বহুবিবাহ ও নারীর বঞ্চনা

বহুবিবাহ ও নারীর বঞ্চনা

মতামত। ড. শিল্পী ভদ্র

বহুবিবাহ ও নারীর বঞ্চনা

বিবাহ হলো একটি বৈশ্বিক সার্বজনীন সংস্কৃতি। একে প্রায়শই একটি চুক্তি হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বের কিছু স্থানে, পরিবার-পরিকল্পিত বিবাহ, শিশুবিবাহ, বহুবিবাহ এবং জোরপূর্বক বিবাহ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হয়। বলাবাহুল্য, বেইজিং সম্মেলন এবং তৎপরবর্তী নারী সংগঠনের উল্লেখযোগ্য আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ প্রণীত হয়; সে সাথে আন্তর্জাতিক আইন ও নারী অধিকার-বিষয়ক উদ্যোগের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে উপরে উল্লিখিত বিবাহরীতিগুলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনগত স্বীকৃতির ক্ষেত্রে, অধিকাংশ সার্বভৌম রাষ্ট্র ও অন্যান্য বিচার ব্যবস্থা, বিবাহকে দুজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের মধ্যে সীমিত করে।
বিবাহ মূলত একটি ধর্মীয় রীতি হলেও আধুনিক সভ্যতায় এটি একটি আইনী প্রথাও বটে।

বিবাহ-বহির্ভূত যৌনসঙ্গম অবৈধ বলে স্বীকৃত এবং ব্যাভিচার হিসাবে অভিহিত একটি পাপ ও অপরাধ। আইনের ভাষ্য মতে, এক স্ত্রীর বর্তমানে আরেকটি বা একাধিক বিয়ে করাকে ‘বহুবিবাহ’ বলে।

আমাদের দেশে বহুবিবাহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে, যথাযথ আইন মেনে করা হয়না এজন্য এর সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়না; অথচ বহুবিবাহের প্রতারণায় পড়ে অগণিত নারীর জীবনদুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বহুবিবাহের কারণে বঞ্চনায় পড়ে নারী বিশেষ করে উপকূলের নারীদের দুর্দশার সীমা থাকে না এর ফলে বঞ্চনার সঙ্গে বহুবিবাহের কারণে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিবারিক কলহ।

পুরুষ প্রধান গ্রামীণ সমাজে নারী হয়ে পড়ে অসহায়। ক্ষমতার প্রভাব-দাপট, অর্থের জোর পুরুষদের ধাবিত করে বহুবিবাহের দিকে। এক্ষেত্রে আইন থাকলেও সে আইন গ্রামাঞ্চলের মানুষের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখনো অজানা। এক সময় উপকূলের প্রান্তিক জনপদে ‘মৌসুমী বিয়ের’ প্রচলন ছিল। সম্পদশালী ব্যক্তি কিংবা সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির মানুষের মাঝেও এই প্রবণতা ছিল। আবার কখনো জোড়া ইলিশের বিনিময়েও বিয়ে হতো, অল্প কয়েকদিনের জন্যে। লোকালয় থেকে সম্পদশালী ব্যক্তিরা মৌসুমী কাজের প্রয়োজনে উপকূলের দ্বীপ-চর এলাকায় কিছুদিন অবস্থান করলে সেখানে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বিয়ে করে; কাজ শেষে ক্ষণিকের ওই ঘর-সংসার শেষ। এছাড়াও উপকূলের গ্রাম সমাজে বহুবিবাহের প্রচলন রয়েছে। বাইরে থেকে কাজে আসা কৃষক, জেলে কিংবা দিন মজুরেরা স্ত্রী-সন্তান নেই বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিয়ে করে। কিছুদিন পরই তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায় না। এসব কারণে নারী বঞ্চিত হয় পদে পদে।

অথচ বিয়ে নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে শাস্তি নির্ধারিত আছে। প্রতারণার ক্ষেত্রে ‘সাধারণত দ-বিধির ৪২০ ধারায় মামলা বেশি হতে দেখা যায়। এ ধারায় শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছর এবং পাশাপাশি অর্থদ-ের বিধান আছে। যে জন্য আইন রয়েছে এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ ধারামতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিসি পরিষদের কাছে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবেনা। অনুমতির জন্য ফি দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের অনুমতি দিতে যেসব বিষয়ের প্রতি বিবেচনা করা হবে তার মধ্যে অন্যতম হলো- বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব, শারীরিক মারাত্মক দুর্বলতা, দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা, দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য আদালত থেকে প্রদত্ত কোনো আদেশ বা ডিক্রি বর্জন, মানসিকভাবে অসুস্থতা ইত্যাদি।

আইন অনুযায়ী এক স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ে করা যাবেনা। তবে কোনো ব্যক্তির যদি এক স্ত্রী বর্তমান থাকাকালে আরেকটি বিয়ে করার প্রয়োজন হয়, তাহলে তাকে তার বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের মধ্যে শেষ স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে, এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে আরেকটি বিয়ে করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে হবে। আইনে উল্লেখ রয়েছে, কোনো পুরুষ যদি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি অবিলম্বে তাঁর বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের আশু বা বিলম্বিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করবেন। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীরা আদালতে মামলা করে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন। দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী আলাদা বসবাস করেও ভরণপোষণ পাবেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বসবাসরত নাবালক সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে বাবা আইনত বাধ্য।

গ্রামীণ সমাজ, বিশেষ করে উপকূলের গ্রামীণ সমাজে বহুবিবাহ এবং এর আইনকানুন সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। ফলে ভোগান্তিটা শেষ পর্যন্ত নারীর কাঁধেই ওঠে। এ বিষয়ে উপকূল অঞ্চলের একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, বহুবিবাহ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদে অনেক অভিযোগ আসে। কিছু অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তির নির্দিষ্ট ঠিকানা না জানায় এবং এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়না। তবে এ বিষয়ে বিয়ের আগেই অভিভাবক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে বিয়ের পর সমস্যা না-হয়। কিংবা সমস্যা হলেও যেন ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

এসব সমস্যা সমাধানে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। আইনের দ্বারা নির্ধারিত তথ্যাবলী দিয়ে, নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে সরকারিভাবে বিবাহ তালিকাভুক্তি করাই হচ্ছে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন। মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের রেজিস্ট্রেন একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিয়ে প্রমাণ করা কঠিন। রেজিস্ট্রেশন করা না থাকলে মেয়েরা প্রতারিত হতে পারে। দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার নির্ণয়, সন্তানের পিতৃত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রিকৃত কাবিননামা একটি আইনগত দলিল।

হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন-২০১২ অনুযায়ী হিন্দু বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের বিধান রাখা হয়েছে। আগে বিবাহ নিবন্ধনের বিধান ছিল না। যেহেতু বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা হিন্দু বিবাহ আইন মতে পরিচালিত হয়, ফলে বৌদ্ধদের বিয়েও রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। খ্রিস্টান ধর্মের আইন অনুযায়ী বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক।

বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের গুরুত্ব পারিবারিক জীবনে অপরিসীম। রেজিস্ট্রেশন বিয়ের বর-কনে উভয়র জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে, নারীদের জন্য বিয়ের রেজিস্ট্রেশন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহ সম্পর্কিত কোনো জটিলতা বা প্রমাণের প্রশ্ন উঠলে এই রেজিস্ট্রেশনই একমাত্র প্রমাণপত্র হিসেবে কাজ করে। রেজিস্ট্রেশন না করলে স্বামী অথবা স্ত্রী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ বা দাবী আদায় করতে পারেন না। বিশেষ করে বিয়ের মিথ্যা কথা বলে নারীদের পাচার, শ্লীলতাহানী ইত্যাদিতে ব্যবহার করতে

পারে কিন্তু বিয়ে রেজিস্ট্রেশন হলে এই ধরনের নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। এতে করে বহুবিবাহও অনেকাংশে কমে যাবে। তাছাড়া বিয়ে রেজিস্ট্রি করা হলে বিনা অনুমতিতে বিয়ে করলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।

রেজিস্ট্রেশন হলে অনেকাংশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়, কারণ কাবিন-নামায় প্রমাণপত্রসহ বয়স উল্লেখ করতে হয়। এছাড়া নারীর সুরক্ষায় বিয়ের নিকাহনামা বা কাবিননামা একটি সত্যতা প্রমাণের দলিল। কাবিননামা হলো মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে একটি চুক্তিপত্র বা দলিল। খ্রিস্টান বিয়ের ক্ষেত্রেও একইরকম। কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দু বিয়ে রেজিস্ট্রেশন না হওয়ার কারণে অনেক হিন্দুনারী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। তবে এখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে রেজিস্ট্রেশন প্রথা প্রচলিত হতে দেখা যাচ্ছে।

বিবাহ রেজিস্ট্রেশন না করা একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মুসলিম আইনে রেজিস্ট্রেশন না করলে  ২ বৎসর বিনাশ্রম কারাদ- ও ৩০০০ টাকা জরিমানা বা উভযদ- হতে পারে তবে বিয়েটি বাতিল হবে না। ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন অনুযায়ী প্রতিটি বিবাহ সরকার নির্ধারিত কাজী দ্বারা রেজিস্ট্রেশন করা আবশ্যক। একটি ইউনিয়নে একজন সরকারি বিয়ে রেজিস্টার দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকেন। এই রেজিস্টার জেলা রেজিস্টার এবং জেলা রেজিস্টার চূড়ান্তভাবে রেজিস্ট্রেশন মহাপরিচালকের অধীনে ও তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ১৮৭২ সালের খ্রিস্টান ম্যারেজ এ্যাক্ট অনুযায়ী খ্রিস্টানদের বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করাও বাধ্যতামূলক।

বহুবিবাহ নানা কুফল বয়ে আনে। যাদের বহুবিয়ের বাতিকে পেয়ে বসে তাদের রুচি বিকৃত; চিন্তা-চেতনায় বিকলাঙ্গতা এবং চরিত্রে ব্যাখ্যাহীন সব বিষয় সংযুক্ত থাকে। তারা নারীকে মানুষ না ভেবে কেবল ভোগের পণ্যই ভাবে এবং বিকৃত সুখ খুঁজতে গিয়ে নিজেকে বহুগামিতার এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনে, যার সঙ্গে সাধারণত ইতর প্রাণী ছাড়া অন্য কারও তুলনা বা মিল খুঁজে পাওয়া যায়না। বহুগামীদের নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, তারা খুবই নির্লজ্জ ও বেপরোয়া, নির্মম, নিষ্ঠুর, নির্দয়, বিবেকহীন, অকৃতজ্ঞ, অবাধ্য, বেহিসাবি এবং অধার্মিক বা বকধার্মিক হয়ে থাকে।

কোনো নৈতিক আদর্শ, প্রেমময়তা বা ভালো-লাগার ঐন্দ্রজালিক মোহ থেকে তারা বহুগামী হয়না। কেবল কামভাব চরিতার্থ করার জন্য তারা বহুগামিতার পথ বেছে নেয়। ফলে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্কের সুফল তারা কোনোদিন পায়না। নিজেদের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করার সুযোগ লাভ করার কিয়ৎকাল পরে বহুগামীর পাত্র-পাত্রীরা একে অন্যের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে এবং তখন তারা ক্ষেত্রবিশেষ পরস্পরের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় তারা একে অন্যের জীবন-জীবিকা ও অস্তিত্বের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়। এমনকি একে কেন্দ্র করে খুন-জখম, মারামারি, হানাহানি ইত্যাদিও ঘটতে দেখা যায়, যা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের।

সমাজের অর্ধেক নারী। ফলে তারাই সমাজের অর্ধেকের প্রতিনিধিত্ব করেন। আমরা যদি তাদের যতœ বা সম্মান না করি, তাহলে কেবল এক পায়ে হেঁটে যাওয়া হবে। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন-কানুন, সামাজিক নীতিবোধ এবং পারিবারিক বন্ধন থাকা সত্ত্বেও নানা ফাঁকফোকরে পরকীয়া ও বহুবিবাহের মতো নীতিহীন কর্মকা- রীতিমতো ভয়াবহ সামাজিক রোগে পরিণত হতে বসেছে। এসব অনৈতিক ও গর্হিত কাজকে ঘৃণা করা ও প্রতিহত করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

সব মহলের কঠোর ঘৃণা, সচেতনতা, বয়কট ও রাষ্ট্রশক্তির কঠোরতাই কেবল বহুগামিতার সর্বনাশ থেকে ব্যক্তি, দেশ, জাতি ও সমাজকে রক্ষা করতে পারে। রক্ষা করতে পারে নারীদের প্রবণ বঞ্চনা থেকে।

লেখক : কলামিস্ট

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *