যাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবেন হজের সফরে!

যাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবেন হজের সফরে!

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : হজের মধ্যে ইসলামের সামগ্রিকতা ফুটে ওঠে। হজে ধর্মীয় চিন্তা ও বিশ্বাসগত দিক ছাড়াও রাজনৈতিক-সামাজিক দিকটিও প্রকাশ পায়। আল্লাহ তায়ালাকে জানা এবং আল্লাহর প্রিয়জন তথা মানবজাতিকে ভালোভাবে জানা ও এসবের আলোকে নিজের দায়-দায়িত্ব পালন ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃতভাবে আল্লাহর প্রিয়ভাজন হতে পারে না। আল্লাহর প্রিয়ভাজন ও একনিষ্ঠ বান্দা হওয়ার জন্য যেসব আত্মত্যাগ ও ধৈর্য দরকার- তার অন্যতম অনুশীলন ক্ষেত্র হচ্ছে পবিত্র হজ।

হজ আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার পথ। নামাজি যেমন নামাজ পড়ার আগে অজুর মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করেন, তেমনি হজযাত্রীকে পবিত্রতা অর্জনের লক্ষ্যে বৈধ উপায়ে অর্জিত ইহরামের পোশাক পরতে হয় এবং গোসলের মাধ্যমে সবধরনের বাহ্যিক ও আত্মিক গোনাহ বর্জনের অঙ্গীকার করতে হয়। মৃত্যুপথযাত্রী যেমন সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন এবং সবার পাওনা বুঝিয়ে দেন, তেমনি হজযাত্রীকেও এ কাজ করতে হয়, অতীতের গোনাহের জন্য তওবা করতে হয়। তাকে ভাবতে হয়, এটাই তার অন্তিম সফর। হজযাত্রী মৃত ব্যক্তির মতো এমন এক স্থানে যাচ্ছেন যেখানে সবাই সমান, শুধু যার সৎকর্ম বেশি তিনি সেখানে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়, কিন্তু দুনিয়াতে আল্লাহর সৃষ্টি মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেই সমান। হজের মধ্যে সবাই পবিত্রতার প্রতীক শ্বেতশুভ্র কাফনের পোশাক পরে ইসলামের সাম্যের চেতনা তুলে ধরেন।

হজযাত্রী সেলাইবিহীন সাদা পোশাক পরে কেবল আল্লাহর অনুগত থাকার শপথ নেন। সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরে এটা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, মৃত্যুর পরে এ পোশাক পরেই আল্লাহর কাছে উপস্থিত হতে হবে। সৎকর্ম ছাড়া গর্বের রংবেরংয়ের পোশাক, পদমর্যাদা, আভিজাত্য ও অহংকার সেখানে কোনো কাজে আসবে না।

ইহরামের তাৎপর্য হলো, আল্লাহর নির্দেশিত হালাল ও হারামকে সবসময় মেনে চলার অঙ্গিকারে অটল থাকা। আল্লাহর ঘর তাওয়াফের অর্থ হলো, তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে মানুষের সমস্ত তৎপরতার চালানোকে লক্ষ্য বানানো, দুনিয়ার ঘর-বাড়ী নয়, আল্লাহর ঘরই মানুষের প্রকৃত ঠিকানা। হাজরে আসওয়াদে হাত রাখা বা চুমো দেওয়ার তাৎপর্য হলো- আল্লাহর যেকোনো নির্দেশ পালনের অঙ্গিকার করা ও তার নিদের্শকে শিরোধার্য মনে করা। সাফা ও মারওয়াতে দৌঁড়ানোর অর্থ হলো- ভয় ও আশার মাঝামাঝি অনুভূতি নিয়ে ইহকালীন এবং পারলৌকিক কল্যাণ লাভের জন্য চেষ্টা সাধনা করা।

আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের তাৎপর্য হলো- আল্লাহ সম্পর্কে জানা, তিনি সর্বশক্তিমান এবং সবকিছু জানেন, সবকিছু তারই কাছে চাওয়া উচিত- এসব বিষয়ে চেতনাকে শানিত করা।

মুজদালিফার খোলা প্রান্তরে রাতযাপন হজের আরেকটি বড় দিক। এখানে রাতযাপনের দর্শন হলো- নিজের মধ্যে খোদাভীতির চেতনা ও স্লোগানকে বদ্ধমূল করা। মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের অর্থ হলো- শয়তানের প্রবঞ্চনাকে চিরতরে দমন করা।

আমরা জানি, সন্তান-সন্ততি মানুষের সবচেয়ে প্রিয়। কিন্তু প্রয়োজনে তাও আল্লাহর জন্য বিলিয়ে দেওয়ার শিক্ষা দিয়ে গেছেন হজরত ইবরাহিম ও হজরত ঈসমাইল (আ.)। কাবা ঘর তাওয়াফ শেষে হাজিকে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হয়। এর প্রতীকী তাৎপর্য হলো- হাজিকে ইবরাহিম (আ.)-এর মতো পবিত্র হতে হবে এবং একনিষ্ঠ একত্ববাদী হয়ে নামাজ পড়তে হবে। এভাবে নিজেকে শুদ্ধ, পবিত্র ও যোগ্য করার পরই একজন হাজি সাহেব প্রকৃত ঈমানদারে পরিণত হন।

বস্তুত মহান আল্লাহর পথে জীবন, সম্পদ ও আমিত্বকে বিসর্জন দেওয়ার এবং সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামি ঐক্যের চেতনাকে শানিত করার বার্ষিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয় হজে। রাজনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণের দিক থেকে হজ ইসলামের শীর্ষস্থানীয় ইবাদত। পবিত্র কোরআনে সূরা হজের ২৭ ও ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানুষকে হজের দিকে আহ্বান করো যাতে তারা নিজের বিভিন্ন কল্যাণগুলো দেখতে পারে।’ হজ সব ধরনের খোদাদ্রোহী শক্তিকে অস্বীকার করার পাশাপাশি ইসলামি ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও সংহতির আলোকোজ্জ্বল প্রকাশ ঘটায়। হজের মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইসলামের পবিত্রতম স্থানে এবং সেখানে একই পোশাকে একই স্লোগান ‘লাব্বাইক…’ বলে সমবেত হয় সারা বিশ্বের সব জাতি ও বর্ণের মুসলিম নর-নারী।

ধর্মীয় কর্তব্য পালনের সঙ্গে সঙ্গে হজের আরেকটি দিক আছে- এর আন্তর্জাতিকতা। বিভিন্ন জাতি, ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও সংস্কৃতির অধিকারী মুসলমানরা মক্কায় সমবেত হন এবং তাদের সবাই খোদার প্রতি বিনম্র ও ভীতবিহ্বল থাকেন। এমন দৃশ্য আর কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এত ভিড় আর জমায়েতের মাঝে নেই কোনো বিশৃঙ্খলা। কারণ, এখানে কোনো ব্যক্তির ডাকে কেউ আসেনি, সবাই এসেছে আল্লাহর ডাকে। তাদের লক্ষ্য একটাই, আল্লাহর নির্দেশ ও আইনকে সবকিছুর ওপরে প্রাধান্য দেওয়া।

পথহারাদের সুপথে ফিরে আসার মাধ্যম হজ। হজের লক্ষ্য শুধুমাত্র আল্লাহর সান্নিধ্য। যেহেতু হজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত তাই তা পালন করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। বিশেষ করে হজের সফরে।

ইসলামি চিন্তাবিদরা তাই পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যাদের কথা-বার্তা ও চাল-চলনে সম্পদ, ক্ষমতা, উচ্চবংশ, আভিজাত্য, শিক্ষা-ডিগ্রি, পদ-পদবী ও রূপ-লাবন্যের অহংকার প্রকাশ পায় এবং যারা নিজের প্রশংসা ও পরিবারের বিজ্ঞাপন দিয়ে বেড়ায় তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকবেন। অহংকার ও আত্নপ্রশংসা শয়তানি চরিত্র। কিয়ামতের দিন নবী করিম (সা.) এই ভয়ংকর চরিত্রের মানুষের প্রতি খুব অসন্তুষ্ট থাকবেন এবং কাছে আসতে দেবেন না।

যারা পরনিন্দা করে, মিথ্যা কথা বলে, মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কটূ কথা বলে, বেশি কথা বলে, গালা-গালি করে, অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায়, অন্যকে পিয়নের মতো হুকুম করতে থাকে, খুব কৃপণতা করে এবং উগ্র মেজাজ দেখায়- এ জাতীয় মানুষকে কৌশলে এড়িয়ে চলুন।

হজের সফরে যাদের সাথী হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন- হজের সফরে কোনো ভালো-অভিজ্ঞ আলেমকে একান্ত সাথী বানাতে পারেন। সম্ভব হলে ব্যক্তিগতভাবে বা সমমনা কয়েকজনে মিলে খরচ বহন করে কোনো অভিজ্ঞ মুক্তাকি আলেমকে নিয়ে হজ করুন, তাকে মেনে চলুন। সহিহ মাসয়ালা ও আমলের কারণে আপনার হজ অর্থবহ হবে- ইনশাআল্লাহ।

এক কথায়, হজের সফরে ভদ্র, সভ্য, মার্জিত, স্বল্পভাষী, শান্ত ও নরম প্রকৃতির ব্যক্তিকে হজ সফরের ঘনিষ্ঠ সাথী বানান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *