বে মেছাল ব্যক্তিত্ব এটিএম হেমায়েত উদ্দীন

বে মেছাল ব্যক্তিত্ব এটিএম হেমায়েত উদ্দীন

বে মেছাল ব্যক্তিত্ব এটিএম হেমায়েত উদ্দীন

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : এক সময় ঢাকার পল্টন- বায়তুল মোকাররমে ভাষণ শোনার জন্য যেতাম। কোন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত না হলেও ভাষণ শুনতে ভাল লাগত। যে কোন দলের মিটিংয়ে যেতাম শুধু নেতাদের ভাষণ শোনার জন্য। নেতাদের বক্তৃতা শোনাটা যেন নেশা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
যখন যশোরে ছিলাম, তখন টাউন হল ময়দান, ভৈরব চত্তর, ঈদগাহ ময়দান, মোটকথা যেখানেই রাজনৈতিক বক্তৃতা হত, সেখানেই চলে যেতাম।
এমনকি বহু বামপন্থী নেতাদের ভাষণ শুনেছি, যশোরের টাউন হল ময়দানে, ঢাকার পল্টনে।

বহুবার আওয়ামী লীগের নেতাদের ভাষণ শুনেছি, বঙ্গবন্ধু এভিন্যুতে, মালিবাগ বাজারে। বামপন্থী নেতাদের মধ্যে রাজশাহীর ফজলে হোসেন বাদশা, (বর্তমান মনে হয় আওয়ামী লীগ করেন)। তাঁর বক্তৃতা আমার কাছে বেশ পছন্দ হত। আর আওয়ামীলীগের মরহুম আব্দুর রাজ্জাক, প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান, মোজাফ্ফর হোসেন পল্টু, তাদের বক্তৃতা বহুবার শুনেছি। এরা সকলেই আমার অনেক প্রিয় বক্তা ছিলেন।

এই নেতাদের বক্তৃতা অনেক গোছালো এবং ভাব- ভঙ্গিমা ও উপস্থাপনা ছিল নজর কাড়া।

এ সময়গুলো অবশ্য আশির দশকের শেষ এবং নব্ববই দশকের শুরুর দিকের কথা। তখন তো আমি ছাত্র। আর এসব বক্তৃতা শোনার মাকসাদ ছিল, বক্তৃতা শেখা। কে কেমন আলোচনা করে, সেটা রপ্ত করা।

তবে ইসলামী দলগুলোর মিটিং এ শরীক হয়েছি। তাদের নেতাদের বক্তৃতা শুনেছি অগণিত বার। সে সময়ে ইসলামী দল গুলোর নেতাদের মধ্যেও ভাল ভাল বক্তা ছিলেন। মুফতি আমিনী (রহঃ) ছিলেন, ইসলাম পন্থী বক্তাদের ছারে তাজ। তাছাড়া আরো অনেক রাজনৈতিক বক্তাও ছিল।

ইসলামী দল গুলোর মধ্যে সে সময়ে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বক্তা ছিলেন মাওলানা এ টি এম হেমায়েত উদ্দীন।

প্রথমে আমরা তাঁকে চিনতাম না তিনি কে? তাঁকে চিনেছি তাঁর বক্তৃতায়। সে সময়ে মঞ্চ কাঁপানো বক্তা খুবই কম ছিল। তবে সকল বক্তাদের মাঝে এ টি এম হেমায়েত উদ্দীন এর ভাষণ ছিল বিরল।

ময়দানে অনেক বক্তাই ছিল, তারা মঞ্চ কাঁপাত, কিন্তু এ টি এম হেমায়েত সাহেবের মত গোছালো বক্তৃতা, এবং বক্তৃতার ভাষা, সুন্দর উপস্হাপনা, আর কোন বক্তার ছিল না।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে এটিএম হেমায়েত সাহেব সবচেয়ে ভাল বক্তা ছিলেন।তখন ফয়জুল করীম সাহেব ছাত্র।তারা কেউ ময়দানে আসেনি। এখন যেরকম ফয়জুল করীম সাহেবসহ বহু বক্তার আবির্ভাব ঘটেছে। তখন একমাত্র এটিএম হেমায়েত সাহেবই ছিলেন সবার পছন্দের।

এটিএম হেমায়েত সাহেবের বক্তৃতার ধাঁচ ছিল আলাদা। তিনি যে ভঙ্গিমায় বক্তৃতা দিতেন, আর কাউকে দেখিনি সে রকম। তাঁর বক্তৃতা শুরু করলে আস্তে আস্তে তেজ বাড়তে থাকত। তিনি বক্তৃতার মাধ্যমে স্রোতাদের অন্য এক জগতে নিয়ে যেতে পারতেন। বক্তৃতার ছন্দে মোহনীয় থাকত সবাই।

বক্তৃতার ধার ছিল যেরকম, আবার মঞ্চের উপস্থাপক হিসেবে ছিল এক বীর পুরুষ। তিনি যেদিন মঞ্চ পরিচালনা করতেন, সমাবেশের পুরো সময়টা গরম করে রাখতে পারতেন। আর বক্তাদের নাম, বিশেষ করে পীর সাহেব চরমোনাই এর নাম ঘোষণা করার সময় এমন এমন উপাধি ও বৈশিষ্ট্যাবলী উল্লেখ করতেন, যেটা সকলের হৃদয়ঙ্গম হত।

আসলে একজন বে মেছাল রাজনৈতিক ছিলেন এটিএম হেমায়েত উদ্দিন। বহুগুণের সমাহার ছিল তাঁর মধ্যে। তাঁর বক্তৃতা, তাঁর মেধা, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, তাঁর শিষ্টাচার, তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, তাঁর মহানুভবতা, তাঁর ধৈর্য, সততা, পরোপকারীতা, হকের উপর অবিচলতা, তাকওয়া- পরহেজগারী, সব কিছু ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ের।

সবচেয়ে বড় যে জিনিস আমার কাছে ভাল লাগত, তিনি সব সময় ইসলামী রাজনীতির মধ্যে ডুবেছিলেন। তাঁর ধ্যান- জ্ঞানটাই ছিল ইসলামী রাজনীতি।
মৃত্যুর আগে তিনি অসুস্থ ছিলেন।কিন্তু এই অসুস্থতাকে তিনি কখনো পাত্তা দেননি। অসুস্থতার মধ্যেও সংগঠনের কাজ করতেন তিনি। প্রোগ্রামে গিয়ে বক্তব্য দিতেন।

গাজীপুর সিটি নির্বাচনের সময় তাঁকে দেখে ছিলাম, একজন সাধারণ কর্মির মত নির্বাচনী প্রচারণায়। এত বড় একজন তুখোড় নেতা, অথচ তাঁর আচরণ, কাজ কর্ম ছিল সাধারণ কর্মির মত।

নিরহংকার রাজনীতিবিদ ছিলেন এ টি এম হেমায়েত সাহেব। সাধামাটা চলা ফেরা, সাধা- সিধে জীবন যাপন, হাসিমাখা চেহারা থাকত সব সময়। কর্মিদের সাথে নরম মেজাজে কথা বলতেন।

জনদরদী নেতা ছিলেন তিনি। অসহায় মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। আমাদের দেশের বিভিন্ন দুর্যোগের সময় তাঁকে দেখা যেত প্রথম সারিতে। অসহায় দুর্গত মানুষের খেদমতের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন সব সময়।

দুর্গত মানুষের সেবায় ত্রাণ- সামগ্রী নিজের মাথায় করে নিয়ে ছুটে যেতেন। মানব সেবায় নিজের সবটুকু ব্যয় করে দিতেন তিনি। কখনো কোন কাজে অলসতা ছিল না তাঁর।

সত্যিকারের একজন ইসলামী নেতা ছিলেন এ টি এম হেমায়েত। একজন ইসলামী আন্দোলনের যে সব গুনাবলী থাকা প্রয়োজন, সে সব বৈশিষ্ট তাঁর মধ্যে ছিল।

পেট পুঁজার রাজনীতি তিনি করেন নি। গণমানুষের সেবার রাজনীতি, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, এদেশে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্টার কোশেশ তিনি করে গেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোন কিছু চাওয়া- পাওয়া ছিল না তাঁর। মহান আল্লাহর রেজামন্দি হাসিলের নিমিত্তে তাঁর এই সাধনা ছিল সব সময়।

বাতিল শক্তির সাথে আপোসহীন সব সময়। এটিএম হেমায়েত সাহেবের রাজনৈতিক যে অবস্থান, তাঁর যে পরিচিতি, তাঁর যে জন প্রিয়তা ছিল, তিনি অনেক কিছু করতে পারতেন। তাল মিলায়ে চললে অনেক কিছু হাসিল করা সম্ভব ছিল।

কিন্তু এ টি এম হেমায়েত সাহেব কখনো বাতিলের সাথে আপোস করেননি। বিন্দু পরিমাণ বাতিলকে ছাড় দেননি। সব সময় হকের উপরে অনড় থাকতেন।

এমনকি সংগঠনের কোন সিদ্ধান্তের বাইরে তাঁকে যেতে দেখা যায়নি। সংগঠনের সিদ্ধান্তকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন।

একটা কঠিন মুহূর্তে তিনি ঢাকা সিটির নির্বাচন করে ছিলেন। দেশের বিরোধী দল যেখানে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে নির্বাচনে মজবুত হয়ে ছিলেন।

নির্বাচনে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন ঠিকই। তবে দেশের মানুষের ভালবাসা অর্জিত হয়ে ছিল তাঁর। দেশ ও জাতির কল্যাণে তাঁর সেই কোরবানী মানুষের চিরদিন স্মরণ থাকবে।

মাওলানা এটিএম হেমায়েতের নাম তখন বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছিল। অখণ্ড ঢাকার মেয়র প্রাথী। আবার তিনি বিজয় প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি। সেই হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে ছিল সব জায়গায়।

অল সাইডের যোগ্য একজন রাজনৈতিক ছিলেন তিনি। আবার আলেম হিসেবে যোগ্যতা সম্পন্ন আলেম। অধ্যাপক হিসেবে একজন যোগ্য ব্যক্তি। রাজনৈতিক ময়দানের বজ্রকণ্ঠের অধিকারী। বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ।

সর্ব দিকেই ছিলেন তিনি। কোন দিকে যেন তাঁর কমতি ছিল না। মহান আল্লাহর ফায়সালা। বিদায় নিলেন আমাদের থেকে।মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। তাঁর জন্য আমরা সকলেই দুআ করি, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *