নকশিকাঁথার গল্প

নকশিকাঁথার গল্প

নকশিকাঁথার গল্প

আমিনুল ইসলাম :: ছোট বেলায় পড়ে ছিলাম, পল্লি কবি জসিম উদ্দিন এর সাড়া জাগানো কাব্য গ্রন্থ “নকশি কাঁথার মাঠ”। কবি জসিম উদ্দিন সাহেব তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে গ্রাম- বাংলার মানুষের ঐতিহ্যবাহী নকশি কাঁথা এবং এই কাঁথা সেলাই করতে গিয়ে মানুষের সুখ- দুঃখের কথা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

কবি জসিম উদ্দিন সাহেবের সেই কাব্য গ্রন্থটি খুবই হৃদয় গ্রাহী হয়েছিল তৎকালীন সময়ে। মানুষের ঘরে ঘরে বইটি পাওয়া যেত। সেটা এমন ভাবে সাড়া জাগিয়েছিল, সেই কবিতা অবলম্বনে নাটক/ বিভিন্ন যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়েছিল।

আমরা ছোট বেলায় দেখেছি, গ্রামের ঘরে ঘরে মা- বোনদের কাঁথা সেলাই করার মহোৎসব। বিশেষ করে বর্ষার দিনে গ্রামাঞ্চলে দল বেঁধে মহিলারা কাঁথা সেলাই করত। ঘরের বারান্দায় নতুন/ পুরাতন কাপড় বিছিয়ে সেটার উপর বিভিন্ন ধরনের নকশা এঁকে দিত। এরপর সেই নকশা অনুযায়ী সেলাই উঠাত।

সেলাই করা কাঁথার কোন জুড়ি নেই। সবচেয়ে সেরা। বড় আরাম দায়ক। শীত-গ্রীষ্ম – বর্ষা সারা বছরই ব্যবহার হয়ে থাকে কাঁথা। কি ধনী কি গরিব, সকলেই কাঁথা পছন্দ করেন।

বর্তমান ডিজিটাল যুগ। কাঁথার বিকল্প অনেক কিছু বেরিয়েছে। রঙ- বেরঙের পাতলা কম্বল, চাদর, আরো কত কি। কিন্তু গ্রাম- বাংলার সেই নকশি কাঁথার কোন তুলনা হয়না। আজো সবার থেকে সেরা নকশি কাঁথা।

আমরা যখন ঢাকায় পড়া শুনা করেছি, তখন হোষ্টেলে থাকাকালীন সময়ে গ্রাম থেকে নকশি কাঁথা নিয়ে গিয়েছিলাম। সে গুলো ছিল আমার মায়ের হাতের তৈরী। মা বড় সুন্দর করে কাঁথা সেলাই করে দিতেন। রাতে ঘুমোনোর সময় বের করতাম। শহরের ছেলেরা আমার মায়ের তৈরী কাঁথাগুলো দেখে অবাক হয়ে যেত।

দারুল উলুম দেওবন্দ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলাম সেই নকশি কাঁথা। ইন্ডিয়ার বিভিন্ন প্রদেশের ছাত্ররাও দেখেছে সেগুলো। সবাই ভুয়সী প্রশংসা করত।

মা অবশ্য এখন বৃদ্ধা হয়ে গিয়েছেন। এখন আর সেলাই করতে পারেননা। তবে মায়ের তত্ত্বাবধানে, মায়ের নেগরানীতে এখনো কাঁথা সেলাই হয়। এলাকার বিভিন্ন মহিলাকে মা নির্দেশনা দেন, তাদেরকে কাঁথা সেলাই এর উপদেশ দেন। আর এভাবেই এখনো অনেক সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের কাঁথা তৈরী হয়ে যায়।

আমাদের বাসায় এখনো আমরা মায়ের সেলাই করা কাঁথা ব্যবহার করি। মায়ের নেগরানীতে সেলাই করা অসংখ্য কাঁথা আমাদের বাসায় রয়েছে। যে গুলো দেখলে, যে কোন মানুষের মন কেড়ে নেবে।

দুটো কাঁথা আবার যোগ হল আমাদের কাঁথার ভান্ডারে। অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন। যার পরতে পরতে সেলাই। ছোট ছোট আঁকা ফুলের উপর সেলাই দেওয়া হয়েছে। প্রায় ছয়মাস যাবত এটার পিছনে মেহনত চলেছে। একটা রুচি সম্মত জিনিস। যে দেখবে, তার হৃদয় গলে যাবে।

মায়ের তত্ত্বাবধানে তৈরী কাঁথা। পুরোটাই যেন ভাল লাগার। এত সুন্দর একটা জিনিস, হাতে নিয়ে বারবার দেখলাম। সেই সাথে আমার বাসার সবাই যেন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল।

আমাদের বাসায় যেন কাড়াকাড়ি লেগে গেল। সকলেই ঘুমোতে চায় সেটা নিয়ে। আমাদের বাসার ছোট বাবুটার যেন সবচেয়ে বেশী পছন্দ। আসলে গ্রাম- বাংলার সেই নকশিকাঁথা আজো অতুলনীয়। সেই সাথে আরো অতুলনীয় আমার মা।
মা তোমার নেক হায়াত কামনা করি। আমিন।
লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *