জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস
নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়ন
মো. আকতারুল ইসলাম : নিরাপদ কর্মপরিবেশ, টেকসই উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দেশে পালিত হয়েছে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস। পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও ২০০৩ সাল থেকে ২৮ এপ্রিল পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস পালন করে আসছে, আর বাংলাদেশ দিবসটি পালন করছে ২০১৬ সাল থেকে। পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও সেফটির বিষয়ে একটি জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে এ দিবস পালন করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও সেইফটি খুব জরুরি হলো একটি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সকল বিভাগের সমন্নয়ে গঠিত একটি ব্যবস্থা যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সকলের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যাণে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো পালিত হয় মহৎ উদ্দেশ্যে নিয়ে। ঐতিহাসিক দিবসগুলো পালিত হয় মূলত দিনটিতে জাতির ত্যাগের বিষয়টি স্মরণ করা।
জাতির ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং ঐ দিবসকে স্মরণ করে জাতিকে এগিয়ে নেয়া। অন্যদিকে কতগুলো দিবস জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য পালন করা হয়। ২০৩০ সালের জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং ২০৪১ সালের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য এ দিবসটি পালন অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। ৪০/৪৫ লাখ লোক কাজ করে একক একটি খাতে আর তা হলো এই গার্মেন্টস। দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এই গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বে নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের রোল মডেল। আজ বিশ্বের ১০টি সেরা গ্রিন ফ্যাক্টরির সাতটিই বাংলাদেশের।
২০১৩ সালের দুঃখজনক রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আগে কারাখানার কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়টি অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। আগে তৈরিকৃত বিল্ডিং-এ গার্মেন্টস কারখানা স্থাপন করা হতো, এখন শুধু গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনের জন্য বিল্ডিং তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ সরকার, আইএলও, বিভিন্ন দাতাসংস্থা, ইউরোপ-আমেরিকার বায়ার সংগঠনগুলোর উদ্যোগে এবং সহযোগিতায় গার্মেন্টস কারখানাগুলো নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের আঁধার রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।
গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে শিশুশ্রম নেই, অধিকাংশ কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ এর অধিকাংশ শ্রমিকের ডাটা বেইজ তৈরি হয়েছে। নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন বেতনসহ ছুটি এবং বোনাস নিশ্চিত হয়েছে। সব কারখানায় জরুরি নির্গমন সিঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিদর্শকগণ মোবাইল অ্যাপস লিমা’র মাধ্যমে পরিদর্শন কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকদের যে-কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করেছে। সরকার অধিকাংশ কারখানায় সেইফটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে। কারখানা সংস্কারে বায়ারদের সংগঠন একর্ড এবং অ্যালায়েন্স চলে যাওয়ার পর কলকারখানার সংস্কার কাজ তদারকির জন্য সরকার রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন সেল (আরসিসি) গঠন করেছে।
ইতোমধ্যে আরসিসি কাজ শুরু করেছে। এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সরকার শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার শোভন কর্মপরিবেশ বা নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করেছে। পরিদর্শনে আরো জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রাসায়নিক সুরক্ষা, মেশিনারি সেইফটি, নির্মাণ সেইফটি পরিদর্শন এবং আর্গোনমিক্স সম্পর্কিত গাইড প্রণয়ন করেছে।
উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সুস্থ শ্রমিক। শ্রমিকরা যাতে সুস্থভাবে উৎপাদনে আত্মনিয়োগ করতে পারে সেজন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সারাদেশে ৩২টি শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৭টি নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। আরো ডাক্তার নিয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। লালমনিরহাটের পাথর ভাঙা শ্রমিকদের সিলিকোসিস রোগ প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে।
কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। শ্রমিকের পেশাগত রোগের চিকিৎসা এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য রাজশাহীতে ১৯ বিঘা জমির ওপর ১৬৫ কোটি টাকা ব্যয় নির্মাণ করা হচ্ছে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে ৩০০ শয্যার বিশেষায়িত পেশাগত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে- পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রধান কাজ হলো কর্মক্ষেত্রে যে-কোনো ধরনের ঝুঁকি বা সম্ভাব্য বিপদ প্রতিরোধ করা।
জাতিসংঘের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি অর্জন করতে হলে সকল কর্মস্থলকে নিরাপদ করতে হবে। এসডিজির ৮.৫ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে যুব সমাজ ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীসহ সকল নারী ও পুরুষের জন্য পূর্ণকালীন উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও শোভন কর্মসুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন এবং সমপরিমাণ সমমর্যাদার কাজের জন্য সমান মজুরি প্রদান নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে।
লেখক : কলামিস্ট


