যুগে যুগে মওদুদীবাদীদের নগ্ন থাবা
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: মওদুদী সাহেব একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। একজন যুগসেরা কলামিস্ট ছিলেন তিনি। তার বহু লিখনী, বহু বই পুস্তক। এমনকি পবিত্র কুরআনের তাফসীর পর্যন্ত লিখে গেছেন।
তার লিখনীতে মুগ্ধ ছিল সাধারণ মানুষ। প্রাথমিক পর্যায়ে ওলামায়ে হক সমর্থন দিয়েছিলেন মওদুদী সাহেবকে। অনেক আলেম তাকে কাছে টেনে নিয়ে ছিলেন। দিনে দিনে যখন মওদুদী সাহেবের খ্যাতি ছড়াতে লাগল, সর্বমহলে যখন তার পরিচিতি ঘটল, তখনই বেরিয়ে আসল মওদুদী সাহেবের আসল চেহারা।
লাগামহীনভাবে চলতে থাকল তার কলম। কাউকে তিনি ছাড় দিতেন না। নবী আলাইহিস সালাম এবং সাহাবায়ে কেরাম, কুরআন হাদীসের অপব্যাখ্যাসহ বহু ভ্রান্ত- আকিদা বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। তার ক্ষুরধার লিখনীতে বিপর্যস্ত হয়েছিল ইসলাম। আম্বিয়াগণের ব্যাপারে তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য, সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে তার বল্গাহীন কলম চলেছিল।
ওলামায়ে কেরাম মওদুদীকে বারবার সতর্ক করেছেন। কিন্তু মওদুদী সাহেব কোন পরোয়া করেননি। বরং তার লিখনীতে আরো দাম্ভিকতা প্রকাশ পেয়েছে। বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
তার বহু বই পুস্তকে অমার্জনীয় ভুল। তার তাফসীর গ্রন্থ আপত্তিকর। এব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম মওদুদী সাহেবের অনুসারীদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েছেন। ওলামায়ে কেরাম মওদুদী সাহেবের ভ্রান্ত আকিদা বিশ্বাসের ব্যাপারে বারবার তাদের সতর্ক করেছেন। কিন্তু তারা মওদুদী সাহেবের সেই আকিদা বিশ্বাস ছাড়তে বিলকুল রাজী নয়। তারা মওদুদীর আকিদার ওপর অটল-অবিচল।
বর্তমানে মওদুদীবাদীদের অনুসারী যে দল রয়েছে। তার অন্যতম লিডার মরহুম গোলাম আজম সাহেবের বক্তব্য ছিল, জামাতে ইসলামী এবং মওদুদী এক অভিন্ন। অর্থাৎ প্রতিটি কদমে কদমে তারা মওদুদী সাহেবকে অনুসরণ করে চলে। মওদুদী সাহেবের আকিদা বিশ্বাস যতই ভ্রান্ত হোক, ওরা মওদুদীকে ছাড়তে নারাজ।
আমাদের দেশের আলেমগণ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বারবার অনুরোধ করেছেন, আপনারা মওদুদী মতবাদ ত্যাগ করে সহী পথে আসুন। কিন্তু এ কথা তারা কোনদিন গ্রাহ্য করেনি। বরং মওদুদীর ভ্রান্ত মতবাদকে ওরা জান দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে।
রাজনৈতিকভাবে মওদুদী সাহেবে এবং তার অনুসারীরা সব সময় ইসলাম -মুসলমান এবং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল চিরদিন। বৃটিশ আমলে যখন এদেশে ইংরেজ বাহিনী মুসলমান এবং আলেমদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, আলেমদেরকে যখন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছিল। বহু আলেমদের জেলখানায় বন্দী হয়ে থাকতে হয়েছিল, ঠিক তখনই মওদুদী সাহেব বৃটিশদের দালালী করেছিলেন। ওলামায়ে কেরাম যখন এদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিলন, তখনই মওদুদী সাহেব ছিলেন বৃটিশদের গোলাম। এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে ছিল মওদুদী সাহেবের অবস্থান।
এমনিভাবে ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল, এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধে শরীক হয়েছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে। ঠিক তখনই মওদুদী সাহেবের অনুসারীরা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল। তারা পাকিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এদেশে বহু অন্যায় অপরাধে তারা শামিল হয়েছিল।
মানে যত দেশ বিরোধী, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব সময় অবস্থান নিয়েছে তারা। প্রথমে তো ইসলামী আকিদা বিশ্বাসের উপর কুঠারাঘাত করেছে। এমন এমন ফিতনার আভির্ভাব তারা ঘটিয়েছে, যার দ্বারা ইসলামের মৌল প্রাসাদ হুমকির সম্মুখিন। ইসলামী সুরতে ইসলামে প্রবেশ করে, ইসলামের সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করেছে। ঠিক, রাজনৈতিক ভাবে সাধারণ জনতার সামনে ইসলামী সুরতে প্রবেশ করে মানুষকে গোমরাহীর দিকে নিচ্ছে, সেই সাথে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান।
ঐ মওদুদীবাদীরা এদেশের মধ্যে স্বাধীনতার পরে রাজনীতির সুযোগ পেয়ে আবারো সেই ৭১ সনের কায়দায় এদেশের রাজনৈতিক ময়দান এবং শিক্ষাঙ্গনে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। নব্বই দশকের কথা হয়ত অনেকের মনে আছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহ এ দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস এর রাজত্ব কায়েম করেছিল। শিবিরের সাইফুল্লাহ বাহিনী খ্যাত, সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অস্থির ছিল। কত মায়ের বুক খালি করেছে তার হিসাব নেই। কত নিরীহ ছাত্রের পায়ের রগ তারা কেটে পঙ্গু করেছে, তা কিন্তু এদেশের জনগণ ভালো করে জানে। পুরো রাজনীতির ময়দান অস্থির করে রেখেছিল তারা। সর্বশেষ বিগত বেশ কয়েকবছর আগে হরতাল অবরোধের সময় এদেশে পেট্রল বোমা মেরে বহু নিরীহ মানুষকে পরপারে পাঠিয়েছিল। সারা দেশের মাঝে নৈরাজ সৃষ্টি করেছিল তারা।
আপনাদের হয়ত অনেকের মনে আছে, ঐ মওদুদীবাদী জামাত- শিবিরের দল, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাটহাজারী মাদ্রাসায় হামলা চালিয়েছিল। সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় আলেমদের ওপর হামলা এবং জুলুম- নির্যাতন চালাতে দ্বিধাবোধ করেনি। নানান সময়ে আলেমদের ওপর আক্রমণ, আলেমদের ওপর বিভিন্ন সময়ে চড়াও হয়েছে। একজন মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাইফীর ওপরই বিরাশি বার হামলা করেছে সাহাবা বিদ্বেষী এই জনগোষ্ঠী।
যুগে যুগে এই মওদুদীবাদের অনুসারীরা আলেম- উলামা এবং হক্কানী পীর মাশায়েখদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আলেমদের ওপর যত খড়্গ তারা চাপিয়েছে। কখনো কোন আলেম মওদুদীবাদের আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি।
বর্তমান জামানায় মওদুদী পন্হীরা সেই আগের মত অবস্থানে। এখনো তারা সময় সুযোগে আলেমদের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিচ্ছে। আলেমদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছে। নিরীহ আলেমগণই তাদের বড় টার্গেট।
মওদুদী সাহেবের বর্তমান সময়ের চেলা- চামুন্ডারা ঠিক মওদুদী সাহেবের রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছেন। মাঠে ময়দানে সেই কোরআনের অপব্যাখ্যা। সাহাবাদের শানে বেয়াদবীমূলক উক্তি। ভুল মাসয়ালা বর্ণনা। এরকম গোমরাহীর দিকে মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে। আর আলেম সমাজ যদি সেই ভ্রান্ত কথার বিরোধিতা করলেই, ওরা সাথে সাথে সেই আলেমদের শানে বিষোদগার ছড়াতে দেরী করছে না।
মোটকথা, মওদুদী মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে যুগে যুগে ওদের অনুসারীদের কালো থাবায় বিপর্যস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষসহ আলেম সমাজ। বিশেষ করে ওলামায়ে কেরাম এর ওপর বেশী চড়াও হয়েছে এবং ইসলামের ক্ষতি করেছে। সুতরাং আর নয়। এখনই আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার।
লেখক : শিক্ষক


