বনাম মেহবুবা মুফতি : পরাজিত কাশ্মীরের মুখ

বনাম মেহবুবা মুফতি : পরাজিত কাশ্মীরের মুখ

বনাম মেহবুবা মুফতি : পরাজিত কাশ্মীরের মুখ

যারওয়াত উদ্দীন সামনূন : ভূস্বর্গ কাশ্মীর এখন নরকতুল্য। কীভাবে কী হলো তা পাঠকের অজানা নয়। সাম্প্রতিক এই বিভীষিকার শুরুলগ্নে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি কাশ্মীরের আজকের এই নির্যাতিত সময়ের পেছনে ৪৭ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন। তিনি মনে করেন, সেদিন যদি কাশ্মীর পাকিস্তানের সাথে যেত তবে আজকের এই নিপীড়নের মুখোমুখি তাদের হতে হতো না।

ইস্যুটা বেশ পুরনো হয়ে এসেছে। তার এই মন্তব্য বিরাট একদল পাকিপ্রেমীকে চরম পুলক দিলেও এর প্রতিক্রিয়া জানাতে আমি বেশ সময় নিলাম। মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে তাই কারণটা একটু ওয়াজাহাত করে নেই।

অ্যালেকজান্ডার তার ভারত অভিযান অর্ধসমাপ্ত রেখে গ্রীসে ফিরে গেলে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কীসে আপনাকে বাধ্য করলো ফিরে আসতে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ‘বাঙালীর হুজুগ’। গ্রীক ভাষায় ‘হুজুগ’ শব্দটা না থাকায় তার এই উত্তর গ্রীক বোদ্ধামহলে বেশ আলোড়ন তোলে। মহাবীর খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তির এই যদি হয় অবস্থা, তো আমি কোথাকার কোন কে যে বাঙালীর আবেগের মোকাবেলা করবো! সময়টা ছিল এমন যে, কাশ্মীর হয়ে উঠেছিল ঈমানের প্রশ্ন। কাশ্মীর ইস্যুতে যে বিষয়টা বুঝার চেষ্টা করবে সে বেইমান আর এক চামচ আবেগের সাথে দুই চামচ ভারত বিদ্বেষ ও এক চিমটি সরকার সমালোচনা সহকারে এমন একটি রচনা যে প্রসব করবে, যা না পড়েই মন্তব্য করা যায় ‘সহমত ভাই!’ সে হলো আবু বকরের (রাদি.) নিক্তিতে মাপা ঈমানদার আদমি।

পারসিক বুদ্ধিজীবী নদ্দীউ তওয়ারযা ( খ্রী.পূ. ৯৫) বলেছিলেন, ধর্মের ভিত্তিতে যে দয়া ও মানবতা প্রদর্শন করে কখনো তাকে বিশ্বাস করো না। বাঙালী হুযুর সমাজের আবেগ ও প্রেম-ভালবাসা, বা মানবতা জেগে উঠে ধর্মের ভিত্তিতে। জানামতে, কাশ্মীর অঞ্চলে মুসলমানদের মাঝে বড় একটা অংশ বেরলভী তথা কট্টর বিদআতী। যদি কাশ্মীরে বেরলভীদের উত্থান ঘটে তবে কি তারা আবার ভোলপাল্টে ভারতপ্রেমী হয়ে উঠবেন যেভাবে তারা এখন রোহিঙ্গা বিদ্বেষী হয়ে উঠছেন?

ফিরে যাই মেহবুবা মুফতির প্রসঙ্গে, তার এই মন্তব্য সম্পর্কে আমার ক’খান পালটা মন্তব্য আছে।

১. কাশ্মীর কেন ও কীভাবে ‘ভূস্বর্গ’ থেকে ‘ভূনরকে’ রূপ নেয় তা পড়তে পড়তে এতোদিনে পাঠক বোদ্ধা হয়ে উঠেছেন নিশ্চয়। তাই বিস্তারিত আলাপে না গিয়ে আমি কাশ্মীরের আজকের এই অবস্থার পেছনে সরাসরি নরকদূত পাকিস্তানকে দায়ী করছি। পাকিস্তানের আগ্রাসন ও বাস্তবতা বিবর্জিত ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের খোঁড়াচিন্তার সশস্ত্র প্রয়োগই কাশ্মীরকে বাধ্য করে ভারতের সাথে যোগ দিতে।

জন্মই যার আজন্ম পাপ এই পাকিস্তানের কাশ্মীরের মুসলমানদের নিয়ে মায়াকান্না নোংরা ধর্মব্যবসা ছাড়া আর কিছুই না। প্রিয় পাঠক, আপনি যদি এই ভেবে থাকেন যে, বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোন শক্তিশালী গোষ্ঠী বা দল কিংবা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রয়েছে, যারা কেবল ধর্মের খাতিরে মজলুমের উপকার করতে চায় তবে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। পাকিস্তানও এর ব্যতিক্রম নয়। আর তাই উঁইঘুর মুসলিমদের নির্যাতনে সমর্থন দিয়ে ইমরান খান আজ কাশ্মীরের মুক্তিদাতা সেজে বসেছেন।

ভারত এবং চীন দুটোই পাকিস্তানের প্রতিবেশী। উঁইঘুর নিপীড়ন কেন চীনের আভ্যন্তরীণ বিষয় আর কাশ্মীরের দুর্দশা কেন খানের দস্তরখানা খানখান করে দিয়েছে এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইমরান খানের ঐতিহাসিক ভিক্ষাসফরের মাঝে।

২. মেহবুবা মুফতির কথা মেনে ধরে নিলাম ৪৭ এ কাশ্মীর যোগ দিলো পাকিস্তানে। তারপর কি হতো?

তারপর কাশ্মীর বেলুচিস্তান হতো। ইমরান খানকে অবতার মানা মুসলিম ভাইযেরা জানেন তো কি ঘটছে বেলুচিস্তানে?

৩. অবাক লাগে এই বাংলাদেশে বসে, যে বাংলাদেশে পাকিস্তানীরা ত্রিশলাখের বেশী মানুষকে হত্যা করেছে, দুইলাখের মত নারীদের পাকিস্তানীরা ধর্ষণ করেছে, সেই বাংলাদেশে বসে অনেকে বিশ্বাস করছে যে, কাশ্মীর ভাল থাকতো পাকিস্তানের সাথে! ইমরান খানের শরীরে কার রক্ত বইছে জানেন তো?

আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর। যার সরাসরি নেতৃত্বে খুন-ধর্ষণের শিকার হয়েছে বাংলাদেশী মুসলিম-অমুসলিম, বৃদ্ধা-শিশু, সাদা-কালো সবাই খোদা তা’আলার যে যেমন সৃষ্টি হোক, বাঙালিমাত্রই সেই ছিল পাকিস্তানীদের নির্যাতনের শিকার। এই পাকিস্তানীদের হাতে নিরাপদ থাকতো কাশ্মীর? নাকি বাংলাদেশের, বেলুচিস্তানের কিংবা এরচেয়েও ছাড়িয়ে যেত কাশ্মীরী নির্যাতিতের চিৎকার? ৪৭ সালে যদি কাশ্মীর যোগ দিতো পাকিস্তানে, তবে আদৌ কি আজ পর্যন্ত ‘কাশ্মীরী’ বলে কোন জাতির অস্তিত্ব থাকতো? নাকি বিলুপ্ত হতো সেকালের নিয়াজী একালের ইমরান খানদের হাতে?

৪. আযাদ কাশ্মীর। গালভরা নাম। যদিও সারাবিশ্বে ‘পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীর’ হিসাবে পরিচিত। কেমন আছে দ্বিজাতি তত্ত্বের বলি এ কাশ্মীর?
এক মানবাধিকার কর্মী চমৎকার বলেছিলেন, আযাদ কাশ্মীরে হত্যা-গুম-খুন-জবরদখল সবই আছে, নেই কেবল ‘আযাদী’।

আচ্ছা, ভারত সরকারের ৩৫ (ক) ও আর্টিকেল ৩৭০ বাদ দেয়ার ফলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কি ঘটবে কাশ্মীরে?

কাশ্মীরকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে জড়িয়ে ফেলা হবে। ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে নাগরিকরা এসে আবাস গড়তে পারবে। একসময়, কাশ্মীরীদের হটিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠবে অন্য প্রদেশের নাগরিকরা। আবেগ বলে এরা মুসলমান হবে, মুসলিমরা দলবেঁধে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা জানায় এরা হবে কট্টর হিন্দুত্ববাদের অনুসারী। আজ কাশ্মীরীরা অধিকার আদায়ের আন্দোলন করছে, শীঘ্রই সেটা রূপ নেবে টিকে থাকার সংগ্রামে।

আযাদ কাশ্মীরে কি কাশ্মীরীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ? আজ যে দুর্দশার মুখোমুখি জম্বু-কাশ্মীর, সেই নরক এতকাল যাবত ভোগ করে আসছে আযাদ কাশ্মীর। কথাটা এভাবেও বলা যায়, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর আজ পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের ভাগ্যবরণ করলো।

মেহবুবা মুফতি কি তা জানেন না? আলবৎ জানেন। জানে না কেবল বঙ্গদেশীয় গণ্ডমূর্খের দল, যারা তার এই দায়মুক্তির মন্তব্যের আড়ালে খুঁজে পায় নিজেদের পাকিপ্রেম।

তাহলে মে. মুফতির এই মন্তব্যের পেছনে কারণ কি? কারণটা বুঝতে হলে আমাদের এই হামান নেতাকে চিনতে হবে। কাশ্মীরীদের বন্দুকের মুখে ঠেলে দিয়ে তিনি করছেন জানেন? তিনি চুলোচুলিতে ব্যস্ত আছেন। ‘কার বিজেপিপ্রেম বেশী’ এই প্রশ্ন নিয়ে তিনি এবং আরেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ পরস্পরকে দোষারোপ করছেন। দু’জন একই সাথে এক গেস্ট হাউজে বন্দি ছিলেন। চুলোচুলি সামাল দিতে না পেরে দু’জনকে পরে পৃথক রাখা হয়। তবে মূল প্রশ্নে উত্তরে বলতে হয়, তারা কেউই কম যান না।

ওমর আবদুল্লাহর পিতামহ শেখ আবদুল্লাহর সহায়তায় কাশ্মীরের ভারতভুক্তি সম্ভব হয়েছিল। যে মন্তব্য নিয়ে পাকিপ্রেমীদের উদ্বাবাহু নৃত্যজুড়ে দেয়া, সেই মন্তব্য কেবলই দোষারোপের রাজনীতির বোলচাল। যে জাতির ভাগ্যে মেহবুবা মুফতিদের মত নেতা জোটে, তাদের কপালে শোক ছাড়া আর কিছু জোটে না।

কাশ্মীর প্রসঙ্গে বলতে গেলে যে কথাটা এসেই পড়ে যে, এতে কি একটা দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো হচ্ছে না? মোটেও না। হ্যাঁ, একটা দেশ তার সংবিধানে কী পরিবর্ত আনবে না আনবে সে তার একান্তই নিজস্ব বিষয়। ভারত সরকার জন্মু ও কাশ্মীর প্রদেশকে যে ‘বিশেষ মর্যাদা’ দিয়ে রেখেছিল তা চাইলে আজ উত্তর প্রদেশ কিংবা পশ্চিম বঙ্গকে দিতে পারে, তাতে ভিনদেশী কারো কিছু যায় আসে না। কিন্তু, কাশ্মীরে যে আগ্রাসন ও জাতিনির্মূল অভিযান চালানো হচ্ছে, কাশ্মীরীদের দৈনন্দিন জীবন যাপনে যে বাঁধা প্রদান করা হচ্ছে, তাদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে, এ নিয়ে মানুষ মাত্রই উচ্চকণ্ঠ হওয়া উচিৎ।

এমনকি, কোন দেশ বা জাতির আভ্যন্তরীণ চর্চার বিষয়েও যে কেউ বিশ্লেষণ করতে পারে, যতক্ষণ না তা জাতিগত ঘৃণা সৃষ্টিতে বা সম্প্রীতি বিনষ্টে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মানবতা দেশ, ধর্ম, বর্ণ ও জাতপাত কিংবা মনুষ্য প্রজাতিরও ঊর্ধ্বে।

শেষ করছি একটা প্রাসঙ্গিক কৌতুক দিয়ে। অর্থমন্ত্রীর পদে নিয়োগ পেলেন মেহবুবা মুফতি। মন্ত্রণালয়ে প্রথম দিন এসে দেখলেন তাঁর টেবিলের ওপর আগের অর্থমন্ত্রী একটা চিরকুট আর তিনটা খাম রেখে গেছেন। চিরকুটে লেখা আছে, ‘যখনই কোনো সমস্যা হবে, ক্রমানুসারে একটি করে খাম খুলবেন এবং তাতে যা নির্দেশ দেওয়া আছে তা পালন করবেন।’

প্রথম বছরেই প্রচণ্ড সংকটে পড়লেন মেহবুবা। বাজেট কিছুতেই মিলছে না। তিনি ১ম খামটি খুললেন। তাতে লেখা, ‘আগের সরকারকে ইচ্ছামতো গালিগালাজ করুন ও সবদোষ তাদের উপর চাপিয়ে দিন’ তিনি তা-ই করলেন। আশ্চর্য ব্যাপার! সঙ্গে সঙ্গে ঝামেলা মিটে গেল। পরের বছর বাজেট নিয়ে আবার তিনি বিপদে পড়লেন। এবার খুললেন দ্বিতীয় খাম। তাতে লেখা, ‘আগের সরকারের সব পরিকল্পনা বাতিল করে দিন।’ তিনি তা-ই করলেন। আশ্চর্য, এবারও তিনি সমস্যা থেকে দিব্যি উতরে গেলেন। এবার এল তৃতীয় বছর। এ বছরও ঘাটতি বাজেট নিয়ে জটিল সমস্যায় পড়ে গেলেন অর্থমন্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তিন নম্বর খামটা খুললেন। তাতে লেখা, ‘এবার পদত্যাগ করুন এবং হুবহু তিনটা খাম তৈরি করে টেবিলের ওপর রেখে বিদায় হন।’

পুনশ্চঃ অ্যালেকজান্ডারের কাহিনীটি কল্পনা প্রসূত।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *