, কোনাবাড়ি, মাতুয়াইলসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকলাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রোকসানা আনজুম জানান, গত দুই তিন মাস ধরে পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে। হাঁটু পানি ভেঙে ইউনির্ভাসিটিতে যেতে হয়। কাপড় চোপড় সব ভিজে যায়। ডিএনডির ভেতরের বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। একই এলাকার বাসিন্দা সাহাবুদ্দিন জানান, ডিএনডির ভেতরের পানি নিষ্কাশনের ক্যানেল ও খাল দখল করে বাড়িঘর ও শিল্পকারখানা নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ময়লা আবর্জনা ও পলিথিন ফেলার কারণে ক্যানেলে মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে ভারি বর্ষণে পানি উপচে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পাম্প হাউস সূত্র জানায়, ডিএনডি পাম্প হাউসে ৫০ বছরের পুরনো  চারটি বড় সেচ পাম্প দিয়ে ঘণ্টায় ৫১২ কিউসেক এবং কয়েকটি ছোট পাম্প দিয়ে ১১০ কিউসেকসহ মোট ৬২২ কিউসেক পানি নিষ্কাশন করা হয়। বড় চারটি পাম্পের মধ্যে একটি ১৫দিন ধরে নষ্ট। যে কারণে ১২৮ কিউসেক পানি কম নিষ্কাশন হচ্ছে। বর্তমানে পাম্প হাউসে পানির উচ্চতা বিপদসীমার ওপরে থাকায় এবং পাম্প হাউস নিচু হওয়ায় মেশিনটি মেরামত করা যাচ্ছে না। পানি সরে গেলেই নষ্ট পাম্পটি মেরামত করা হবে।

সিদ্ধিরগঞ্জের ডিএনডি পাম্প হাউসের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আব্দুল জব্বার জানান, তিন দিনের ভারি বর্ষণে ডিএনডির ভেতরে বিপদসীমার আড়াই ফুটের বেশি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সরু ক্যানেল ও পলিথিনসহ ময়লা আর্বজনা পড়ে থাকায় পাম্প হাউসে পানি আসতে পারছে না। এ ছাড়াও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং পাম্প সঠিকভাবে চালাতে পারলে আগামী সাত দিনের মধ্যে পানি বিপদসীমার নীচে নেমে যাবে। উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমি নিয়ে গড়ে তোলা হয় ডিএনডির ইরিগেশন প্রজেক্ট। কিন্তু  ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যার সময়ও বন্যামুক্ত ছিল ডিএনডি। এরপর নির্মাণ হতে থাকে বাড়িঘর ও শিল্পকারখানা। বর্তমানে ডিএনডির ভেতরে কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ মানুষ বসবাস করে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *