মিছিল আমাদের বাগড়া মওদুদীদের

মিছিল আমাদের বাগড়া মওদুদীদের

মিছিল আমাদের বাগড়া মওদুদীদের

মাওলানা আব্দুল্লাহ : আলেমগণ সাধারণত সরল-প্রাণ, আল্লাহওয়ালা। মার-প্যাঁচ কম বোঝেন। মানুষকে বিশ্বাস করেন খুব তাড়াতাড়ি।এগুলি সবই ইতিবাচক বিষয়, অর্থাৎ আলেমদের গুণ। অথচ, আলেমদের ওই গুণগুলির সুযোগ নিয়ে ওরা তাঁদের কাঁধে সওয়ার হয়ে বসে। ওরা মিস-গাইড করে আলেমগণকে। শেষমেষ আলেম-উলামার সদিচ্ছাজাত কাজগুলো সফলতার মুখ দেখে না, স্বপ্ন পণ্ড হয়— এক গাদা বদনাম নিয়ে ক্লান্ত-দেহে ঘরে ফেরেন আলেমগণ।

‘ওরা’ কারা? ওরা ঐ স্বাধীনতাবিরোধী চক্র তথা মওদুদীর অনুসারীরা, যারা আলেম-উলামার সংগঠনগুলোতে ও সমাবেশগুলোতে সংগোপনে প্রবেশ করে। আলেমগণের সাথে মেকী সখ্য তৈরী করে। এবং ভিতরে ভিতরে ষড়যন্ত্র করে ‘যথাসময়ে’ আলেমগণের সর্বনাশ করে যায়।

অনেক দিন ধরে দেখছি, আলেমগণ কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের ডাক দিলে সেখানে এসে হাজির হয় ঐ মওদুদীবাদী সংগঠনের প্রতারকরা। একটা মিছিল করতে গেলে, হঠাৎ ওদের লোক ভিতরে ঢুকে পড়ে। মুখোশধারীরা কৌশলে মাইক বা মিছিল বা সভার নিয়ন্ত্রণ তাদের কব্জায় নিয়ে নেয়। এরপরে বিভ্রান্তিকর কথা ও স্লোগান দিতে থাকে ওরাই। উস্কানীমূলক স্লোগান তোলে। অরাজনৈতিক মুভমেন্টে সরকারবিরোধী প্রসঙ্গ তোলে, স্লোগান তোলে। সমাবেত সবাইকে উত্তেজিত করে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে থাকে। এক পর্যায়ে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে বা আশপাশের মানুষের উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ বা হামলা চালানোও শুরু করে তারা।

অথচ যারা মিছিল-মিটিংয়ের আয়োজক, তাদের কিন্তু সরকারবিরোধী কোনো স্লোগান বা উস্কানীমূলক কোনো স্লোগান দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে না। থাকে না শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে আসা কোনো প্রতিবাদ সমাবেশকে সংঘর্ষে রূপ দেওয়ার বিন্দু ইচ্ছা। কিন্তু মওদুদীবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা সমাবেশে ও মিছিলে ঢুকে তার চিত্র পরিবর্তন করে ফেলে।

হুজুরদের সংগ্রাম-আন্দোলন অনেকখানি ন্যায্য। তারা যে দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে নামে সবই যুক্তিযুক্ত। তা ছাড়া আলেমদের আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-মিটিং সবই পরিচ্ছন্ন। তাদের আন্দোলনে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নেই। কোনো জ্বালাও- পোড়াও, গাড়ী ভাংচুর, পুলিশের উপর হামলা, রাষ্ট্রীয় কোনো সম্পদ নষ্ট করা… এসব আলেমগণের কাজ নয়, মুসল্লীদের কাজ নয়, ধর্ম-প্রাণ তৌহিদী জনতার কাজ নয়।

কারণ, আলেমগণ হলেন আল্লাহর খাছ-বান্দা। আল্লাহর ওলী। তারা সকল মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দেওয়ার মন-মানসিকতা রাখেন। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, প্রায় সময়ই দেখা যায়— আলেমগণের সভা-সমাবেশ-আন্দোলন-মিছিলে মওদুদীবাদী সন্ত্রাসীরা প্রবেশ করে বিভিন্ন রকম অঘটন ঘটায়।
সেই ২০০১ সনে আন্দোলনের সময় দেখেছি, ওরা আলেমগণের ফতোয়া বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছিল ওরা, কিন্তু বদনাম হয়েছিল আলেমগণেরই।

২০১৩ সনে হেফাজতের আন্দোলনে অস্থিরতা তৈরী করেছিল ঐ মওদুদীবাদীরা। ওরা আলেমদের কাঁধে সওয়ার হয়ে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিল। এমন অবস্থা তৈরী করেছিল, আন্দোলনের স্টিয়ারিং আর আলেমগণের হাতে ছিল না। কলকাঠি ওরাই নাড়ত। আর নিরীহ আলেমগণ তাতে সাড়া দিতেন।

হেফাজতের আন্দোলনের সময় এত টাকা কোথা থেকে এল? হাজার হাজার মানুষের নাস্তা, পানীয়, আরও কত কী? এসব কারা দিয়েছিল? এখন তারা আবার কোথায় গেল? এখন সেসব নাস্তা গেল কোথায়? আর তাদের মতলব বা কী ছিল? আসলে সবই ছিল ওদের কারসাজি। ওরা বিভিন্নভাবে আলেমদের কাবু করেছিল। একদম দুর্বল বানাতে সক্ষম হয়েছিল তারা। এমন অবস্থা হল, ওরা যা বলে, আলেমগণ তা-ই শোনেন !

শেষ পর্যন্ত যখন ওরা ছলে-বলে আলেমদের কাছে নিয়ে নিল। তখন দেখা গেল ওদের সেই আসল চেহারা।

ওরা শাপলা চত্বরে হেফাজতের আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলল। সেদিন হেফাজতের মধ্যে ঢুকে এমন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাল, যা বর্ণনার ভাষা নেই। রাস্তার দু’পাশের গাছগুলো ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কেটেছিল তারা। দোকান-পাট ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, কোরআন শরীফ পোড়ানো, পুলিশের উপর আক্রমণ, এমন কোনো অনৈতিক কাজ করতে আর বাকী ছিল না সেদিন…!

আলেমদের পরামর্শ হয়েছিল, শাপলা চত্বর গিয়ে বিকেলবেলা প্রোগ্রাম শেষ করে ফেলবে। সেভাবেই অনুমতি নেওয়া ছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ তো চলে গিয়েছিল ওদের হাতে। ওদেরই কু-পরামর্শে সারারাত শাপলা চত্বরে অবস্থান নেওয়ার ব্যবস্থা করা হল। ওরা চেয়েছিল আলেমগণের লাশের উপর দিয়ে দেশে একটা গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে ক্ষমতা দখল করতে। কিন্তু বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সরকারের তা জানতে আর বাকী ছিল না। ফলে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের অবস্থান তুলে নিয়ে ফিরে যাওয়ার আহ্বানও হেফাজতকে জানানো হল। যা কিনা সরাসরি বিভিন্ন টেলিভিশনেও দেখানো হল। অথচ, এরপরও মওদুদিবাদের অনুসারীদের কুচক্রান্তের কাছে সরল-সোজা আলেমসমাজ ফের হেরে গেল। ফলে, রাতে যা ঘটল, তাতো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

পরের দিন মিডিয়ায় সেই মওদুদীবাদীদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের দায়ভার এসে পড়ল নিরীহ আলেমদের উপর। সারাদেশের মানুষের কাছে আলেমগণ হেয় প্রতিপন্ন হলেন, অবিশ্বস্ত হলেন, অরাজনৈতিক আলেমগণ ‘রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের হাতিয়ার’ হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপিত হলেন। এভাবেই নানামুখী চক্রান্ত ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ওরা ঘটালেও তার বদনাম গিয়ে পড়ল আলেম-উলামাদের উপর।

বর্তমান ভোলাতে যে ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। একটু ভাল করে যাচাই করে দেখুন, এর পিছনেও ঐ মওদুদী গ্রুপের চক্রান্ত রয়েছে। আলেমরা নিরীহ। ওনারা ওদের কূট-চাল বুঝতে পারেন না। ফলে, মহৎ-উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া একটা আন্দোলনকে ওরা এভাবে বারংবার কলঙ্কিত করার দুঃসাহস দেখিয়ে চলেছে। ওরাই বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। ওরাই পুলিশকে জিম্মি করে, আক্রমণ করে, উত্তেজিত করে শেষমেষ আলেমদের মার খাওয়ায়।

আসলে মওদুদিবাদীরা হন্যে হয়ে গেছে। ক্ষমতা হারায়ে এখন ওরা সন্ত্রাস-নৈরাজ্য বেছে নিয়েছে। ওরা আলেমগণের নিরীহ পেয়ে সেখানে প্রবেশ করে আন্দোলনকে বারংবার ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চায় এবং করছে।

ফলে— সভা-সমাবেশে আলেমসমাজকে আরও বেশী বেশী সতর্ক হতে হবে, নিজ নিজ লোকদের নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, বিশৃঙ্খল-সৃষ্টিকারীদের প্রথম থেকেই কঠোরভাবে বর্জন করতে হবে, প্রত্যেকের মাদ্রাসা, স্থান ও সংগঠনভিত্তিক পরিচয়পত্র (নাম, ঠিকানা, সাংগঠনিক পরিচয়, অন্যান্য পরিচয়, দায়িত্বশীলদের স্বাক্ষরসহ) বুকে ঝোলানো বাধ্যতামূলক করতে হবে, অঞ্চলভিত্তিক-সংগঠনভিত্তিক-মাদ্রাসাভিত্তিক জনবলকে একত্রে থাকতে বাধ্য করতে হবে (যাতে কেউ ফেক পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ঢুকলে ধরা পড়ে), তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আরও শীতল মাথার অধিকারী হতে হবে, কোনো সভা-সমাবেশ-মিছিল-মানববন্ধন ও বিক্ষোভে যাওয়ার আগে গভীরভাবে ভেবে-চিন্তে-জেনে-বুঝে এগোতে হবে, অপরপক্ষের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছি কিনা সেটাও সব-সময় মাথায় রাখতে হবে… ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে সতর্কতা-বিচক্ষণতা ও কৌশলী ভূমিকার বিকল্প নেই। তা না-হলে ওরা আলেমগণের আন্দোলনে ব্যাপকহারে ঢুকতেই থাকবে। এবং সেখানে ওরা নানামুখী বিশৃংখলা ও অঘটন ঘটাবেই থাকবে। সুযোগ পেলে নানামুখী সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাবে। আর বেকয়দায় পড়তেই থাকবে আলেমগণ…। এসব তীব্র শংকা রয়ে যায়।

যা খুবই দুঃখজনক, বিভ্রান্তিকর ও হতাশার বিষয়। এবং যা কোনো মসলমানের কাছে কাম্য হতে পারে না। এ জন্য আসুন, সাবধান হই ওদের কারসাজি থেকে, সাবধান হই মওদুদিবাদী প্রতারক গোষ্ঠীর সকল ষড়যন্ত্র থেকে।

মহান আল্লাহতা’য়ালা আমাদের সঠিক সময়ে সঠিক বুঝ, হিকমা ও আমাদের সুরক্ষা প্রদান করুন। আমীন।

ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *