বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে

বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে

দেশ ভাবনা। মুস্তাফা মাসুদ

বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে

রায়হান সাহেব গাঁয়ে এসেছেন প্রায় চল্লিশ বছর পর। গাঁয়ে এর আগেও এসেছেন অনেক বার, কিন্তু তাকে সেই অর্থে আসা বলা যায় না; খুব অল্প সময়ের জন্য গাঁয়ে এসেছেন আবার নিজের প্রয়োজনে কর্মস্থল ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনাও দিয়েছেন, দীর্ঘসময় থাকা হয়নি গাঁয়ে। মাঝে মাঝে স্ত্রী এবং সন্তানদেরও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন কয়েকবার, তবে সেটাও ছিল অল্প সময়ের জন্য আসা-যাওয়া মাত্র। আজ যখন এলেন তখন চল্লিশ বছর আগে দেখা নিজের গ্রামকেও কেমন যেন অচেনা হচ্ছে মনে হয় তার কাছে।

রায়হান সাহেব চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে এসেছেন। থাকবেনও অনেকদিন। বলতে গেলে বাড়িতেই এখন থেকে বেশি থাকবেন তিনি, ঢাকায় থাকবেন কম। এজন্য নিজের ভিটেয় নতুন পাকা ঘর তুলেছেন। তার স্ত্রীও সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত। পরিকল্পনা আছে, দুজন এক সাথেই থাকবেন গাঁয়ে,যদিও তার কাছেও গ্রাম অপরিচিত আর নতুন লাগছে।

তিনি চারদিকে তাকান আর আগের দেখা গ্রামের স্মৃতি মনে করতে চেষ্টা করেন। তিনি স্বামীকে বললেন, দেখেছো কত পরিবর্তন হয়েছে চারদিকে। আগে দু-একদিনের জন্য এলেও মনে আছে সেই অজ পাড়াগাঁয়ের কথা। হাঁটু পর্যন্ত কাদার কথা? তোমার মনে নেই, ওই কাদার জন্যই তো ছেলেমেয়েরা ও গ্রামে আসতে চাইত না। শুধু কাদা কেন, ভালো কোনো রাস্তাওতো ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধে হতে-না-হতেই একরাশ অন্ধকার হুমড়ি খেয়ে পড়ত গাঁয়ে। কুপিবাতির সাধ্য ছিল না সে-অন্ধকারকে সামান্য তাড়ায়।

রায়হান সাহেবের স্ত্রী বললেন, মনে আছে তোমার; একদিন হঠাৎ তুমি বললে, গ্রামে যাবে, অন্তত একটা রাত থাকবে নিজের বাড়িতে। তখন ছিল শ্রাবণ মাস। আমিও রাজি হয়ে গেলাম যাওয়ার জন্য। মনে থাকবে না কেন, রায়হান সাহেব স্মৃতির সুতো টেনে ধরে বলেন: যশোর থেকে বাঘারপাড়া মাত্র বারো মাইল রাস্তা, সেখান থেকে এই পাইকপাড়া আরও দুমাইল। পাকা রাস্তাও ছিল না একটা। আমরা চাঁড়াভিটা বাসস্টপেজে নামলাম, ঠিক তখনি শুরু হলো বৃষ্টি। এদিকে সন্ধে গাঢ় হয়ে এসেছে। কাঁচা রাস্তায় ছিল না কোনো আলো, প্যাঁচপেঁচে কাদা সারা রাস্তাজুড়ে। রাত দশটায় বাড়ি পৌঁছালাম অনেক কষ্টে। ওঃ খোদা! সেসব কথা মনে পড়লে আজও শরীর কেঁপে ওঠে। আর এখন সকালে ঢাকা থেকে কোচে যশোর, সেখান থেকে বাসে বাঘারপাড়া; তারপর ইজিবাইক কিংবা ভ্যান। পড়ন্ত দুপুরেই বাড়ি পৌঁছনো সম্ভব। আর পদ্মাসেতু হলেতো সর্বোচ্চ চার ঘণ্টায় বাড়ি পৌঁছে যাব।

সেই অন্ধকার যুগের এখন অবসান হচ্ছে। পরিবর্তনের এ উদ্যোগটি নিয়েছে বর্তমান সরকার। আর্থসামাজিক ও মানব উন্নয়নে সমগ্র বাংলাদেশকে আলোকিত করার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি, যার সফল বাস্তবায়নে একের পর এক গ্রাম অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। এক সময় যে এলাকার জনগণের কাছে বিদ্যুতের আলো ছিলো স্বপ্নের মতো- এখন তা বাস্তব তাদের কাছে। ইতোমধ্যে দেশের শতকরা ৮৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে ‘সবার জন্য বিদ্যুৎ’ অর্থাৎ শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনারও প্রতিশ্রুতি রয়েছে সরকারের।

বর্তমানে গ্রাম-গঞ্জের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়- বিদ্যুতের আলোয় শুধু আলোকিতই নয়, গ্রামের মানুষ ঘরে বসেই টেলিভিশনে নাটক-খবর দেখছে। ছেলেমেয়েরা রাতে সানন্দে লেখা-পড়া করার সুযোগ পাচ্ছে। বিদ্যুতের আলো পড়ালেখারও আগ্রহ বাড়াচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এছাড়া বিদ্যুতের সুবাদে কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের সুফলও ভোগ করছে নতুন প্রজন্ম। যোগযোগে বিশ্বের সঙ্গে তালমিলাতে পারছে অজ-পাঁড়াগায়ের বাসিন্দারাও। বর্তমান সরকার টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার মাত্র নয় বছরের মধ্যেই দেশজুড়ে বিদ্যুতায়নের এই সফলতায় দেশের মানুষের জীবন-মান যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে দ্রুতই কমে যাচ্ছে শহর ও গ্রামের বৈষম্য- এমনটিই মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।

নয় বছরের (২০০৯-১৮) পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১১৯টি, যেখানে ২০০৯ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ২৭টি। ২০০৯ সালে যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট, সেখানে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২০ হাজার ১৩৩ মেগাওয়াটে (ক্যাপটিভসহ) দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নয় বছরে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৫ হাজার ১৯১ মেগাওয়াট। ২০০৯ সালে দেশে গ্রিড সাবস্টেশন ক্ষমতা (এমভিএ) ছিল ১৫ হাজার ৮৭০। আর ২০১৮ সালে তা হয়েছে ৩০ হাজার ৯৯৩। পরিসংখ্যান বলে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।

বিদ্যুৎ শুধু আলো নয়, প্রাপ্তি। বিদ্যুৎ শুধু শক্তি নয়-অগ্রযাত্রা। সভ্যতার অগ্রযাত্রার মূলে রয়েছে বিদ্যুৎ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মানেই নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা-স্বস্তি- প্রগতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে যে লক্ষণীয় অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তার মূলে রয়েছে বিদ্যুৎ। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকা- একদিকে যেমন বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে, সেইসঙ্গে বাড়িয়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। সারাদেশে এই চাহিদা ১১% হারে বৃদ্ধি পেলেও ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরে ২০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে আরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করার। রূপকল্প-২০২১ বা রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়ন করতে হলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করে আগামীর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালনের সক্ষমতা বাড়াতেই হবে।

‘ভিশন ২০২১’ অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে সকলের জন্য গুণগত ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের অফ-গ্রিড এলাকায় বিদ্যুতায়ন, যেখানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। এই বাধা অতিক্রম করতে সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস উন্নয়নের মাধ্যমে অফ-গ্রিড এলাকা তথা গ্রামাঞ্চলে, দূরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ এবং পাহাড়ি এলাকাগুলিকে বিদ্যুতায়িত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

পরম তৃপ্তিতে স্বামীর চোখের দিকে তাকান মনোয়ারা। তিনি এমন দিলখোলাভাবে কথা বলছেন, যেন তিনি ঢাকার বাসাতেই রয়েছেন। নাতিপুতিরা তাকে ঘিরে বসে আছে। মনোয়ারা বেগম আত্মবিশ্বাসী গলায় বলেন দশ বছর আগের আর এখনকার মধ্যে ফারাক অনেক, তা শুধু চোখে পড়ারই নয়, মন দিয়ে বোঝারও বটে। দেশ কতটা এগিয়েছে তা অনুধাবন করার বিষয়ও বটে। সন্ধ্যা হয়েছে। ঘরের লাইটগুলো জ্বালিয়ে দাও। সেই সাথে বাইরের গেটের লাইটটাও জ্বালিয়ে দিও। আত্মবিশ্বাস আর তৃপ্তি নিয়ে বলে ওঠেন মনোয়ারা।

ক্রমবর্ধমান এবং দ্রুত বিদ্যুৎখাতের এ উন্নয়ন বাংলাদেশকে শুধুমাত্র উচ্চতর পর্যায়েই উন্নীত করবেনা বরং একইভাবে দেশের উৎপাদনশীলতা ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে। পরিশেষে সকলের সহযোগিতায় বিদ্যুৎ বিভাগ ২০২১ সালের মধ্যে দেশের সবার জন্য যৌক্তিক মূল্যে মানসম্মত, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে তা আশা করা যায় কোনো রকম সন্দেহ আর জড়তা ছাড়াই।

লেখক : কলামিস্ট

২১.১০.২০১৯

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *