মূর্খ ওয়ায়েজ, জাতির কলঙ্ক

মূর্খ ওয়ায়েজ, জাতির কলঙ্ক

মূর্খ ওয়ায়েজ, জাতির কলঙ্ক

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : ওয়াজের মৌসুম শুরু হয়ে যাচ্ছে। জায়গায় জায়গায় অলরেডী ওয়াজ মাহফিল শুরু হয়ে গেছে। আমাদের দেশে সাধারণত আশ্বিন / কার্তিক মাস থেকে মাহফিল শুরু হয়ে আর ফাল্গুন- চৈত্র মাস পর্যন্ত চলে।

এই মৌসুম গুলোতে বৃষ্টি- বাদল কম থাকে। শুস্ক মৌসুম। আবহাওয়া অনুকুলে থাকে সব সময়। এ কারণে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজকগণ এই সময় গুলোতে প্রোগ্রাম দিয়ে থাকেন।

ওয়াজের মৌসুম আসলে সারা দেশের সব জায়গাতে পোষ্টারে ভরে যায়। রাজধানী ঢাকা থেকে নিয়ে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা,ইউনিয়ন, একদম গ্রাম- গন্জে ছেঁয়ে যায় ওয়াজের দাওয়াতের পোষ্টারে।

এ সব ওয়াজে আলেমগণের উপন্হিতি থাকে। বিভিন্ন মাদ্রাসার মুহতামিম, শায়খুল হাদীস,মুহাদ্দিস, মুফতি, মাদ্রাসার সাধারণ মুদাররিস, মসজিদের ইমাম/ খতীব এরকম বিজ্ঞ আলেমগণ ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতা করেন।
এসব আলেমগণ কোরআন হাদীসে পারদর্শি, রাত- দিন কোরআন হাদীস গবেষণা করেন। তারা নিজেরা পড়েন এবংছাত্রদের পড়ান, একারণে এসব ওয়াজ মাহফিলে বিজ্ঞ আলেমদের দাওয়াত করা হয়।

আলেম গণ কোরআন হাদীসের উপরে সারগর্ভ আলোচনা শোনান। স্রোতারাও আলেম- উলামাদের বয়ান শুনে উপকৃত হন। সাধারন মানুষ অনেক অজানা বিষয় জানতে পারেন আলেমদের আলোচনা থেকে।

আমাদের দেশের বহু মানুষ এই ওয়াজ মাহফিলকে পছন্দ করেন। এই ওয়াজ মাহফিলের অপেক্ষায় যেন তারা থাকে। কবে আলেমদের বয়ান হবে, আর তারা কুরআন- হাদীসের আলোচনা শুনে রুহের খোরাক মেটাবে। এই ইন্তেজার করতে থাকে অনেক মানুষ।

বড় পরিতাপের বিষয়, আজকাল ওয়াজ মাহফিল গুলোতে মুর্খ ওয়ায়েজ ভরে গেছে। ওয়াজের ময়দানে এখন মুর্খ বক্তা।

এখন অধিকাংশ বক্তার কোন ইলম নেই। কুরআন – হাদীসের কোন জ্ঞান নেই। আন্দাজে ওয়াজ করেন।

কিছু মুখস্হ ওয়াজ। অন্য বক্তার ওয়াজ মুখস্হ করে সে গুলো স্রোতাদের মাঝে বয়ান করেন।

কিছু বক্তা আছে, ওরা কোন আলেম নয়। মাদ্রাসায় পড়েনি। তারপরেও মাওলানা টাইটেল দিয়ে ওয়াজ করেন। মুফতি নয়, কিন্তু মুফতি লকব লাগাচ্ছেন। মুহাদ্দিস নয় কিন্তু মুহাদ্দিস দাবী করছেন।
আবার কিছু আছে হাফ মাওলানা বা হাফ হাফেজ। মাদ্রাসায় কিছু পড়েছে। কিন্তু দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত যেতে পারেননি। দাওরা পাশ করার আগে ওয়াজের ময়দানে ভর্তি হয়েছেন!
কিছু আছে গানের শিল্পি, আগে গান গেয়ে বেড়াতেন। এখন ওয়াজ করে বেড়ান। অবশ্য ওয়াজের মঞ্চে গানই তার পুঁজি।

কিছু আছে তরিকতের বক্তা। বিভিন্ন জাহেল পীরের ক্যানভাস করে বেড়ায়!! পীরও মুর্খ আবার তার ক্যানভাসার আরো বড় মুর্খ।

এরকম বহু মুর্খ ওয়ায়েজে ময়দান এখন ভরে আছে। ওসব বক্তা যে সব ওয়াজ করেন, তা কারো পাতে দেওয়া যায় না।

আজগুবি কেচ্ছা কাহিনী, কোরআন হাদীসের অপব্যাখ্যা, মিথ্যা উদ্ধৃতি। কোরআনে নেই, হাদীসে নেই, এরকম কথাকে কোরআন- হাদীসের কথা বলে চালায়ে দেন তারা!

আবার গানের শিল্পি ছিলেন যারা, তারাতো গান গেয়ে সময় পার করেন। গান দিয়ে শুরু হয় তাদের ওয়াজ। ওয়াজ যাই করুক, গান গাওয়াটাই আসল।

এসব মূর্খ ওয়ায়েজদের দিয়ে উম্মতের কোন ফায়দা হচ্ছে না। বরং মানুষ গোমরাহীর দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বক্তার যদি কোন ইলম না থাকে। কোরআন – হাদীসের উপর কোন দখল না থাকে। তার যদি কোন বিষয় তাহকীক না থাকে, তাহলে সে কি বয়ান করবে?

মুখস্হ ওয়াজ বা অন্যের ওয়াজ নকল করে ওয়াজ শোনানো, এর দ্বারা কি উপকার আসে মানুষের?

মূর্খ ওয়ায়েজ দ্বারা জাতির কোন ফায়দা হয়না কোনদিন। কেননা, বক্তার ভিতরে কিছু নেই। সে কিভাবে আরেকজনকে নসীহত করবে? বরং সে মানুষকে হেদায়েতের রাস্তা দেখানোর পরিবর্তে গোমরাহীর পথ দেখাবে।

আলেমগণ মহা সমুদ্রের মত। সমুদ্রে যদি পানি থাকে, তাহলে নদী- নালা, খাল- বিলে পানি আসে। কিন্তু সমুদ্রে যদি পানি না থাকে, তাহলে নদী- নালা, খাল- বিলে পানি আসবে কি করে?

যিনি বক্তা, যিনি মানুষকে নসীহত করবেন, তার যদি কোন ইলম না থাকে, তাহলে স্রোতাদের ফায়দাটা কি ভাবে হবে?

কোন ক্রমে সম্ভব নয়, মুর্খ বক্তা বা ওয়ায়েজ দিয়ে জাতিকে সঠিক পথ দেখানো। বরং বক্তার মুর্খতার কারণে স্রোতারা আরো গোমরাহ হবে।

হাদীসের মধ্যে রয়েছে, ” ইজা লাম ইয়াবকি আলেমান, ইত্তাখাজান নাছু রুয়াছা, যখন আলেম থাকবেনা, মানুষ জাহেলদের কে আলেমদের মর্য্যাদায় বসাবে, তাদের কাছে মানুষ শরীয়াতের বিষয়াদী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, তারা ফতোয়া দিবে ইলম ছাড়াই, সে নিজে গোমরাহ হবে এবং জাতিকে গোমরাহ করবে। (মুসলিম শরীফ)

ঠিক বর্তমানে ওয়াজের ময়দানের কিছু মুর্খ বক্তার একই অবস্থা। কোন ইলম তাদের নেই। একদম গণ্ডমূর্খ। তারা সমাজে ওয়াজ করে মানুষকে গোমরাহীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

কেননা, ইলম না থাকার কারণে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। সে নিজে গোমরাহ হচ্ছে, মানুষকে গোমরাহ বানাচ্ছে।

এজন্য সাবধান থাকতে হবে আমাদের মূর্খ বক্তা থেকে। শুধু কোকিল কণ্ঠস্বর আর রং ঢং দেখে বক্তা নির্বাচন করা নয়। দেখতে হবে, বক্তা যোগ্য আলেম কিনা। তিনি তাহকীকের সাথে কথা বলেন কিনা। আবার তাঁর আমল – আখলাক মার্জিত কিনা। এ সব বিষয় গুলো খেয়াল রাখা চাই।

আল্লাহ আমাদের সহী বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *