- আমিনুল ইসলাম কাসেমী
প্রত্যেকেই আমরা দায়িত্বশীল। সকলকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। কেউ রেহাই পাবে না। সমাজ থেকে নিয়ে রাষ্ট্র। পরিবার থেকে সংসদ পর্যন্ত যে যেখানে আছেন সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। প্রত্যেকের কথা-কাজ সব কিছু সম্পর্কে একদিন মহান রবের নিকট হিসাব দিতে হবে। এজন্য সকলকে এখন থেকে সতর্ক হওয়া দরকার। দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা-কাজ পরিহার করা চাই।
একজন দায়িত্ব পেলে, চেয়ার পেলে, ক্ষমতা পেলে অবিবেচকের মত কথা বলা মোটেও সমীচিন নয়। হিসাব করে কাজ করা উচিত। বুঝে শুনে কথা বলা চাই। যে কথার দ্বারা ফিতনার দ্বার উন্মুক্ত হবে, যে কাজের দ্বারা সমাজে বিশৃংখলা হওয়ার সম্ভবনা, সে গুলো পরিহার করা চাই।
মানুষ আজকাল হুজুগি। কিছু লোক আছে ভাইরাল হওয়ার ধান্দা। কিছু আছে শুধু ফিতনা সৃষ্টি করাই তাদের উদ্দেশ্য। সমাজে অশান্তি এবং অসহিষ্ঞু পরিবেশ কায়েম করাই তাদের মাকসাদ। মানুষকে বিপদে ফেলে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। যেটা দুঃখজনক।
হুজুগে চলছে কিছু মানুষ। কি কারণে তিনি রাস্তায় নেমেছেন সেটা বুঝতে পারে না। তিনি জানেন না কি জন্য রাস্তায় মিছিল-মিটিংএ এসেছেন। অপরের দেখাদেখি ময়দানে নামে। না বুঝে রাজপথে এসে সহিংসতা সৃষ্টি করে। কি কারণে হামলা করছে, কি কারণে অন্যের মালামাল ক্ষতি করছে, সেটা কারোর জানা নেই। এভাবে হুজুগে নেমে যায়। আর কিছু লোক তো আছেই মিথ্যা রটনার কাজে। তিলকে তাল বানিয়ে কথা বলেন। কেউ গুজব ছড়িয়ে দেন।
আজ পর্যন্ত যত আন্দোলন-সংগ্রাম দেখলাম, এর অধিকাংশ হুজুগে চলে। গুজব সৃষ্টি করে মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলা হয়। মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়। এরপর বিক্ষুদ্ধ জনতা রাস্তায় নেমে বিশৃংখলা তৈরী করে। বেপরোয়া ভাবে মাল-সম্পদের ক্ষতি করে। অথচ বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবে দেখলে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরী হয় না।
আচ্ছা, কুমিল্লায় যে ঘটনা ঘটেছে, এটা তো নিঃসন্দেহে ঘৃণ্যতম কাজ। এটা কোন মুসলমান বরদাশ করবে না। ওই ঘটনা যারা ঘটিয়েছেন তারা চরম অন্যায় কাজ করেছেন। এর জন্য অবশ্যই কেউ না কেউ দায়ী। এই ধৃষ্টতার বিচার হওয়া চাই। তবে ওই ঘটনার জন্য তো সকলকে দায়ী করা যায় না। একজন/দুজনের কারণে পুরো সম্প্রদায় দোষ দেওয়া মোটেও ঠিক নয়। তবে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তান্ডব চালানো কি বৈধ? সে যে ধর্মেরই হোক, কোন ধর্মেই কারো মাল-সম্পদের ক্ষতি করা, প্রাণহানি ঘটানো বৈধ নয়, বরং অত্যন্ত গর্হিত কাজ।
আমাদের সমাজের মানুষের এক বদ খাছলত হয়েছে, কি সে হুজুর হোক আর পাবলিক হোক, কিছু ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে ভাংচুর শুরু হয়ে যায়। কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট করা হয়। কোন মায়া-দয়া তখন থাকে না। এমনকি বড় এক হুজুর আটকে গেল রিসোর্টে, তখন তাকে ছাড়াতে কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করে হুজুরকে ছাড়িয়ে আনা হলো।
এদেশের মানুষের একটা বদ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিছু হলে ভাঙচুর হয়ে যায়। বাড়ি ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্টান তছনছ করা হয়। কোথাও অগ্নি সংযোগ করে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা হয়। একজন মুসলমান হয়ে আরেকজনের সম্পদ নষ্ট করা কি বৈধ? মুসলিম হয়ে ভিনধর্মী মানুষের উপর আক্রমণ চালানো কী শরিয়ত সমর্থন করে? মুসলমান হয়ে অন্য ধর্মের উপসনালয়ে আঘাত করা কী জায়েজ?
কারো মাল- সম্পদের ক্ষতি সাধন করা, কারো উপর আত্রমণ চালানো, কোন ধর্মীয় উপসানালয়ে চড়াও হওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। এটা অমার্জনীয় অপরাধ। এজন্য কোন কাজ করার আগে বুঝে-শুনে করা উচিত। কারো তালে তাল দেওয়া মোটেও ঠিক নয়। কোন জিনিস যাচাই-বাছাই ছাড়া অন্যের প্ররোচনায় মাঠে নামা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।
আরও পড়ুন: সম্প্রীতি বজায়ে নজীরবিহীন বাংলাদেশএর আগে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে মানুষকে দেখা গেছে হুজুগে হয়ে ময়দানে গেছেন। গুজবে কান দিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। এরপর কী ঘটেছে সেটা ইতিহাস। কত লোকের প্রাণহানি ঘটেছে সেটার ইয়ত্তা নেই। আমাদের মনে রাখা উচিত, আমরা মুসলমান। ইসলাম আমাদের ধর্ম। আমাদের দ্বীন-ধর্ম এমন, যেখানে শুধু শান্তি আর শান্তি। কোন অশান্তি নেই। ইসলামের কাছে সকলেই নিরাপদ। শান্তি ও নিরাপদ আবাসস্থল হলো ইসলাম। সে যে ধর্মের হোক, যে চিন্তার মানুষ হোক, ইসলামের কাছে সে আমান-নিরাপদেই থাকবে।
কথা-কাজে, লেনদেন,আচার-ব্যবহার, চাল-চলন সবক্ষেত্রে আমাদের মুসলমানিত্ব বজায় রাখতে হবে। আমাদের কাছে ভিন ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকবে। সব কাজে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া চাই। নিজের অর্পিত দায়িত্ব এর কথা মনে থাকা চাই সকলের। আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট


