প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ার ব্যবস্থা নেই নারী সার্জেন্টদের!

প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ার ব্যবস্থা নেই নারী সার্জেন্টদের!

প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ার ব্যবস্থা নেই নারী সার্জেন্টদের!

পথে ডিউটিতে বিব্রতকর অবস্থায় নারী সার্জেন্টরা

পাথেয় রিপোর্ট : প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে হয় নারী পুরুষ সবাইকেই। রাজধানীতে কোথাও কোথাও পাবলিক টয়লেট থাকলেও সবখানে নেই সেই ব্যবস্থা। তা ছাড়া নারী সার্জেন্টদের পড়তে হয় ভীষণ বিব্রতকর অবস্থায়। তাহলে কীভাবে সারেন তারা প্রাকৃতিক কাজ। এ নিয়ে কেবল জলঘোলাই হচ্ছে, কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। এ নারী সার্জেন্টদের ডাকে সাড়াও মিলছে না তেমন। ফলে তাদের নিতে হয় অনুনয় বিনয়ের সুযোগ। পথের ধারে বাসাবাড়িতে বিশেষত দারোয়ানের টয়লেটে যেতে হয় তাদেরকে। এটাও যে নিরাপদ নয় তা সহজেই বুঝা যায়।

নারী সার্জেন্টরা বলছেন, আট ঘণ্টা কাজ করতে গিয়ে দু-তিনবার টয়লেটে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ট্রাফিক পয়েন্টে কোনো টয়লেট নেই। প্রাকৃতিক কাজটি সারতে আশপাশের বাসের কাউন্টার, সরকারি অফিস, বড় বিপণিবিতান বা বাসাবাড়ির দারোয়ানের টয়লেটে যেতে হয়। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে ঢুকতে হয় অনুনয়-বিনয় করে।

রাজধানীর শ্যামলী শিশুমেলার মোড়ে কথা হয় কর্তব্যরত নারী সার্জেন্ট লিমা চিশিমের সঙ্গে। ময়মনসিংহের এই নারী ইডেন মহিলা কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ২০১৫ সালে যোগ দেন সার্জেন্ট হিসেবে। প্রশিক্ষণ শেষে কাজ শুরু করেন ডিএমপিতে। দেশের নারী সার্জেন্ট হিসেবে প্রথম ব্যাচের সদস্য তিনি। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানালেন এই পেশায় আসার ইচ্ছা আগে থেকে ছিল না তার। তবু এলেন। লিমা চিশিম বলেন, মা সব সময় ভালো কিছু করার জন্য উৎসাহ দেন। বাবা তো আছেনই। রাস্তায় নারী হিসেবে কখনো কোনো প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হয়নি। বরং মনে হয়, আমরা আরও ভালো কাজ করি। গাড়ির চালক বা মালিকরা কখনো খারাপ ব্যবহার করে না। বরং অনেকে আইন ভেঙে কিছু করলে তখন তার কাছে এসে অনুতপ্ত হয়। এমন আর হবে না প্রতিশ্রুতি দেয়। এটা খুব ভালো লাগে তার।

নারী হিসেবে এই কঠোর কাজটি করতে গিয়ে প্রথম প্রথম একটু দুরূহ মনে হতো। ধীরে ধীরে সবকিছু রপ্ত হয়ে গেছে। বলেন, পরিশ্রমও সয়ে গেছে শরীর। সিনিয়র অফিসাররা সব সময় সাহায্য করেন। আর ঊর্র্ধ্বতনদের কাছ থেকে সব সময় নারী হিসেবে উৎসাহ পাই।

রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কাজ করতে যতটা না কষ্ট হয় তার চেয়ে বেশি বিব্রত বোধ করেন টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলে। লিমা চিশিম বলেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে সারা দিন ডিউটি করতে হয় বলে ধুলাবালির কারণে প্রায় সময় সর্দিকাশি লাগে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের। এটা এখন স্বাভাবিক হয়ে হয়ে গেছে তাদের জন্য। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা পুলিশ বক্সগুলোতে টয়লেট নেই। বিশেষ করে নারী সদস্যদের জন্য এটা মহা বিড়ম্বনার। আজ একজনের টয়লেটে কাল আরেকজনের টয়লেটে যেতে হয় প্রয়োজন সারার জন্য। যত অসুবিধা থাকুক, এর মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশেষ করে সড়কে আট ঘণ্টা টানা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি নারী সার্জেন্টদের জন্য। ফলে প্রতিদিন বিড়ম্বনায় পড়ছেন তারা। পুরুষকর্মীরা আশপাশের মসজিদ বা মার্কেটে যেতে পারলেও নারী সার্জেন্টদের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বারবার এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানালেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দুই শিফটে পুরুষ পুলিশের পাশাপাশি কাজ করেন নারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। রাত ১১টার পর তাদের দায়িত্ব দেয়া হয় না সচরাচর।

প্রসঙ্গত, পুলিশ বাহিনীতে নারী সার্জেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৪ সালে। সবশেষ সার্জেন্ট পদে নিয়োগের পরীক্ষায় অংশ নেন এক হাজার ৮৩৭ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৪৬ জন। নিয়োগ পান ২৮ জন। রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে হাইওয়ে পুলিশ, রাজশাহী; রংপুর ও খুলনা মেট্রোতে দুজন করে নারী দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ২২ জন নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশে।

একজন সার্জেন্ট বলেন, ‘প্রথম তিন-চার মাস লজ্জায় টয়লেট ব্যবহার না করেই অনেক কষ্টে ডিউটি করেছি। পরে অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অফিস বা মার্কেটে যাওয়া শুরু করি এরপর। তবে শুক্র ও শনিবার অফিস ভবন বন্ধ থাকলে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়।

অনেক সময় সিকিউরিটি গার্ডদের সহযোগিতা নিয়ে টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। আবার মাসের নির্ধারিত কয়েকটি দিন ঋতু চলাকালে মার্কেট কিংবা অন্য কোনো অফিসের টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে খুবই লজ্জায় পড়তে হয়। এসব কারণে নারী পুলিশের জন্য অবশ্যই নির্ধারিত টয়লেট থাকা দরকার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এই সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে। তবে আমাদের যেসব পুলিশ বক্স আছে সেগুলো রাস্তার পাশে এবং সিটি করপোরেশনের জায়গায় তৈরি। তাছাড়া বক্সগুলোতে বাথরুম তৈরির মতো জায়গা নেই। আবার বাথরুম তৈরি করলে সেটার আবর্জনা, পানি ব্যবস্থা ও অন্যান্য বিষয় রয়েছে। এখন নারী সদস্যদের ডিউটি দেয়া হয় আশপাশে থানা ও সরকারি অফিস আছে, এমন জায়গা দেখে।’ ট্রাফিক পুলিশের সমস্যার কথা বিবেচনায় নিয়ে বিকল্প চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *