বিয়ের পর যে ভুল করবেন না

বিয়ের পর যে ভুল করবেন না

বিয়ের পর যে ভুল করবেন না

মাসুমা রুমা : প্রতিটি নারীর মনে বিয়ে সংক্রান্ত সাজানো কিছু স্বপ্ন থাকে। একান্ত নিজের মতো গড়ে তোলা কিছু স্বপ্ন। কল্পনায় নিজের ভালো লাগাগুলো ছুঁয়ে দেখতে ভালোবাসে নারী। নারী স্বভাবই কোমল স্বভাবের হয়ে থাকে। বিয়ের আগে স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝে বিদ্যমান ব্যবধানের উপলব্ধি খুব কম নারীই করে থাকে। বিয়ের পর শুরু হয় তাদের স্বপ্ন ভাঙা-গড়ার চূড়ান্ত খেলা। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ, নতুন মুখগুলোর সঙ্গে নিজেকে আজীবনের জন্য মানিয়ে নেয়া সহজ কথা নয়।

একজন নারী যখন বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর ঘরে প্রথম পা রাখে, ঠিক তখন থেকেই তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তাকে শুধু একজন ভালো স্ত্রী নয়, হতে হয় ঘরের লক্ষ্মী বউ, ভালো ভাবী, ভালো মা, পর্যায়ক্রমে ভালো দাদি, নানি, আরও কত কিছু! অথচ বিয়ের পর নতুন দাম্পত্য জীবনে নারীরা নানা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার মুখোমুখী হয়।

প্রথমত বিয়ের পর স্বামীর ঘরে নতুন পরিবেশ আর নতুন মানুষগুলোর মাঝে নিজেকে অসহায় মনে হয়। বিশেষ করে কেউ যদি অন্তর্মুুখী হয়ে থাকে। আপনজনদের ছেড়ে আসার ধাক্কা সহ্য করা সময় সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। ফলে অনেক নারী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। শ্বশুর-শাশুড়ি ঘরের বউকে মেয়ে না ভেবে কেবল বউ ভাবলে নারীর অসহায় বোধ আরও বৃদ্ধি পায়।

আবার, স্বামী যদি ভালো বন্ধু না হয়ে শুধুই স্বামী হয়, তাহলে নারীরা তাদের মনের ছোট ছোট ভাবনা, খারাপ লাগা কিংবা অভিমানের কথাগুলো শেয়ার করতে পারে না। ফলে বিবাহিত জীবন নিয়ে নতুন জীবনের শুরুতেই নারীর মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে থাকে। মনের ভেতর কথা জমতে জমতে সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে তার প্রভাব বিবাহ বিচ্ছেদেও রূপ নিতে পারে।

ক্যারিয়ার সচেতন নারীরা, ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তাশীল, স্বপ্নবাজ নারীরা বিয়ের পর দুশ্চিন্তার মুখোমুখী হয়। এখনো অধিকাংশ পুরুষ কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকজন চায় না ঘরের বউ বাইরে গিয়ে চাকরি করুক, নিজের পায়ে দাঁড়াক, স্বাবলম্বী হোক। পুরুষরা শিক্ষিত হলেও অনেক পুরুষ উন্নত মানসিকতার হয় না। তারা নারী-পুরুষকে এক মানদ-ে বিচার করতে চায় না। শোষণ, বঞ্চনার মানসিকতা এখনও অনেক পুরুষের অস্থিমজ্জায়, রক্তে-মাংসে মিশে আছে। একটি স্বপ্নের মৃত্যু মানে একটি আত্মার মৃত্যু এবং একটি আত্মার মৃত্যু মানে একটি দেহের মৃত্যু।

আমাদের সমাজে এখানো যৌতুক সমস্যার মুখোমুখী হয়ে অনেক নারীকে কটু কথা কিংবা শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অনেক নারী এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা আত্মহত্যার আশ্রয় নেয়।

অনেক পুরুষ আছে যারা, স্ত্রীর মতামতকে মূল্যায়ন করে না। মতামতের অবমূল্যায়নের জন্য নারীর নিজস্ব চিন্তার জগৎ, আত্মোপলব্ধির জগত, আত্মসম্মানের জগত ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে। নিজের মেধা, মননের প্রতি আস্থা কমে আসে। এ বিষয়গুলো একজন নারীর সুখী জীবনের পেছনে অনেকটাই অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অপমৃত্যু ঘটতে শুরু করে একজন নববধূর লালন করা স্বপ্নের।

নতুন দাম্পত্য জীবনের শুরুতে এমন আরও অসংখ্য সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় নারীকে। তবে সমস্যার পরিমাণ যাই হোক না কেন, সমাধান কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়। কিছু বিষয় যদি গুরুত্ব সহকারে নেয়া যায়, তাহলে সমস্যা অনেকাংশই কমে আসার সম্ভাবনা থাকে।

পুরুষ সমাজকে সুশিক্ষিত হতে হবে। একজন নারীকে সর্বপ্রথম একজন মানুষ ভাবার মানসিকতা থাকতে হবে। পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে এ ক্ষেত্রে করতে হবে প্রসারিত। নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি নারীর স্বপ্নকেও মর্যাদা দিতে হবে। স্বপ্ন পূরণে বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, পাশে দাঁড়াতে হবে। নারীর মতামতকে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করতে হবে। জোর করে নয়; ভালোবাসা, মায়া-মমতা দিয়ে নারীর হৃদয় জয় করতে হবে সংসারে।

আবার অনেক ক্ষেত্রেই নারীর পথে নারীই বড় বাধা। তাই প্রতিটি নারীর মানসিকতাকেও উন্নত করতে হবে। ঘরের বউকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখতে হবে; স্নেহ, আদর দিয়ে আপনজন ছেড়ে আসার দুঃখ মুছে দিতে হবে নারীর মন থেকে। ছাড় দেয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সংসার যেন প্রতিযোগিতার বিষয় না হয়ে; ভালোবাসা, সুখ আর শান্তির আধার হতে পারে সেভাবেই নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলতে হবে সবার আগে। সে চেষ্টা থাকতে হবে আমাদের সবার। শোষণ-বঞ্চনা নয়, নারী-পুরুষ হয়ে নয়; মানুষ হয়ে ভালোবাসতে হবে প্রতিটি মানুষকে; বাধা হয়ে নয়, সহযোগী হয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে একে অন্যের।

কিছু ভুল, কিছু বোঝাপড়ার কমতি, কিছু ছাড় না দেয়ার মানসিকতা, কিছু অবহেলা, কিছু সংকীর্ণতা, কিছু বর্বর চিন্তা-চেতনা ভেঙে দিতে পারে কিছু স্বপ্ন, কিছু সুখের নীড়, কিছু বিশ্বাসকে। আধুনিক যুগে আমরা আধুনিক মানুষ হয়ে উঠলেও প্রকৃত অর্থে সবাই উন্নত মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি। শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসা, মায়া-মমতাকে হৃদয়ে পুরোপুরি স্থান দিতে পারিনি। নিজের ভেতর ধারণ করতে হবে একে অন্যকে। যৌথভাবে গড়ে তুলতে হবে নতুন দাম্পত্য জীবন, সুখী পরিবার। পরিবার সুখী হলে সুখী হবে সমাজ, সুখী হবে সমগ্র জাতি আর দেশ।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *