নও মুসলিম জঙ্গি প্রজ্ঞার গল্প

নও মুসলিম জঙ্গি প্রজ্ঞার গল্প

নও মুসলিম জঙ্গি প্রজ্ঞার গল্প

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : প্রজ্ঞার পুরো নাম প্রজ্ঞা দেবনাথ। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ধনিয়াখালির কেশবপুর গ্রামে তার জন্ম। প্রজ্ঞার মা গীতা বিশ্বাস। আইএস মদদপুষ্ট জঙ্গি সংগঠন নব্য জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-র মহিলা শাখার প্রথম সারির নেত্রী আয়েশা জন্নত মোহনা ওরফে প্রজ্ঞা দেবনাথে পরিণত হন।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরেই বাংলাদেশ থেকে ফোন করেছিল। বলেছিল সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। তার কয়েক দিন পরেই সটান বাড়িতে হাজির। থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু থাকতে দিতে পারিনি।” প্রজ্ঞা যখন বাড়ি ছাড়ে তখন সে ধনিয়াখালি কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। সংস্কৃত নিয়ে পড়ছিল।

‘এই তো সেদিনও আমাকে লিখল প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগেছে। সর্দি-জ্বর। খুব কষ্ট পাচ্ছে- জানালেন প্রজ্ঞার মা। প্রজ্ঞার ভাই অভিজিত বললেন, প্রজ্ঞা মায়ের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই কথা বলতো। আমাকেও প্রায়ই হোয়াটস্ অ্যাপ কলে ফোন করত দিদি।’

গীতা বলেন, সমাজ মেনে নিত না। পাড়া প্রতিবেশীরা এক ঘরে করে দিত। সব চেয়ে বড় কথা, ছেলের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ওর বাবা চায়নি মেয়ে ফিরে আসুক।” কয়েক দিন থেকেই প্রজ্ঞা ফিরে গিয়েছিল বাংলাদেশে। যদিও মা ছাড়াও ভাই, দুই পিসির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। রানাঘাটের বাসিন্দা বড় পিসির মেয়েকেও প্রতি বছরের মতো এ বছরের ১৮ জুন জন্মদিনে ফোন করে শুভেচ্ছা জানাতে ভোলেনি ‘জঙ্গি’ আয়েশা ওরফে প্রজ্ঞা।

অভিজিত বলেন, দিদি ওই ভাবে চলে যাওয়ার পর আমরা দিদির প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলতাম। যাঁরা জানে না তাঁদের বলতাম দিদির বাইরে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আমরা চাইনি দিদি আর ফিরে আসুক। প্রজ্ঞার থেকে বছর দেড়েকের ছোট অভিজিত। হরিপাল কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে কাজ করতেন একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থায়। লকডাউনে সেই কাজ নেই আর। সেই কথা প্রসঙ্গে বলেন,‘তখন করোনা নিয়ে গ্রামে প্রচন্ড আতঙ্ক ছিল। আমি কলকাতায় কাজ করলে এলাকার লোক আমাকে আর বাড়ি ঢুকতে দিত না।’

সামাজিক প্রতিকূলতা, বাড়িতে স্বামী-ছেলের বিরোধিতা স্বীকার করে নিয়েও, তাঁর প্রশ্ন, আমার মেয়ে যদি জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য হবে তা হলে নিয়মিত আমার সঙ্গে বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত কি করে? জঙ্গি হলে ২০১৬ সাল থেকে একই ফোন নম্বর থেকে আমাকে যোগাযোগ করছে কি করে? শুনেছি জঙ্গিরা নিয়মিত ফোন পাল্টায়, সিম পাল্টায়।

বাংলাদেশ পুলিশের দাবি, প্রজ্ঞা নব্য জেএমবি-র মহিলা শাখার প্রথম সারির নেত্রী। সে অনলাইনে নতুন সদস্য নিয়োগ করত। দেশে বিদেশে আইএস (ইসলামিক স্টেট) মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকজনদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করত। সেই টাকা সংগঠনের কাজে খরচ করত। শুধু তাই নয়, মাদ্রাসায় শিক্ষকতার ফাঁকে নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণও দিত। বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের দাবি, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০০৯ সালে ইসলামে দীক্ষিত হয় প্রজ্ঞা। অনলাইনে যোগাযোগ হয় জেএমবি-র নেতাদের সঙ্গে। ২০১৯ সালে ওমানে থাকা এক বাংলাদেশি নাগরিককে বিয়েও করে।

এখানেই খটকা লেগেছে প্রজ্ঞার মায়ের। তিনি কলকাতার গণমাধ্যম আনন্দবাজারকে বলেন, ২০০৯ সালে মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ত। ও যদি সেই সময়ে ইসলামে দীক্ষিত হবে তা হলে তার পর কী ভাবে বাড়ির সমস্ত পুজো বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সক্রিয় ভাবে যোগ দিল? গীতার কথায়, ৩০ এপ্রিল ২০১০ সালে তাঁর শাশুড়ি প্রতিভা মারা যান। ২৪ অগস্ট ২০১৬ সালে মারা যান শ্বশুর দেবেন্দ্রনাথ। তিনি পুলিশ কর্মী ছিলেন।

গীতা বলেন,‘শ্রাদ্ধের যে আচার সমস্ত কিছুই মেনে চলেছে মেয়ে। এমনকি ২০১৬ সালে প্রজ্ঞা নিজেই আমাদের বাড়ির সামনে কালীমন্দিরে পুজো দিতে যেত। আমি তো শুনেছি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে এ সব কিছু করা যায় না। পুলিশের কাছে শুনলাম, বাংলাদেশ পুলিশ বলেছে অনলাইনে মেয়ের সঙ্গে জঙ্গিদের যোগাযোগ হয়েছে। কিন্তু আমার মেয়ের তো স্মার্ট ফোনই ছিল না। বাড়িতে কম্পিউটারও ছিল না। তা হলে কী ভাবে যোগাযোগ হল?

ছেলেকে এড়িয়ে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে গীতা বলেন,যে মেয়ে শরীর খারাপ হলে আমাকে ফোন করত, সেই মেয়ে জঙ্গি হতে পারে আমি এখনও বিশ্বাস করি না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *