তাবলীগ কারো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জায়গা নয়

তাবলীগ কারো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জায়গা নয়

পাথেয় রিপোর্ট : অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন তাবলিগ জামাতে রাজনীতিকরণের অভিযোগ উঠেছে। এর নেপথ্যে কাজ করছেন তাবলিগের সাদবিরোধী অংশ ও কয়েকজন হেফাজত নেতা।দেশব্যাপী মসজিদে মসজিদে সাদপন্থীদের বাঁধা ও তাদের আধিপত্য মনোভাব তাবলীগকে এক সঙ্কটের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করেন তাবলীগের আম সাথি ও সংশ্লিষ্টরা। এমনকি গতকাল সোমবার ২৩ জুন তাবলীগ মাসতুরাতের একটি জামাত হজে যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্ট সংলগ্ন পাকিস্তান চিন্তাধারা লালনকারী মাওলানা মিযানুর রহমানের মাদরাসার উপরে একটি ফ্ল্যাটে অবস্থান করে। সেখানে বয়ানের সময় বাড়ীর মালিক শুরাপন্থী গাজী কামাল তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমান করে বাড়ী থেকে বের করে দেয়। এ ঘটনায় তাবলীগ সংশ্লিষ্ট মুরুব্বিরা অত্যন্ত দুঃখ ও আফসোসের সঙ্গে বলেন,আল্লাহর মেহমানদের এভাবে অপমান করার কি দরকার ছিলো? তাদের কি এমন দোষ ছিলো! যার জন্য এভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়া হলো? তারা বলেন,এ ঘটনা নতুন কিছু নয়,ইতোপূর্বেও তারা এতাআতপন্থীদের সঙ্গে এমন ন্যক্কারজনক আচরণ করেছে। আল্লাহই এসব লোকদের বিচার করবে বলে আমরা ইয়াকিন রাখি।

তাবলিগ জামাতের মূলকেন্দ্র দিল্লির নিজামুদ্দীন মার্কাজকে উপেক্ষা করে তাবলিগের নেতৃত্বে পাকিস্তানকে সহায়তা করারও অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

এ লক্ষ্যে আগামী ২৮ জুলাই শনিবার মোহাম্মদপুর ঈদগাহ ময়দানে সমাবেশ করবে হেফাজত ও নিজামুদ্দীনবিরোধী নেতারা।

পোস্টারিংসহ জোরেশোরে চলছে সমাবেশের প্রস্তুতি। ‘চলো চলো ঢাকা চলো, ওয়াজাহাতি জোড় সফল করো’ এবং ‘আল্লামা আহমদ শফি দিচ্ছে ডাক, এতাআতি ফেরকা নিপাত যাক’ জাতীয় স্লোগানসংবলিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে সারা দেশে। সমাবেশে হেফাজত আমির আল্লামা আহমদ শফীকেও উপস্থিত করার কথা রয়েছে।
তাবলীগের নিয়মবহির্ভূত এমন সমাবেশকে ঘিরে মাঠপর্যায়ে তাবলিগি সাথিদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

জানা যায়, তাবলিগ জামাতের বিশ্ব আমির দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভি ও নিজামুদ্দীন মার্কাজের বিরোধিতা করছে পাকিস্তানের তাবলিগি নেতারা।তাবলীগের মূল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিজামুদ্দীন মার্কাজের সমান ক্ষমতা দাবি করে আলমি শুরা গঠন করে রাইভেন্ড মার্কাজ।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে অংশদারিত্বের বিবাদে দিল্লি-লাহোর জড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়েই এর প্রভাব পড়ে।বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদেও ছড়িয়ে পড়ে এ বিভক্তি।১১ জন শুরা সদস্যের মধ্যে ৬ জন নিজামুদ্দীনের পক্ষে থাকলেও বাকি ৫ জন আলমি শুরার পক্ষে অবস্থান নেন।

আলোচিত ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ও ২০ দলীয় জোটভুক্ত কয়েকজন ইসলামি রাজনীতিবিদও যুক্ত হন আলমি শুরার পক্ষে।তাবলিগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এ রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার পরই তাবলিগের কার্যক্রম রাজপথে গড়ানো শুরু করে।

বিগত বিশ্ব ইজতেমায় তাবলিগের বিশ্ব আমির মাওলানা সাদ ও নিজামুদ্দীনের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ এসেও ইজতেমায় অংশ নিতে পারেনি এ নেতাদের বিরোধিতায়।তাবলিগের পুরনো সাথিদের ৫ দিনের জোড় ও আগামী ইজতেমাকে কেন্দ্র করে আবারো তৎপর হয়ে উঠেছে হেফাজত ও ২০ দলীয় জোটের শরিক নেতারা।২৮ জুলাই প্রকাশ্য সমাবেশের মাধ্যমে সরকারকে তারা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চান।

এ সমাবেশ সফলের লক্ষ্যে ২৩ জুলাই মোহাম্মদপুর কবরস্থান মসজিদে বৈঠকে বসেছেন নেতারা।২০ দলীয় জোটের অন্যতম সাবেক শরিক দল খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের সভাপতিত্বে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
জানা যায়, হেফাজতের যুগ্ম-মহাসচিব এই নেতা মোহাম্মদপুর/কেরানীগঞ্জ আসন থেকে এম.পি হওয়ার বাসনায় জোর চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এ লক্ষ্যে জাতীয় পার্টির মাধ্যমে লিয়াজু করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের সঙ্গে সমঝোতায়ও উদ্যোগী হয়েছেন তিনি। মূলত তার অতি উৎসাহী মনোভাবের কারণেই এই প্রোগ্রামটি হতে যাচ্ছে।তাহলে কি তিনি তাবলীগের ঘাড়ে সওয়ার হয়েই তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে চাচ্ছেন?সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এও শোনা যায় তার দলকে জাতীয় পার্টির মাধ্যমে পল্টনে অফিসও কিনে দেয়া হয়েছে।

২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে অংশ্রগ্রহণ করেন ২০ দলীয় জোটভুক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা উত্তর জোনের যুগ্ম আহ্বায়ক কেফায়েতুল্লা আজহারী।বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে ৫০ হাজারের বেশি লোকসমাগম করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।সমাবেশে আগতদের অবস্থান ও থাকা-খাওয়ার জন্য মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া এলাকার মাদ্রাসাগুলো ব্যবহার করা হবে।সমাবেশে লোকসমাগম নিশ্চিত করতে ঢাকার সব মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ও উচ্চতর বিভাগের ছাত্রদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অরাজনৈতিক তাবলিগ জামাতের বিষয়টির এভাবে রাজনীতিকরণ পছন্দ করছে না তাবলিগের অধিকাংশ সাথিরা।কাকরাইল মসজিদের কয়েকজন মুকিম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, তাবলিগের সব কার্যক্রম প্রচলিত রীতি ও রাজনীতির বাইরে ছিল।
সেখানে এভাবে রাজনৈতিক স্টাইলে তাবলিগ নিয়ে সমাবেশ করাটা দুঃখজনক। স্লোগানসংবলিত পোস্টার, রাজনৈতিক পরিভাষার অনুপ্রবেশ তাবলিগের অহিংস পরিচিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

তারা বলেন, বলা হচ্ছে তাবলিগের সংকট নিরসনে এমন সমাবেশ, রাজপথে এমন উসকানি সভা করে কীভাবে সমস্যা নিরসন হবে। এভাবে তো বিভক্তি ও সংকট আরও বাড়বে।নামপ্রকাশ না করার শর্তে কাকরাইল মসজিদের এক দায়িত্বশীল বলেন, তাবলিগ নিয়ে নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চাইছে রাজনীতিসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তিরা।নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এভাবে ধর্মীয় ইস্যুতে মাঠ ঘোলা করাটা অবশ্যই স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছুর ইঙ্গিত।

এমন পরিস্থিতির সাথে ব্যক্তিগত ক্রোধের স্বীকার হচ্ছেন এতাআত পন্থীরাও।জানা গেছে এতাআত পন্থী হওয়ায় মাওলানা মুনির বিন ইউসুফ সাহেব হজে যাওয়ার পর তথাকথিত আলমি শুরা জোরজবরদস্তি করে তার ব্যক্তিগত রুম থেকে সব সামান ও জিনিসপত্র বাইরে ফেলে দেয় এবং তাকে এখানে আর ঢুকতে দেয়া হবেনা বলেও হুমকি ধমকি দেয়।

উল্লেখ্য,কাকরাইলসহ সারা দেশে সাদ বিরোধী আন্দোলনে মাওলানা যোবায়ের সাহেবের অন্যতম ভুমিকা রয়েছে বলে জানান তাবলীগের সাধারণ সাথিরা।তবে তাদের প্রশ্ন হলো এর আগে মাওলানা যোবায়ের সাহেব সবমসময়ই মাওলানা সাদ সাহেবের একান্ত অনুসারী ছিলেন।এ আর নতুন করে বলার কিছু নেই।কিন্তু পাকিস্তানের রাইভেন্ড থেকে ফেরার পরই মাওলানা সাদের প্রতি তার এ ক্ষোভ বা বিরোধীতা কিসের! নেতৃত্বের জন্যই কি মাওলানা যোবায়েরের এ বিরোধীত নাকি তাবলীগে বিভক্তি আনার জন্য তাবলীগের উসূলি ধারার বাইরে গিয়ে রাইভেন্ডকে তাবলীগের নয়া মারকায বানাতে উদগ্রীব তিনি।

ক্রীড়ানকের ভূমিকায় ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজ

কাকরাইল মারকাজে নেটওয়ার্ক জ্যামার ফিট করা মামলার আসামী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন এই ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজ। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়,তারেক রহমানের পরমার্শেই তিনি নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে তাবলীগে গোলযোগ বাঁধিয়ে পুনরায় হেফাযতকে ঢাকায় আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এক্ষেত্রে সর্বজন শ্রদ্ধেয় আল্লামা আহমদ শফীকে জনগণের সামনে ভূলভাবে উপস্থাপন ও তাকে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে তারা। যা জনমানসে এক বিভ্রান্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে। দলীয় স্বার্থান্বেষী মহলের এ অপক্রিয়া তাবলীগকে কলুষিত করছেই বলে জানান তাবলীগের মুরুব্বীরা। ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজ যেখানে ক্রীড়ানকের ভূমিকায় সুপরিকল্পিতভাবে এর কলকাঠি নাড়ছে।

এসব কর্মকাণ্ড ও স্বার্থান্বেশী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ এবং তথাকথিত আলমি শুরা ওয়ালাদের পোস্টার, লিফলেট ও লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে তাদের চালানো এমনতর কার্যক্রমে! ইতোপূর্বে কোনও সময়েই যা তাবলীগে দেখা যায়নি।জনমনে প্রশ্ন জেগেছে তাহলে তাবলীগের এ দলটি কি বাস্তবিকই অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও হেফাযতের মতোই নতুন কোনও পথে হাঁটছে?
সাধারণ জনমানসে তাবলীগের এ মহান দ্বীনি কাজ যারপরনাই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *