আলেম সমাজের অহংকার ইসহাক ফরিদী রহ.
আমিনুল ইসলাম কাসেমী : মনের আঙিনায় হঠাৎ উঁকি দিয়ে উঠল একটি নাম। যিনি ছিলেন আলেম সমাজের গর্ব। যাকে নিয়ে আজো আমরা অহংকার করতে পারি। যার লিখনী, যার বক্তৃতা, যার মেধা, কর্ম দক্ষতা এখনো স্মৃতির পাতায় ভাস্বর হয়ে আছে। অতি অল্প সময়ে এত সৌরভ তিনি ছড়িয়ে ছিলেন, তা অকল্পনীয়। আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ.। সাবেক মুহতামিম রাজধানীর শেখ জনুরুদ্দীন রহ. দারুল কোরআন মাদরাসা, চৌধুরীপাড়া। তিনি একটি নাম, একটি ইতিহাস। যাকে দেখার আগে আমি তাঁর লিখনী দেখেছি। যার সাথে কথা বলার আগে তাঁর বইয়ের সাথে আমার কথা হয়েছে। যার প্রতিটি বই, পুস্তিকা, প্রবন্ধ, এবং সম-সাময়িক লেখনীর অসম্ভব ভক্ত ছিলাম আমি।
আমি প্রথম ইসহাক ফরিদী সাহেবের বই পড়ি, শায়খুল ইসলাম মাদানী রহ.-এর জীবনী নিয়ে লেখা বই। সেই বইটি পড়ার পর থেকেই আমি ইসহাক ফরিদী সাহেবেরর খাছ ভক্তে পরিণত হলাম। এরপর যখন যে বই, রিছালা তিনি বের করতেন, লুফে নিতাম।
ইসহাক ফরিদী সাহেবের একটি বই আমি যে কতবার পড়েছি তার হিসেব নেই। বইটির নাম, “বাতিল যুগে যুগে” একদম ইবারত সহ মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল আমার। বিশেষ করে মওদুদী মতবাদের অধ্যায়টি এমনভাবে ইয়াদ করেছিলাম, আরেকজনকে আগা-গোড়া মুখস্থ শোনাতে পারতাম।
একজন তুখোড় কলম সৈনিক ছিলেন ইসহাক ফরিদী সাহেব। যে রকম তাঁর মেধা, তেমন কলমের ধার। প্রতিটি লেখায় এত আকর্ষণ ছিল, পাঠকের হৃদয় কেড়ে নিত। বাচন- ভঙ্গি , উপস্থাপনা, শব্দের প্রয়োগ, ভাষাগত ব্যবহার, সবই ছিল ব্যতিক্রম। তাঁর বইগুলো পড়ার আগে ভূমিকাটা যখন পড়তাম, একজন গুণি লেখকের মতই ছিল তাঁর বইয়ের ভূ্মিকা। লেখাগুলোতে নিষ্ঠাবান দায়ীর গুণাগুণ ফুটে উঠত।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে আলেম সমাজের মধ্যে যত লেখক- গবেষক এর আভির্ভাব হয়েছে, তাঁর মধ্যে ইসহাক ফরিদী রহ. অন্যতম। সবচেয়ে বড় কথা, অতি অল্প সময়ে আলেম সমাজের মধ্যে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ঘটেছিল। তাঁর যোগ্যতা, মেধার প্রখরতা, লিখনী, সব কিছুতে তিনি অনেক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন।
আমি বরাবরই জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের ছাত্র। তবে চৌধুরীপাড়া তো আর বেশী দূরে নয়। প্রায় একই মহল্লায় বলা যায়। সে হিসেবে মালিবাগ টু চৌধুরীপাড়া যেন একই পরিবারেরমত যুক্ত ছিলাম। বিভিন্ন প্রোগ্রামে কারণে – অকারণে শরীক হয়েছি। সেই হিসাবে ইসহাক ফরিদী সাহেবকে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।
আমার দেখা এক যুগ শ্রেষ্ঠ আলেম- গবেষক ও কলামিস্ট ছিলেন তিনি। চৌধুরীরপাড়া মাদ্রাসার মোহতামিম এবং শায়খুল হাদীসের পদ অলংকৃত করার পাশাপাশি কঠিন অধ্যবসায়ে সময় পার করতেন। গভীর মুতালায়া, সেই সাথে কলম চালাতেন তিনি। লেখালেখি যেন তাঁর নেশায় পরিণত হয়েছিল। প্রচুর পরিমাণে লিখতেন। এত লেখা, এত সাধনা, খুব আলেমের মধ্যে পাওয়া যায়।
গতানুগতিক কোন লেখা নয়। একেবারে সব ছিল গবেষণা ধর্মী। অসম্ভব পরিমাণে পড়াশুনা, গভীর চিন্তা- চেতনার নির্যাসগুলো তাঁর কলমে ফুটে উঠেছে। সমকালীন আলেম – উলামা এবং লেখকদের মধ্যে প্রথম সারিতে তাঁকে দেখা গেছে। স্পষ্ট তিনি ঝড় তুলেছিলেন কলমের ময়দানে। তরুণ লেখক, কলামিস্টদের আইডল হিসেবে রূপ নিয়ে ছিলেন তিনি।
আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ. শিক্ষক হিসেবেও তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দেশব্যাপি। হাদীসের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কিতাব বুখারী শরিফের দরস দিয়েছেন তিনি মৃত্যু পর্যন্ত। তাঁর দরস সে সময়ে অনেক দ্যুতি ছড়িয়ে ছিল। ইলম পিপাসুদের মণি কোঠায় স্থান পেয়েছিল। দেশ থেকে দেশান্তরে সুনাম- সুখ্যাতি লাভ করেছিলেন তিনি।
আলেম সমাজের কাছে অত্যন্ত গ্রহণ যোগ্য ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে ছিলেন তিনি। শুধু ঢাকা শহর নয়, অল বাংলাদেশের আলেম সমাজের মধ্যমণি ছিলেন। এক নামে তাঁকে চিনত। কি যে কারিশমা তিনি জানতেন, এতটুকু মানুষ, কিন্তু সারা বাংলাদেশের আলেম সমাজের প্রিয় ছিলেন।
পুরো বাংলাদেশের আলেম- উলামা ত্বলাবা এমনকি সর্ব সাধারণের হৃদয়ে স্হান পেয়ে ছিলেন। অনেক বড় বড় হাস্তিগণ ইসহাক ফরিদী সাহেবকে চিনতেন তাঁর গুণের কারণে। এটা এমন গুণ যা সবার মধ্যে পাওয়া যায় না। কিন্তু সে সব গুণের সমাহার ঘটে ছিল তাঁর মধ্যে।
ইসহাক ফরিদী সাহেবের গ্রহণ যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা কেমন ছিল, তা দেখা গিয়েছিল, তার ইন্তেকালের পর জানাযায়। পুরো চৌধুরীপাড়া এলাকায় লোকে লোকারণ্য হয়েছিল। জানাযায় মানুষকে জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আর দেশের প্রখ্যাত আলেম এবং মহারথিদের ভিড় ছিল সেদিন চৌধুরীপাড়ায়।
আমি নিজে আল্লামা আহমাদ শফি দামাত বারাকাতুহুম এর মুখ থেকে ইসহাক ফরিদী সাহেবের গুণের কথা শুনেছি। তিনি ইসহাক ফরিদী সাহেবের জন্য আফসোস করেছিলেন তাঁর ইন্তেকালের পর।
এই মানুষটি প্রিয় উস্তাদ আল্লামা ফরীদ উদ্দিন মাসউদের দুআ ও সোহবাতপ্রাপ্ত ছিলেন। উস্তাদের দুআর বরকতে অনেক উচ্চতায় নিয়ে ছিলেন নিজেকে। সে সব বর্ণনা অবশ্য এই ছোট নিবন্ধে সম্ভব নয়। তবে এতটুকু বলতে পারি, প্রিয় উস্তাদের প্রিয় শাগরেদ। গুরু ভক্তি কি জিনিস দেখতাম চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসায় গেলে। আপন উস্তাদ ফরীদ সাহেবের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ভালবাসা ছিল সীমাহীন। নিজের নামের সঙ্গে ফরিদী যুক্ত করাটাও ছিল উস্তাদের প্রতি ভালোবাসার কারণেই।
গুণী মানুষটি ২০০৫ সনের ৫ জুন সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তিকাল করেন। সেদিন যেন নির্বাক হয়ে পড়েছিল পুরো বাংলাদেশের আলেম সমাজ। কান্নায় বুক ভেসে গিয়েছিল হাজার হাজার নবীর ওয়ারিছের। আজো যেন স্মরণ হয় সেদিনটির কথা। এখনো মনে পড়লে মনের অজান্তে অশ্রু প্রভাবাহিত হয় সকলের।পরিশেষে দুআ করি আল্লামা ইসহাক ফরিদী সাহেবের জন্য। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে সমাসীন করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


