যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ শিকার প্রতিবন্ধী শিশুরা

যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ শিকার প্রতিবন্ধী শিশুরা

যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ শিকার প্রতিবন্ধী শিশুরা

এমরানা আহমেদ : ১২ বছর বয়সী টিয়া (ছদ্মনাম) রাজধানীর একটি ধনী পরিবারে গৃহকর্মীর কাজ করত। কাজের পাশাপাশি ওই পরিবারের ছোট সদস্যদের সঙ্গে খেলাধুলা করে ভালোই কাটছিল টিয়ার জীবন। কিন্তু গৃহকর্ত্রী এক সময় টের পান, টিয়া তার স্বামীর দ্বারা নিয়মিত যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিষয়টি টিয়ার কাছে তিনি জানতে চাইলে, বাকপ্রতিবন্ধী টিয়া হাত ও চোখের ইশারায় সব ঘটনা খুলে বলে। গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হলে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা জানার পর আমি মেয়েটিকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেই’। গৃহকর্ত্রী সায়মা রহমান অনুতাপের সুরে বলেন, ‘আমাদের মতো পরিবারে যদি একটা শিশু নিরাপদ না হয়, তবে সারা দেশের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সংসার ছাড়তে পারিনি।’

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যৌন নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক হারে দিন দিন বেড়ে চলেছে, যার বেশির ভাগ শিকারই শিশুরা। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী শিশুদের উপর যৌন নিপীড়নের হার ভয়াবহ। বাংলাদেশে প্রতি দুজনে একজন প্রতিবন্ধী শিশু কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুরা। ২০১০ সালে বাংলাদেশ প্রতবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং সেভ দ্য চিলড্রেন পরিচালিত ‘প্রতিবন্ধী শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। দেশের ছয়টি বিভাগের ৭ থেকে ১৮ বছরের ২১৬ জন শিশুর ওপর এ জরিপ চালানো হয়।এতে আরও বলা হয়, নির্যাতক বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিবারের নিকটতম সদস্য।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী শিশুদের ৫১ দশমিক ৩৮ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। প্রতিবন্ধিতার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুরা। এই হার ৩২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এছাড়া শারীরিক প্রতিবন্ধী ৩১ দশমিক ৫৩, শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ১৯ দশমিক ৮১, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীদের উপর নির্যাতন এবং ধর্ষণের হার ১০ গুণ বেশি।

এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল বলেন, ‘আমার চিকিৎসক-জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, প্রায় প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশুই নির্যাতনের শিকার হয় এবং নির্যাতনকারীদের বেশির ভাগই হয় তাদের ঘনিষ্ঠজন। শারীরিক-মানসিক দুর্বলতা এবং তাদের পরিবারের আর্থিক অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে। এসব শিশুর অনেকে স্বাভাবিক শারীরিক তৎপরতা ও যৌন নির্যাতনের পার্থক্যও বুঝতে পারে না। তাছাড়া তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও বুদ্ধি-বিবেচনা ঠিকমতো কাজ না করলেও সংবেদনশীল অঙ্গ ঠিকই কাজ করে। এসব সংবেদনশীল স্থানে স্পর্শ পেলে তারা উত্তেজিত হয়, এমনকি এর মধ্যে আনন্দ খুঁজে পায়। তখন এরা যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না থাকলেও আগ্রহী হয়ে ওঠে। এ ছাড়া এদের খুব সহজেই ফুসলিয়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া যায়। এদের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের ক্ষমতাও স্বাভাবিক শিশুর তুলনায় কম।’

ভাসমান ও প্রতিবন্ধী পথশিশুরা যৌন নির্যাতনের দিক থেকে মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। রাজধানীর কয়েকটি এলাকার ভাসমান প্রতিবন্ধী শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবন্ধী প্রত্যেকটি শিশুই এক বা একাধিকবার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বা হচ্ছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকেই সন্তান জন্ম দিচ্ছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন দেশের অনগ্রসর, বঞ্চিত, অসহায়, প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক এবং জন্মগতভাবে কিংবা অন্য যেকোনো কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কল্যাণ, উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়নের জন্য বহুমাত্রিক সেবা প্রদান করছে। দেশের প্রতিবন্ধী এ জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে দেশের পাঁচটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র চালু করা হয়। এসব কেন্দ্রের সাফল্যের ভিত্তিতে ২০১৪-১৫ অর্থ বছর পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলায় ১০৩টি কেন্দ্র চালু করা হয়।

পর্যাক্রমে সকল উপজেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, অটিজম কর্ণার, টয় লাইব্রেরি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। ইতোমধ্যে স্থাপিত কেন্দ্রসমূহে এ যাবৎ প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ১১ লক্ষ ১৮ হাজার সেবা (ঝবৎারপব ঞৎধহংধপঃরড়হ) প্রদান করা হয়েছে। এ সব কেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ২০১৪-১৫ অর্থ বছর পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার সহায়ক উপকরণও সরবরাহ করা হয়েছে। এসকল সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রসমূহ হতে প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক এবং জন্মগতভাবে কিংবা অন্য যেকোনো কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে সমস্যাগ্রস্থ ব্যাক্তিকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থেরাপি, ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি সেবার পাশাপাশি কাউন্সেলিং, পরামর্শ, তথ্য এবং রেফারেল সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

কার্যক্রম বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট গণপ্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে কর্মরত প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা, ফিজিওথেরাপিষ্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, প্রতিবন্ধী বিষয়ক কনসালটেন্টগণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসারি মাঠপর্যায়ে সেবা প্রদান করে থাকেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সহকারী পরিচালক, পরিচালক, পরিচালকগণ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন নাহার জানান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণায়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্প সেন্টার গত ২০১২ সালের ১৯ জুন প্রতিষ্ঠা করা হয়। উক্ত সেন্টারে ১০৯২১ নম্বরটি টোলফ্রি হেল্পলাইন হিসেবে চালু করা হয়। ইতিমধ্যে হেল্প লাইনের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশু, তাদের পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সকলে প্রয়োজনীয় তথ্য, পরামর্শসহ দেশে বিরাজমান সেবা এবং সহায়তা সম্পর্কে জানতে পারেন। বাল্যবিবাহ বন্ধ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুকে উদ্ধারের ক্ষেত্রে হেল্পসেন্টার কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।

২০১৭ সালের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকের কভারে ১০৯২১ নম্বরটি সন্নিবেশ করা হয়। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর অধিকাংশ দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে এই হেল্প লাইনে ফোন করেন। হেল্প লাইন ৫ ডিজিটের হওয়ায় এই সংখ্যাটি সকলের নিকট তাৎক্ষণিকভাবে মনে রাখা সম্ভব হয় না। এছাড়াও বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে ৩ ডিজিটের হেল্পলাইন জরুরি সেবা হিসেবে বিবেচিত। এই উদ্দেশ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টারের ১০৯২১ নম্বরটি ২০১৭ সালের ১ মার্চ থেকে পরিবর্তন করে ১০৯ নম্বর করা হয়। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর সহায়তার লক্ষ্যে যে কোন মোবাইল ও অন্যান্য ফোন থেকে সরাসরি টোলফ্রি ১০৯ নম্বরে ফোন করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবন্ধী শিশুদের ওপর নির্যাতনের হার বাড়ার একটি অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা। দরিদ্র পরিবারে প্রতিবন্ধী শিশুদের অবহেলা করা হয়। কারণ, তারা পরিবারে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিভাবকেরা এ ব্যাপারে শিশুদের অভিযোগ গুরুত্ব দেন না। আবার অনেকসময় শিশুটিও পরিবারকে তার নির্যাতনের কথা জানাতে বা বোঝাতে সক্ষম হয় না। উন্নত রাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য প্রদত্ত সুবিধার তুলনায় তা আমাদের দেশে একেবারে নেই বললেই চলে। তবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী পরিবারে শিশু নির্যাতনের ঘটনা কম ঘটে। বাজেটে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হলে এবং সকরকে এ বিষয়ে আরো বেশি সচেতন করা গেলে প্রতিবন্ধী শিশুদের ওপর নির্যাতন কমে আসবে। প্রয়োজন শুধু আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *