তাবলীগ দ্বন্দ্ব আর কত দিন চলবে!
আহমাদ কাশফী : সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা থেকে বঞ্চিতকরণ ও গণহারে মুসলিম নিধনের পর ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের অবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে দারুল উলূম দেওবন্দের কৃতী শিক্ষার্থী ও যুগ সচেতন আলিম হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) দাওয়াত ও তাবলীগের প্রচলিত রীতি চালু করেন। আল্লাহর অশেষ সাহায্য ও মেহেরবানীতে অতি অল্প সময়ে এই মেহনত ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো পৃথিবী।
হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহঃ এর মৃত্যুর পর ধারাবাহিকভাবে তার পরবর্তী বংশধরগণ এই মেহনতের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদেরই ধারাবাহিকতায় হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহঃ এর দৌহিত্র বর্তমান তাবলীগ জামাতের বিশ্ব আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পাকিস্তানপন্থী একটি স্বার্থান্বেষীরা দাওয়াত ও তাবলীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে।
এতদিন তারা শুধু দাওয়াত ও তাবলীগের হেডকোয়ার্টার দিল্লী থেকে পাকিস্তানে সরিয়ে নেওয়ার চক্রান্তেই লিপ্ত ছিল। সম্প্রতি এই চক্রটি তাদেরই বাংলাদেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশতাব্দি ধরে চলে আসা টঙ্গী ময়দানের বিশ্ব ইজতেমা বানচাল করার কালো ছক কষে।
গতকিছুদিন আগে মাওলানা সা’দ কান্ধলভী যুগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পূর্বসূরি আকাবিরদের বক্তব্যের পরিপন্থী কুরআন হাদীস মোতাবেক ফায়সালা দেন। এতে করে আলিম উলামাগণের সাথে তার ইখতেলাফ (মতানৈক্য) সৃষ্টি হয়। জেনে রাখা ভালো, শরয়ী বিষয়ে এধরনের ইখতেলাফ বা মতানৈক্য সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে শুরু করে আমাদের পূর্বসূরি আকাবিরদের মধ্যেও ছিল। এটা কোন দোষনীয় কিছু নয়।
একদল নীচ মানসিকতা পোষণকারী স্বার্থান্বেষী আলিম এই ইখতেলাফ বা মতানৈক্যকে পারস্পরিক বিভেদ ও অনৈক্যের পর্যায়ে নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। এমনকি তারা স্বার্থ উদ্ধারের জন্য বিগত ১ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং টঙ্গীর ময়দানে সা’দ কান্ধলভীর অনুসারী নিরীহ নিরপরাধ মুসল্লিদের রক্তপাত ঘটাতেও দ্বিধা করেনি।
বড়ই আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই চক্রটি হামলার পরে নিজেদের গা ঢাকা দিতে সারাদেশব্যাপী মাওলানা সা’দ কান্ধলভীকে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর অনুসারী শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজনের ফাঁসির দাবি করে ছবি সম্বলিত পোস্টার সেঁটে দেয়। মওদূদীপন্থী জামাতের মদদপুষ্ট এই চক্রটির নাটকীয় পোস্টারে মাজলুম আলিমে দ্বীন আল্লামা ফরীদ ঊদ্দীন মাসঊদ (দাঃবাঃ) কেও ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, চক্রটির দাবি ছিল ঘটনায় নিহত ব্যক্তি তাদের লোক অথচ পরের দিন (২ ডিসেম্বর) দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে নিহত ব্যক্তির পরিচয় উল্লেখ করে লেখা হয় তিনি মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর সমর্থক ছিলেন। প্রশাসন বিষয়টির সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাদের দাবিকে আমলে নেয়নি। ফলে, তাদের এই কু-চক্রান্ত হালে পানি পায়নি।
এর কিছুদিন পর থেকেই মরিয়া হয়ে উঠে ওযাহাতি নামধারী এই গোষ্ঠীটি। বিভিন্ন এলাকায় ওযাহাতি জোড়ের নামে তাবলীগের ইতিহাসে এক নতুন বিদআতের উদ্ভব ঘটায়। বিভিন্ন উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেয়। এরপর থেকেই প্রতিটি অঞ্চলে বাড়তে থাকে সংঘাত, সংঘর্ষ। মসজিদে মসজিদে ঝগড়া বিভেদ। মসজিদ থেকে মুসল্লিদের বের করে দেওয়া।আধিপত্য বিস্তার।পারস্পরিক কলহ ক্রমশ বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে তাবলীগের নামে মারামারি হানাহানির এই নব্য ঘৃণিত উপাখ্যান।
এরই জের ধরে গত কিছুদিন আগে পবিত্র রমজান মাসে কিশোরগঞ্জে হাফেজ আব্দুর রহিম রাজন নামে মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর অনুসারী এক ব্যক্তির গাঁয়ে তরল দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তার বিপক্ষের কয়েকজন যুবক। ২২ দিন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে থেকে গতকাল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে রাজন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এতেই কি এই বিভেদের সমাপ্তি? নাকি এ ধরনের ঘটনার দ্বারা উস্কানি আরো বেড়ে যাবে। একপর্যায়ে চলমান তাবলীগ দ্বন্দ্ব ভয়াবহ হিংস্রতার রূপ নিবে এটাই স্বাভাবিক।
বিষয়টির সার্বিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশের ধর্মবান্ধব সরকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতি অনুরোধ বিষয়গুলোর প্রতি দ্রুত দৃষ্টি দিন। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনুন। দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে শিগগিরই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। উস্কানীদাতা ও দাঙ্গাসৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে এখন পদক্ষেপ নিন।
লেখকঃ শিক্ষার্থী ক্বওমী মাদরাসা।


