আদালত প্রতিবেদক ● একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলায় নেত্রকোণার দুর্গাপুরের চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তদন্ত সংস্থার দেয়া তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে বুধবার তা বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। এই চার আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নেয়া হবে কিনা সে বিষয়ে ১৪ জুন আদেশ দেবে ট্রাইব্যুনাল। মামলায় শুরুতে মোট পাঁচ আসামির নাম থাকলেও তাদের মধ্যে গ্রেফতার রমজান আলী তদন্ত চলাকালে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে মারা যান। বাকি চারজনের মধ্যে আজিজুর রহমান (৬৫), আশক আলী (৮২) ও মো. শাহনেওয়াজ (৮৮) কারাগারে রয়েছেন। খলিলুর রহমান (৭২) নামে আরেকজন পলাতক।
মুক্তিযুদ্ধের সময় নেত্রকোণার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এলাকায় অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, হত্যা ও গণহত্যার মত যুদ্ধাপরাধের পাঁচটি ঘটনায় জাড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। গত ৩০ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার কথা জানায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। বুধবার আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত। আসামিপক্ষে এ সময় উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী আবদুস সাত্তার পালোয়ান। পরে প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত বলেন, পাঁচ অভিযোগের সবকটিই আমলযোগ্য। যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণও রয়েছে। তাই ট্রাইব্যুনালে সেগুলো উপস্থাপন করার পাশাপাশি তা আমলে নিয়ে আসামিদের বিচার শুরু করার আরজি জানানো হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে ইসলামি ছাত্র সংঘের সদস্য খলিলুর রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন এবং পরে চ-িগড় ইউনিয়ন আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হন। সে সময় মুসলিম লীগের সমর্থক আজিজুর, আশক ও শাহনেওয়াজ একই ইউনিয়নে রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন। আসামিদের সবাই এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক হিসেবে পরিচিত বলে তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য। এ মামলার অভিযোগ তদন্ত করেন বদরুল আলম। ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল তদন্ত শুরু করে মোট ৭৯ জনের বক্তব্য শোনেন তিনি।
অভিযোগ ১ : ১৯৭১ সালের ১০ মে ৩ পাকিস্তানি সেনা এবং ২০-২৫ জন রাজাকার, আলবদর ও শান্তিকমিটির সদস্য মিলে দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়নের ভুলিপাড়া গ্রামে হামলা চালিয়ে তরিকেন্নেছাকে (বর্তমানে মৃত) ধর্ষণের চেষ্টা। আলম তালুকদারের ছেলে আইয়ুব আলীকে অপহরণ ও হত্যা এবং মেহের আলীর ছেলে ইন্নছ আলীর বাড়িতে লুট ও অগ্নিসংযোগ এবং তাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে সপ্তাহখানেক নির্যাতন।
অভিযোগ ২ : ১৯৭১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে কলমাকান্দা থানা আনন্দপুরে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন ও তার চাচা মানজু মিয়ার বাড়ি এবং দুর্গাপুরে নোয়াগাঁও গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক আবদুল ওয়াহেদ ও মুক্তিযোদ্ধা আবদুল গফুরের বাড়িতে হামলা করে সমস্ত মালামালসহ ২৭টি গরু লুট এবং চারটি বাড়ির আটটি টিনের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া।
অভিযোগ ৩ : ১৯৭১ সালের ২৬ অক্টোবর ১৫/১৬জন পাকিস্তানি ও ৫০/৬০জন রাজাকার-আলবদর সদস্য মিলে দুর্গাপুর থানার বড়ইউন্দ গ্রামের আহম্মদ আলী ও তার ছেলে আবদুল হামিদ। কলমাকান্দা থানার আনন্দপুরের মোসলেম উদ্দিন, ছোটকৃষ্ণপুর গ্রামের মুক্তল হোসেন তালুকদার, আবদুল হামিদ তালুকদার, আবদুল ওয়াহেদ তালুকদার ও আবদুস সাত্তার এবং রংসিনপুর গ্রামের মাহের উদ্দিন ফকিরকে তাদের বাড়ি থেকে আটক করে বাড়ির সব মালামাল লুট। ফুলপুর মাদরাসার প্রয়াত শিক্ষক সুলতান আহম্মেদের অনুরোধে আবদুল হামিদ ও আবদুস সাত্তারকে ছেড়ে দিলেও বাকি ছয়জনকে পাকিস্তানিদের সহায়তায় বাকলা নদীর পাড়ে নিয়ে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা।
অভিযোগ ৪ : ১৯৭১ সালের ২৯ অক্টোবর চ-িগড় ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ফাজিল উদ্দিন, আবদুল কাদির ও তার ছেলে আবুল হোসেন। ছমির উদ্দিন ও তার ছেলে শরাফত আল এবং মমরুজ আলীকে তাদের বাড়ি থেকে আটক, লুটপাট। ফাজিল উদ্দিন ও আবদুল কাদিরের বাড়ির মালামাল পুড়িয়ে দেয়া। পরে আবুল হোসেন ছাড়া বাকি পাঁচজনকে কাটাখালী নদীর উত্তর পাড়ে গুলি করে হত্যা করা। সে সময় আবুল কৌশলে হাতের বাঁধন খুলে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান।
অভিযোগ ৫ : ১৯৭১ সালের ১৭ ও ১৮ নভেম্বর চ-িগড়ের বানিয়াপাড়া গ্রামে হামলা চালিয়ে হাজেরা খাতুনকে অস্ত্রের মুখে ধর্ষণ, ঠেকানোর চেষ্টা করায় পুকুরজানকে গুলি করে হত্যা এবং নয়জনকে অপহরণ করে বিরিশিরি পিসি নল মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয়ে বসানো ক্যাম্পে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন। অজ্ঞাতনামা এক নাবালিকাকে ওই স্কুলে নিয়ে ধর্ষণ ও পরে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা। আটকদের মধ্যে জামাল উদ্দিন রব্বানী সোমেশ্বরী নদীতে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচলেও আটজনকে গুলি করে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয় আসামিরা।


