- শেখ নাঈমুল ইসলাম
এদেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষিত শ্রেণি সমাজের প্রান্তিক অবহেলিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার অসংখ্য কারণ বিদ্যমান। এ জন্য অনেকটাই দায়ী নিজেদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়হীনতা, ভুল সিদ্ধান্ত ও চিন্তানৈতিক বৈকল্য। একটা স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে তার পতাকা। একটা মুক্ত স্বাধীন জাতির জন্য পতাকা কতটা জরুরী তা আজ ফিলিস্তিন, কুর্দি, কাশ্মিরীদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই। পতাকার এই গুরুত্ব প্রাচীণ যুগ থেকেই সকল মত, পথ ও ধর্মের অনুসারীরাই মেনে আসছে। ইসলামেও পতাকার অসীম গুরুত্ব রয়েছে যা আমরা ইসলামের বিভিন্ন যুদ্ধাভিযান ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন হাদিস থেকে জানতে পারি।
রাসূলুল্লাহ সা. এর নেতৃত্বে যেকোনো অভিযানে যাওয়ার সময় সাহাবায়ে কেরাম আকাঙ্ক্ষা করতেন যেন পতাকা ধারণের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। কেননা পতাকা ধারণের জন্য সর্বাধিক বিশ্বস্ত ব্যক্তিদেরই নির্বাচন করা হত। পতাকা ধারণ শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত। এক্ষেত্রে একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হযরত সাহাল ইবনে সাআদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি খায়বারের যুদ্ধের সময় রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছেন, আমি আগামীকাল এমন এক ব্যক্তিকে পতাকা দেব, যার হাতে বিজয় অর্জিত হবে। এরপর কাকে পতাকা দেওয়া হবে, সে জন্য সবাই অপেক্ষা করতে লাগলেন। পরদিন সকালে প্রত্যেকেই এ আশা করতে লাগলেন যে হয়ত তাকে পতাকা দেওয়া হবে। কিন্তু নবী সা. বললেন, আলী কোথায়? তাকে জানানো হলো যে তিনি চক্ষুরোগে আক্রান্ত। তখন তিনি আলীকে ডেকে আনতে বলেন। তাকে ডেকে আনা হলো। রাসূল (সা.) তার মুখের লালা তার উভয় চোখে লাগিয়ে দিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি এমনভাবে সুস্থ হয়ে গেলেন যেন তার কোনো অসুখই ছিল না। (বুখারি, হাদিস : ১৮৪৩০)
জিহাদ ও যুদ্ধাভিযানে পতাকা ধারণ শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত
বড়ই আফসোসের বিষয় এ দেশে ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ব্রতী ওলামায়ে কেরামগণ এ দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বের পরিচয় বহনকারী পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতের ব্যাপারে যুগের পর যুগ ধরে উদাসীন। এখানে বাংলাদেশের সম্মান লাল সবুজের পতাকা উত্তলন হয়না। গাওয়া হয়না জাতীয় সঙ্গীতও। উদ্ভট সব যুক্তির বেড়াজালে আবদ্ধ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পতাকা। অথচ এই কওমি মাদরাসায়ই পাকিস্তান আমলে পতপত করে উড়ানো হতো পাকিস্তানের চাঁদতারা খচিত পতাকা, ওলামায়ে কেরামগণও স্বমস্বরে আকাশ পাতাল একাকার করে ভোকাল কর্ড চিড়ে গাইতেন পাক ছার জমিন সাদ বাদ…
অথচ এই কওমি মাদরাসায়ই পাকিস্তান আমলে পতপত করে উড়ানো হতো পাকিস্তানের চাঁদতারা খচিত পতাকা
দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে যে কারোই প্রশ্ন জাগতে পারে, এ দেশের মাটিতে জন্মে এ দেশের আলো বাতাসে নিঃস্বাস নিয়ে এ দেশের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এ দেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় বহন করে স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি এই অবজ্ঞা অনিহা আর অশ্রদ্ধা কেন? পাকিস্তান আমলে তো এই অনিহা কাজ করতো না তাহলে কি এখনো লাখো শহীদের রক্ত আর লাখো মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারছেন না তারা? এখনো কি প্রাক্তন প্রেমিকার মত পরানের গহীন ভিতরে পাকিস্তানের পতাকা রুমাল হয়ে নাড়া দেয়? না কি এ বাধন যুগ যুগ জন্ম জন্মান্তরের ছিঁড়ে যাবার নয়?
দেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় বহন করে স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি এই অবজ্ঞা অনিহা আর অশ্রদ্ধা কেন?
একটা দেশের পরিচয় বহনকারী পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি এই অবজ্ঞা আর অশ্রদ্ধা সেই দেশের স্বাধীনতা এবং স্বার্বভৌমত্বকেই অস্বীকার করার শামিল এই বোধ কি তাদের কাজ করে? এ দেশের কওমি মাদরাসা দেওবন্দী ধারার মাদরাসা সেই দেওবন্দ কিন্তু ঠিকই ভারতের জাতীয় পতাকার প্রতি অগাধ আস্থা ও সম্মান প্রদর্শন করে। যেই হিন্দুর রচিত জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রতি এই দেশীয় আলেম সমাজ নাক সিটকান সেই একই হিন্দু রবীন্দ্রনাথের রচনা করা ভারতীয় জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগনমন-অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা’ যথাযথ সম্মান ও ভক্তির সাথে গাওয়া হয় দারুল উলুম দেওবন্দে। কই তারা তো হিন্দুর রচনা বলে ভারতীয় জাতীয় সঙ্গীতকে বর্জন করেনি!। অন্যদিক পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাও কওমি আলেমদের মতে প্রকাশ্য ফাসিক তার রচিত ‘পাকছার জমিন সাদ বাদ’ও পাকিস্তানের ওলামায়ে কেরাম গেয়ে আসছেন ভক্তির সাথে এমনকি এই দেশ যখন পাকিস্তানের অধিনে ছিলো তখন এখানেও গাওয়া হতো কই তখন তো ফাসিক কবির লেখা বলে তা বর্জন করা হয়নি। তাহলে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে কওমি আলেম সমাজের কেন এই হিপোক্রেসি?
দেওবন্দ কিন্তু ঠিকই ভারতের জাতীয় পতাকার প্রতি অগাধ আস্থা ও সম্মান প্রদর্শন করে
জাতীয় পতাকা এবং সঙ্গীতের প্রতি এই অবজ্ঞা মূলত কওমি আলেম সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব এবং পরিচয়হীনতাই প্রকাশ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে রাজনৈতিক ভুল দিয়ে যার শুরু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ভুলের মধ্যে তারা হাবুডুবু খাচ্ছেন এখনো। একটা স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব কতটুকু একটি ফিলিস্তিন, কুর্দি, কাশ্মীরের দিকে তাকিয়েও কি তারা উপলব্ধি করেন না? একটি পতাকার জন্য লাখো লাখো শহীদের রক্ত দেখেও কি তাদের বোধদয় হয়না? এখনো মুসলমান না বাঙ্গালি না বাংলাদেশি এই অদ্ভুত উদ্ভট পরিচয়হীনতায় ঘুরপাক খাবেন তারা? একজন আরব যেমন মুসলমান হতে পারে তেমনি খৃষ্টান বা ইহুদীও হতে পারে, তেমনিভাবে একজন কুর্দি মুসলমান হতে পারে ইয়াজিদিও হতে পারে, একজন ইরানি মুসলমান হতে পারে পার্সিও হতে পারে, একজন মধ্য এশিয়ান মোঘল, কাজাখ, উজবেক, তাজিক যেমন বৌদ্ধও হতে পারে তেমনি মুসলমান হতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে একজন বাঙ্গালী মুসলিম হতে পারে হিন্দুও হতে পারে একটি তার নৃতাত্ত্বিক পরিচয় আরেকটি ধর্মীয়। মানুষ কখনোই শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় বহন করেনা তার মধ্যে নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তা যেমন থাকে ঠিক তেমনিভাবে তার ধর্মীয় পরিচয়ও বিরাজ করে। এই দুই পরিচয় কখনোই পরস্পর বিরোধী কোন বিষয় নয়। যে কারণেই আমরা গোটা বিশ্বের মুসলমানদের দিকে তাকালে দেখতে পারি আরবের মুসলমান, আফ্রিকার মুসলমান, দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমান, মধ্য এশিয়ার মুসলমান, তুর্কি মুসলমান, কুর্দি মুসলমান, উইঘুর মুসলমান, ককেশীয় মুসলমান, ইরানীয় মুসলমান এদের সবাই মুসলমান হলেও প্রত্যেকের ভাষা, খাবার, পোশাক, জীবন যাপন সবকিছুই আলাদা এই যে বৈচিত্র্য এই বৈচিত্র্য কোথাও এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে মুসলমান হতে বাধা দেয়নি। প্রত্যেকেই যার যার নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং সংস্কৃতি বজায় রেখেই ইসলামের ধর্মীয় পরিচয় বহন করে। শুধুমাত্র এই অভাগা বাংলাদেশের আলেম সমাজই কোন এক অদ্ভুত কারণে নিজেদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় প্রকাশ করতে কুন্ঠাবোধ করেন।
মানুষ কখনোই শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় বহন করে না, তার মধ্যে নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তা যেমন থাকে ঠিক তেমনিভাবে তার ধর্মীয় পরিচয়ও বিরাজ করে।
বাংলাদেশের কওমি আলেম সমাজের বুঝতে হবে একটি নির্দিষ্ট জাতির অংশ হয়ে একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করেও সেই জাতী এবং রাষ্ট্রের পরিচয় দিতে কুন্ঠিত হলে সমাজের মূলধারা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন থেকে যাবেন। আর সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কখনোই সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, বিচার কোথাও কোন প্রভাব কিংবা অবস্থান থাকে না। বারবার ব্যবহৃত হওয়াই তাদের ভাগ্য এবং এইভাবেই একদিন তাদের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যায়। সুতরাং কওমি আলেমগকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা কি সমাজের মূল ধারার অংশ হবেন নাকি অবহেলিত করুণার পাত্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে থেকেই সমাজের মূলধারার মানুষের দ্বারা টেবিল টেনিসের বলের মত ঘা খেয়ে খেয়ে একবার ঐ কোটে আরেকবার এই কোটে মুখ থুবড়ে পড়বেন।
লেখক, ধর্ম ও সমাজ বিশ্লেষক


