মধ্যপ্রাচ্যের বিপজ্জনক রাষ্ট্র ইসরাইল

মধ্যপ্রাচ্যের বিপজ্জনক রাষ্ট্র ইসরাইল

মধ্যপ্রাচ্যের বিপজ্জনক রাষ্ট্র ইসরাইল

চৌধুরী আতিকুর রহমান : মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার আরব দেশগুলি ইসরায়েলকেই সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক মনে করে। এই বিপজ্জনক সূচকটিকে অন্যভাবে ঘৃণার সূচকও বলা যেতে পারে। কারণ, বিপদ বুঝেই ঘৃণা তৈরী হয়।

সমীক্ষাটি করেছে বিবিসি, নাম দিয়েছে আরব ব্যারোমিটার। সত্যিই তাদের তৈরী ইসরায়েল সঙ্কট এলাকাতে প্রবল উত্তাপের সৃষ্টি করেছে। সেই তাপ মাপার জন্যে সমীক্ষাটি এবং একই কারণে স্বার্থক নামা।

এই দেশগুলির মধ্যে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও লিবিয়াতে কয়েক বছর ধরে যুদ্ধাবস্থা বজায় রয়েছে। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল কেন্দ্র করে যার শুরু তা সমস্ত মধ্যপ্রাচ্যের আরবিভাষি দেশগুলিকে গ্রাস করেছে।

কয়েকটি রঙিন গোলাকার চিহ্ন দিয়ে দেশগুলির কাছে বিপজ্জনক হওয়ার সূচক তৈরী করা হয়েছে। নীল রঙ ইসরায়েলের জন্যে বরাদ্দ, বেগুনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, হাল্কা সবুজ ইরান, গাঢ় সবুজ সৌদি আরব, গেরুয়া অন্য দেশ যেমন রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যে এই তালিকায় সিরিয়া নেই। কারণটা আর কিছু নয়। এই দেশটিতে বর্বরতার চূড়ান্ত রূপটি দেখা যায়। তার শাসক সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে তারই নাগরিকদের উপর বোমা মারছে। ২ কোটি সিরিয়াবাসীর প্রায় ১ কোটি বিদেশে শরনার্থী বা আভ্যন্তরীন শরনার্থী। যারা আছে তারা অর্ধমৃত। তাই সমীক্ষার পরিবেশই নেই।

মনে রাখতে হবে উক্ত আরব দেশগুলির জনতা ও শাসকশ্রেণির মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। এই দেশগুলির কয়েকটিতে পাশ্চাত্য ধাঁচের গণতন্ত্র রয়েছে। যেমন, লেবানন, ইরাক, তিউনিসিয়া ইত্যাদি। কয়েকটিতে সীমিত অর্থে গণতন্ত্র রয়েছে। যেমন, ফিলিস্তিন, মরক্কো, ইয়েমেন।

এবার দেখি সমীক্ষা কি বলছে?

লেবাননঃ লেবানিজরা স্বাভাবিক ভাবেই ইসরায়েলকে সব থেকে বিপজ্জনক মনে করে, শতকরা হিসাবে ৭৯%। আর আশ্চর্যের বিষয় পরবর্তী বিপজ্জনক দেশটি হল ইরান। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায়ও। হেজবু ইরান নিয়োজিত মিলিশিয়া। হেজবু যে ইসরায়েল বিরোধী নয়, একটা ভাঁওতা, তা এই সমীক্ষা থেকে বোঝা যায়। ইসরায়েল সব থেকে বিপজ্জনক, তাকে যে মুকাবিলা করবে সে তো জনপ্রিয় হবে এটাই তো বলে। হেজবুর ক্ষেত্রে সমীক্ষা তা বলছে না। সৌদি আর অন্যান্যরা কম বিপজ্জনক।

ফিলিস্তিনঃ ১৯৪৮-এর প্রতিশ্রুতি এখনও পালিত হয়নি। ফিলিস্তিন পূর্ণাঙ্গ একটা দেশের পরিচিতি পায়নি। কারণ, অনুমেয় ইসরায়েল ফিলিস্তিন ভূমি দখল করে যাচ্ছে আর যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স গংরা দেখে যাচ্ছে। আরব দেশগুলিও তিনবার লড়ে, হেরে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছে। স্বাভাবিকভাবেই ৬৩% ফিলিস্তিনি ইসরায়েলকে ঘৃণা করে, তারপর ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রকে। ইরান, সৌদি, অন্যান্যরা ঘৃণার সূচকে বরাবর। এখানে বলার আছে, ইরানকে বলা হয় হামাসের পৃষ্ঠপোষক। হামাসের ১৯৮৮-তে সৃষ্টি লো কস্ট ওয়ারের জন্যে। ধনী আরব দেশগুলি তৈরী করে। ইরান সর্বোচ্চ সাহায্য করত আহমেদিনেজাদের সময়। তারপর সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইরানের ভূমিকার সমালোচনা করায় ইরান সাহায্য ধাপে ধাপে কমিয়ে শূণ্যতে নামিয়ে এনেছে।

মিশরঃ মুরসির হাত ধরে গণতন্ত্রের স্বাদ পাওয়া দেশটি স্বৈরচারী সিসির বুটের তলায় কাঁপছে। আর সমীক্ষাটি যে জনতাকে নিয়ে করা হয়েছে তার নমুণা সিসির ইসরায়েল আর মার্কিন তোষণ নীতির বিপরীত জনতার ৫৪% ইসরায়েলকে বিপজ্জনক মনে করে। তারপরই যুক্তরাষ্ট্রের স্থান, তারপরের বিপজ্জনক দেশটি হল ইরান।

জর্ডনঃ ইসরায়েল তৈরীর ঝামেলা সব থেকে বেশি সহ্য করতে হয়েছে এই রাষ্ট্রটিকে। এমনকি ১৯৬৭-র যুদ্ধে জেরুসালেমও হারায়। স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার ৪২% মানুষ ইসরায়েলকে ঘ্ণা করে। ঘৃণার সূচকে তারপরের দেশটি হল অন্যান্য, ১৮%। চোখ বন্ধ করে বলা যায় দেশটি রাশিয়া। এরপর যুক্তরাষ্ট্র। শাসকদের বন্ধু হলেও ১২% জনতা ইসরায়েলকে সাহায্য করার কারণে বীতশ্রদ্ধ। এর পরের দেশটি ইরান ১১%। ইরানের ইরাক, সিরিয়া, লেবাননে সম্প্রসারন ইরানকে জর্ডনবাসীদের কাছে বিপজ্জনক মনে হয়েছে।

সুদানঃ এই দেশটির নাগরিকরাও ইসরায়েলকে সব থেকে বিপজ্জনক (৩৬%) মনে করে, তারপর যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র (২১%), অন্যান্য (২০%), ইরান, সৌদি।

মরক্কোঃ এখানে অন্যান্য মানে ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্পেন সব থেকে বিপজ্জনক (৩২%), তারপর ইসরায়েল (২৭%), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

লিবিয়াঃ লিবিয়াতে কাতার, তুরস্ক, ব্রাদারহুড, পাশ্চাত্য স্বীকৃত সরকার এক পক্ষে। আবার হাফতার, যার হাতে রয়েছে সব থেকে বেশি জমি, তার সমর্থক সৌদি আর আমিরাত। যুক্তরাষ্ট্র অবস্থা বুঝে দুই পক্ষেই থাকে। আর লিবিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স সরকারপক্ষে। এখানেও ইসরায়েল ঘৃণিত ২৪%, যুক্তরাষ্ট্র ১৭%, তারপর অন্যান্য।

ইয়েমেনঃ প্রচার মাধ্যম এমনভাবে প্রচার করে যে ইয়েমেনে সৌদি আরব সব থেকে বড় ভিলেন, যদিও অবস্থান ৪ নম্বরে ১৪%। তবে ইয়েমেনি জনগন যার ৬৫% সুন্নি-শাফেঈ, ৩৫% জাইদি (এর ২৫% হুথি) তারা ইরানকেই সব থেকে বেশি বিপজ্জনক (৩৩%) মনে করে। কারণ, স্থিতিশীল সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্যেই ইরান, স্বীকৃত মনসুর রাব্বো সরকারের বিরুদ্ধে হুথিদের মদদ দিয়ে আসছে। তাই ইরানের জন্যে শুধুই ঘৃণা। এরপরের ঘৃণিত দেশটি হল ইসরায়েল (২৪%), যুক্তরাষ্ট্র (১৪%)।

আলজেরিয়াঃ মোটামুটি স্থিতিশীল দেশ হলেও মাস কয়েক আগে গন্ডগোল শুরু হয়। এখানেও অন্যান্য দেশ যেমন ফ্রান্স মূল দায়ী (৪৭%), ইসরায়েল (২২%)আর যুক্তরাষ্ট্র (১০%) তো আছেই।

ইরাকঃ ১৯৯০-এ সাদ্দামকে কুয়েত থেকে হটাতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো প্রবেশ করে। সৌদি আরবকে সামনে রেখে সাদ্দামকে কুয়েত থেকে হটানো হয়। এরপর দজলা-ফোরাতে বহু পানি গড়িয়েছে। ২০০৩-এ সাদ্দামকে হটিয়ে দেশটিকে বকলমে ইরানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ১৬ বছর পর ইরাকের মানুষ ইরানকে সহ্য করতে পারছে না। প্রমাণ হল ইরাকের মানুষ ইরানকে সব থেকে বিপজ্জনক মনে করছে (৩১%), যুক্তরাষ্ট্রের থেকেও (৩০%)। থ্রেট সূচকে ইসরায়েল ২৪%, সৌদি ৪ নম্বরে। ইরাকে কুর্দ মিলিয়ে সুন্নি ৪৪%, শিয়া ৫৬%। ইরানের প্রতি অসন্তোষ শুধু ইরাকি সুন্নিদের নেই, শিয়াদেরও আছে। ২০১৭-তে শিয়া অধ্যুষিত বসরায় ব্যাপক ইরান বিরোধী দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয় এবং মুক্তাদা সদরের দল একইসঙ্গে মার্কিন ও ইরান বিরোধিতা করে সুন্নি ও কম্যুনিস্টদের সহায়তায় নির্বাচনে জিতে আসে।

টিউনিসিয়াঃ এখানেও যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ফ্রান্স বিপজ্জনক।

বহু দূরে থাকা আমাদের দেশগুলিতে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশ সমূহের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির ধারণা মিলে গেলেও
বিপরীত ধারণা পোষণ করে ইরান ও সৌদি আরবের ক্ষেত্রে। আমরা নিরাপদ দূরত্বে বসে যা ভাবি ভূক্তভোগিরা তার বিপরীত ভাবতেই পারে।
লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *