স্মৃতিকথন । আশরাফ উদ্দীন রায়হান
ভিসি স্যারের মুখে মক্কা-মদিনার গল্প
উপশহর মার্কাজ মসজিদের উত্তর গেট দিয়ে মসজিদের ভেতরে ঢুকছি। ঠিক তখনই দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ১৫-২০ জন মানুষের একটি মজমা চোখে পড়লো। একটু কাছাকাছি হয়ে দেখি চেয়ারে বসা একজন নাতিদীর্ঘ মানুষ। তিনি হাত নেড়ে অনুচ্চ আওয়াজে কথা বলছেন আর সবাই গভীর মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছেন। তা দেখে সেখানে বসতে আর আগ্রহবোধ করিনি। সোজা দুতলায় ওঠতে গেলাম। মুহূর্তেই চোখের পলক গিয়ে পড়ল অর্থনীতির নূরুল হক ভাই আর ইংরেজি সাহিত্যের মোশাররফ ভাইয়ের ওপর। তাঁরাও এখানে বসা। আমিও আর কিছু না ভেবে নিশ্চিন্তে বসে গেলাম।
সবার পেছনে বসায় ও ফ্যানের শব্দের কারণে কথা শুনতে অসুবিধা হচ্ছিল। টকটকে ফর্সা ও শুভ্র দাড়িশোভিত চেহারা, মাথায় তুর্কি টুপি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি ও পাজামা পরিহিত কথা বলতে-থাকা মানুষটিকে এতক্ষণে শনাক্ত করতে পারলাম যে, তিনি আমাদের ভিসি স্যার প্রফেসর ড. মো. আবদুস সোবহান। স্যারের বক্তব্য বরাবরই চিত্তাকর্ষক। অন্তত আমার কাছে খুবই আবেদনময়। গত মার্চ মাসে আমাদের লোকপ্রশাসন বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত অ্যালামনাই অনুষ্ঠানে স্যারের পুরোটা বক্তৃতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। উচ্চারণের স্পষ্টতা, যথাযথ অ্যাকসেন্ট, শব্দের প্রয়োগ ও সাবলীল অভিব্যক্তি সব মিলিয়ে একজন আদর্শ ও অনুসরণীয় বক্তার গুণ স্যারের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।
সেদিন কেন্দ্রীয় মসজিদে আশুরা উপলক্ষে আলোচনা সভায় স্যারের বক্তৃতার প্রশংসা করেছেন খোদ মসজিদের সভাপতি সাহেব। তিনি বলেছেন, কোনো সভা-সেমিনারে স্যারের উপস্থিতি থাকলে তিনি চেষ্টা করেন সেখানে হাজির হয়ে স্যারের বক্তব্য শুনতে। সে যাহোক, শুনতে অসুবিধা হওয়ায় একেবারে স্যারের ডানপাশে গিয়ে বসলাম। তন্ময় হয়ে শুনছিলাম স্যারের কথাগুলো। সদ্য মক্কা-মদিনাফেরত স্যার তাঁর হজের সফরের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিচ্ছিলেন আমাদের কাছে। হৃদয়ের আবেগ আর উচ্ছ্বাসে দলিত-মথিত স্যারের কথাগুলো কর্ণকুহরে মধুবর্ষণ করছিল যেন। জঠর যদি-বা রহিল অভুক্ত, শ্রবণ হইলো তৃপ্তমধুর মতো অবস্থা।
মসজিদে নববী, মসজিদে কিবলাতাইন, রিয়াজুল জান্নাহ, উহুদ পাহাড়, হেরা গুহা সবগুলোর চাক্ষুষ বিবরণ তুলে ধরছিলেন আমাদের সামনে। বরতকময় ও রকমফের খেজুরের কথা বলতে গিয়ে স্যার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। আল্লাহর রাস্তায় সফরের চমকপ্রদ কাহানিয়া শুনিয়ে দাওয়াত ও তবলিগের রাস্তায় বের হওয়ার ব্যাপারে আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করলেন। স্যারের কথাগুলো শুনে আমরাও আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছিলাম। কারো কারো চোখ অশ্রুসিক্ত হতে দেখা গেছে। এশার নামাজের সময় ছিল পৌনে আটটায়। না হলে আরও কথা শোনার সুযোগ ছিল। আমরা শোনার জন্যে উদগ্রীব আর স্যারও চাইছিলেন না কথা থামাতে। অতঃপর ইমাম আবু মুহাম্মাদ (রহ.)-এর একটি ঘটনা আলোচনা করে স্যার কথার ইতি টানলেন।
আটটা চল্লিশ মিনিটের দিকে স্যার তৃতীয় কাতারের ডান দিকে বসলেন। মোক্ষম সুযোগটি হাতছাড়া করিনি, লুফে নিলাম। স্যারের বাঁ পাশে বসে পরিচয় দিলাম : স্যার, আমি লোকপ্রশাসন বিভাগে পড়ছি, ফার্স্ট ইয়ারে। স্যার বললেন, “ও আচ্ছা! পাবলিক অ্যাড?” এই এক মজার ব্যাপার হলো, কারো কাছে আমার বিভাগের নাম বলতে হলে আমি “লোকপ্রশাসন” বলি আর সবাই “লোকপ্রশাসন” শুনেই বলে ওঠে “ও পাবলিক অ্যাড”? আমি তখন জ্বী বলে স্বগত হাসাহাসি। ভিসি স্যারের সাথেও একই মজার কাণ্ড ঘটল। পরে স্যারকে বললাম, “সার, আপনাকে নিয়ে আমার দুটো কৌতূহল ছিল?” স্যার মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, “বলো, বলো কী?” আমি প্রথম জিগ্যেস করলাম, আপনার হোম ডিস্ট্রিক্ট কোথায়, বলতেন যদি? স্যার আরেক চিলতে হাসি দিয়ে বললেন, আমার হোম ডিস্ট্রিক্ট নাটোর। তবে আমার বাপ-দাদার ভিটা টাঙ্গাইল। নানার বাড়ি এলেঙ্গা। আরও কয়েকটি তথ্য জানালেন, কিন্তু এখন আর ঠিক মনে করতে পারছি না।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলাম : স্যার, আপনি কোন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন? সোৎসাহে জবাব দিলেন : অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স। আমি বললাম : স্যার, এই দুটি কৌতূহলের কারণ হলো একেকজনের কাছ থেকে একেক রকম খবর পেয়েছি। তাই খোদ আপনার কাছ থেকেই জেনে নিয়েছি। বললাম : স্যার, এভাবে যদি মাঝেমধ্যে শবগুজারিতে এসে আমাদেরকে একটু-আধটু সময় দিতেন? স্যার আবারও স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বললেন : “হ্যাঁ, আমি আগে তো এখানে নিয়মিত আসতাম। পাশে উপবিষ্ট বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও নিজের সহপাঠী প্রফেসর উসমান গনী স্যারকে ইশারা করে বললেন, “আমরা দুজন তাবলীগে নিয়মিত যেতাম। ১৯৯৪ সালে প্রথম চিল্লা লাগিয়েছি। ভারতে সফর ছিল। এখন তো (সেই মেহনতের জযবা) তামাদি হয়ে গেছে।”
৪ অক্টোবর, ২০১৯
শুক্রবার, উপশহর, রাজশাহী মার্কাজ
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী


