মনে পড়ে প্রিয় শানু ভাই

মনে পড়ে প্রিয় শানু ভাই

স্মরণ । সগীর আহমদ চৌধুরী

মনে পড়ে প্রিয় শানু ভাই

:: আলহাজ আবদুল হান্নান, আমাদের প্রিয় শানু ভাই। একজন মাটির মানুষ ছিলেন, প্রায় একটি হাসি দিতেন, মনে করুন এটি তাঁর মুখে লেগেই থাকতো, কেমন বাচ্চাসুলভ সেটি, বাচ্চাদের মতো নির্মল-মাসুম ও সরল হাসি সেটি। বেশ বিত্তশালী ছিলেন তিনি, টাকা-পয়সা ডের ছিল, চট্টগ্রাম শহরে তাঁর বাড়ি ছিল, গাড়ি ছিল এবং ভালো ব্যবসা ছিল। কিন্তু এই বিত্তের প্রবৃত্তিগত অহমিকা, অহংকার ও আভিজাত্যবোধ বলতে তাঁর মধ্যে কিচ্ছুই ছিলো না। হ্যাঁ, পোশাকে-আশাকে পরিপাটি ছিলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিলেন, কিন্তু ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। ছোট-বড়, ধনী-গরীব, দুর্বল-সবল সবারই সাথে ছিল সদ্ভাব, মুহাব্বত ও ভালবাসার সম্পর্ক, সবারই সাথে গলায় গলায় খাতির ছিল তাঁর, হাসতেন-মিশতেন, খুনসুটি খেলতেন; এক্ষেত্রে ধনী-গরীবের কোনো আভিজাত্যবোধ তাঁর মধ্যে ছিল না।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে ধনী করেছিলেন, অঢেল সম্পদ দান করেছিলেন, সেই সাথে তাঁর মন ও হৃদয়টিকেও করেছিলেন বিশাল। তাঁর হাত ছিল প্রশস্ত, দান করতেন অকাতরে, এক হাতে দিলে অন্য হাতটা টেরও পেতো না। দান করতেন আল্লাহকে খুশি করতে, তাঁর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা-স্বরূপ। দান-অনুদানের ক্ষেত্রে আবদুল হান্নান শানু ভাইয়েরা ছিলেন সোনালি যুগের সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষাৎ উত্তরসূরি এবং এক জীবন্ত নমুনা। চরমোনাইয়ের পীর সাহেব হুযুরের যেসব মিশন চট্টগ্রামে সেসবকে যদি একটি অট্টালিকা ধরা হয় তাহলে এই শানু ভাইদের মতো মানুষগুলো ছিলেন একেকজন তার মজবুত এবং শক্তিশালী স্তম্ভ। ছাত্রজীবনে যখন সংগঠনে জড়িত হই তখন দল-আন্দোলন-বামুক ও তাদের পরিচালিত মাদরাসাসমূহের অবস্থা ছিল আর্থিকভাবে অত্যন্ত নাজুক। আজ বেশ উন্নতি হয়েছে; নিশ্চিতভাবে এসবের পিছনে শ্রমজীবী মানুষ ও দলের সাধারণ কর্মিদের অসাধ্য মেহনত ও চোখের পানির অবদান রয়েছে, একই সঙ্গে শানু ভাইদের মতো বিত্তশালী মানুষদের আগমনে তাতে প্রভূত উন্নতি ঘটিয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতি হচ্ছে রুহানিয়াত ও জিহাদের। রুহানিয়াত বলতে সাধারণ্যে কিছু পোশাকি পরিবর্তনকেই বোঝানো হয়। টুপি, মুখে দাড়ি, গায়ে এক্কান লম্বা জামা। কিন্তু আধ্যাত্মিকতার যে স্প্রিট সেটা হয়তো অনেকে ধারণও করে না, বুঝেও না। কিন্তু এই শানু ভাইয়েরা ছিলেন ব্যতিক্রম। পোশাকের পাশাপাশি ব্যবসায় সততা, হালাল পন্থা, অন্যের হকের প্রতি যত্ন নেওয়া, সুদি কারবার বর্জন ও সম্পদের ওপর যাকাত প্রদান ইত্যাতি খুব কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন তাঁরা, পরিবার-সমাজ থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি বিষয় তাঁরা ইসলামের প্রকৃত স্প্রিটের সাথে সামঞ্জস্যশীল করে ঢেলে সাজানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। নতুবা শানু ভাইদের যেসব ওয়াসায়েল ছিল হালাল-হারামের বাচ-বিচার ছেড়ে টাকা কামানোর মানসিকতা বজায় থাকলে চট্টগ্রামের বড় বড় ধনীদের অন্যতম হওয়া কোনো ব্যাপার ছিল না তাঁদের জন্য। তাঁরা পীর-মুরীদী গ্রহণ করেছিলেন কিছু দুআ-দরুদ পাঠ লাভের জন্য নয়, সত্যিকার অর্থে একজন মুসলিম হিসেবে কবরে যাওয়ার জন্য।

শানু ভাই ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ, সাংগঠনিক জীবনে কখনো কারো সাথে বাদানুবাদ হতে দেখিনি তাঁর। দলীয় তহবীলে বিপুল পরিমান অনুদানের স্বভাব থাকা সত্ত্বেও তা দ্বারা তিনি নিজেকে নিয়ে কখনো উচ্চবিলাসী হতে দেখেনি, অহংকার-আত্মপ্রচার এসব তাঁর স্বভাবেই ছিল না। দলের মিটিংয়ে প্রায় তিনি চুপচাপ বসে থাকতেন, অযথা কথা বলতেন না, এক কোণে বসেতেন, বস্তুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি কোনো ভূমিকা রাখতেন না, তবে এজন্য তিনি নিজেকে কখনো মিটিংয়ে অপ্রয়োজনীয় মনে করতেন না, তাঁর জন্য ভূমিকা গ্রহণের কিছু না থাকলেও সম্পূর্ণ মিটিংয়ে পুরোটা সময় তিনি উপস্থিত থাকতেন, এভাবে বসে থাকাকেও তিনি সওয়াবের কাজ মনে করতেন। আজ জুমুআর এ পবিত্র দিনে এই মহৎ প্রাণ বড় গুণী ভাইটি আমাদের ছেড়ে মহান রফীকের কাছে চলে গেলেন। তাঁর মাগফিরাত ও দরজাত বুলন্দির জন্য দিল খুলে দোয়া করার জন্য সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই।
লেখক : রাজনীতিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *