রাজনীতিতে বিপ্লবী ধারার সাফল্য নেই!

রাজনীতিতে বিপ্লবী ধারার সাফল্য নেই!

রাজনীতিতে বিপ্লবী ধারার সাফল্য নেই!

সগীর আহমদ চৌধুরী : রাজনীতিতে আসলে বিপ্লবী ধারার কোনো সাফল্য নেই। সাফল্য নেই বলেই খাঁটি বামপন্থি ও ইসলামপন্থিরা এককভাবে কখনো ক্ষমতাসীন হওয়ার যোগ্য হয়নি, হবেও না। কথায় কথায় নবী-রাসুলের দুশমন, বাতিল ও তাগুতি শক্তির মোকাবেলা, কাটকাট-মারমার এসব দ্বারা নেতা-কর্মিদের মন-তনে বিপ্লবী ফোটানি ফোটে হয়তো, কিন্তু এছাড়া আর কোনো সাফল্য নেই এর।

সেদিন বলেছিলাম, “রাজনীতিতে ক্ষমতাহীনতার কোনো মর্যাদা নেই।” ইসলামী আন্দোলনের কথাই মনে করুন। ধর্মীয় রাজনীতিতে বিশুদ্ধধারার রাজনীতি তাঁদের, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, নির্ভেজাল, কোনো লেজুড়বৃত্তিও নেই, কারো সাথে আঁতাত আছে সেটা কখনো সাব্যস্ত করা যায়নি। তবুও তাঁদের রাজনীতি সাধারণ্যে জনপ্রিয় নয়, কওমি মাদরাসার একটি বিশাল অংশ তাঁদের রাজনীতির বড় সমালোচক।

পক্ষান্তরে ড. আবু রেজা নদভী যখন আওয়ামী লীগে যোগ দেন তথন তিনি প্রচুর সমালোচিত হয়েছিলেন। একটি সময় এসে তাঁর সাথে কওমি মাদরাসাগুলোর কর্তৃত্বস্থানীয়দের সাথে বিপুল সখ্যতা গড়ে ওঠে, তিনি সাদরে সেখানে বরিত হন, মাহফিলগুলোতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বা রাখার সুযোগ পান। তাঁর আওয়ামী লীগে যোগদানে যেসব বিপ্লবী তাঁর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদেরও কাউকে কাউকে তাঁর সাথে খাতির সম্পর্কও গড়ে তুলতে দেখা যায়। এই যে নদভী সাহেবের এমন সম্মান, সুযোগ ও মর্যাদা এটা কিন্তু তাঁর ক্ষমতার কারণে অর্থাৎ এটা ক্ষমতার মর্যাদা।

মুফতী ফয়জুল্লাহ সাহেবদেরও অনেক সমালোচনা হয়। যদি এভাবে তাঁরা লেগে থাকেন, মনে করুন একদিন কোনো এমপি নির্বাচিত হন তাঁদের ক্ষেত্রেও আজকের এই সমালোচনা বা নিন্দাবাদ অব্যাহত থাকবে না। তাঁরাও বিভিন্ন কওমি মাদরসায় ‘মাননীয় এমপি মহোদয়’ হিসেবে বরিত হবেন, লাল গালিচার সংবর্ধনা লাভ করবেন। কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষার্থীরাও বোধ করি একসময় তাঁদের সমালোচনায় ক্ষান্ত দেবেন। বরং তাঁদের সাথে খাতির সম্পর্ক গড়ে তুলবেন, সুযোগ-সময় পেলে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আহ্লাদিত হবেন, বিনোদিত হবেন। আজকে যে ইতিহাসের কথা বলা হয়, আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কথা বলা হয় সেসব মিথ্যে, দালালি-ফালালির কথা ইতিহাসে লেখা হবে না, লেখা হবে তাঁর এমপি হওয়ার কথা, সংসদে দাঁড়িয়ে কওমিদের প্রশংসায় এক-দুইটা ভাষণ দেওয়ার কথা, তারপর কওমি অঙ্গনে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার কথা।

পক্ষান্তরে ইসলামী আন্দোলনের দুর্ভাগ্য দেখুন। আজকে যেসব কারণে মুফতী ফয়জুল্লাহ সাহেবদের সমালোচনা হয় তাঁদের নিন্দাবাদ জ্ঞাপন করা হয় সেসবের নূন্যতম কোনো কারণই ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে বিদ্যমান নেই। তাহলে যেসব লোকেরা মুফতী ফয়জুল্লাহ সাহেবদের সমালোচনা করে তাঁরা যুগপৎভাবে ইসলামী আন্দোলনেরও কেন সমালোচনা করে? নদভী সাহেবরা যেভাবে মাদরাসাগুলোয় আমন্ত্রিত হন, বরিত হন ও সম্মানিত হন এর নূন্যতম সম্মান ইসলামি নেতৃবৃন্দ কেন পান না? আসলে প্রকৃত কারণ হচ্ছে ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা।’ এখানে মর্যাদাটা আসলে ক্ষমতার, এই কারণেই বলেছিলাম, ‘ক্ষমতাহীনতার কোনো মর্যাদা নেই’ কথাটা।

প্রকৃতপ্রস্তাবে ইসলামী আন্দোলনের সমালোচনার কোনো অন্ত নেই, ২০১৪ বা ২০১৯ সালে সরকারের সাথে আঁতাত না করেও এই সমালোচনা থেকে তাঁদের রেহাই মেলেনি। তার চেয়ে ভালো হতো আঁতাত করেই ক্ষমতার অংশীদার হওয়া। এতে ঠিকই দেখা যেতো স্রোত উল্টো দিকে ঘুরতে, যারা আজকে সমালোচনা করছে তাঁদের মুখেই ‘এমপি সাহেব এমপি সাহেব’ বলে খৈ ফুটতো। মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করীম সাহেব সংসদে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ওলামায়ে কেরামের অবদান বিষয়ে তাঁর জ্ঞানগর্ভ ভাষণটা শুনিয়ে দিতেন দেখতেন, সারা দেশে তাঁর নামে জয়ধ্বনি শুরু হয়ে গেছে। তিনি শীর্ষ মাদরাসাগুলোর শুরা মেম্বার হয়ে যেতেন, সেখানে তাঁল লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হতো। না, তাঁরা বিশুদ্ধ রাজনীতি করেন, খাঁটি, হক, বেজালহীন। রাজনীতিতে এমন সুফি-সাধুতার কোনো মর্যাদা আছে কি?

বস্তুত রাজনীতিতে আঁতাত-সমঝোতা দোষণীয় কিছু নয়। আমার রাজনীতিক পড়াশোনার অভিজ্ঞতা থেকে বলি, তুরস্কে ইসলামি আন্দোলনের অভিভাকপুরুষ প্রফেসর ড. নজমুদ্দীন আরবাকান প্রথমবার ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিলেন একটি সেক্যুলার পার্টির সাথে জোট গঠন করে। ১৯৭২ সালের সেই সরকারে তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তুরস্কে ইসলামি রাজনীতির ভিত্তি গড়তে সেটি ছিল এক বড় মাইলফলক। সেখান থেকেই ইসলামি রাজনীতি উত্তরোত্তর সাফল্য ও শিকড় মজবুতির দিকে এগিয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানেও মুফতী মাহমুদ (রহ.) সীমান্ত প্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ন্যাপ ভাসানীর পশ্চিম পাকিস্তান সভাপতি প্রখ্যাত বাম নেতা খান আবদুল গফফার খানের সাথে রাজনীতিক জোট গঠনের মাধ্যমে।

কাজেই একথা স্পষ্ট, রাজনীতিতে বিপ্লবী ধারার কোনো সাফল্য নেই। রাজনীতিতে একগুঁয়েমি, কাটকাট অবস্থা ও পারষ্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পর্কহীনতার কোনো সাফল্য নেই। রাজনীতিক আদর্শ ভিন্ন হওয়ায় কারো মৃত্যুতে উল্লাস বা শোক প্রকাশে রাজনীতিক শিষ্টাচার পালনে অকৃতজ্ঞতা এমন বিপ্লবী রাজনীতির কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। আমার এমন বক্তব্যকে কেউ কেউ আদর্শচ্যুতি বলছে। সেদিন ড. আবু রেযা নদভীকে যদি সরকার ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মনোনীত করেন সেটাকে স্বাগত জানানোর কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, ভাণ্ডারীর মোকাবেলায় তাঁকে মনোনীতিকরণ ইতিবাচক হবে। সেটা নিয়ে অনেককে বিপ্লবী বয়ান দিতে শুনলাম, তাঁকে ভণ্ড বলতে শুনলাম, ক্ষমতালোভী বলতে শুনলাম এবং নিজে আদর্শচ্যুত বলে ঘোষিত হলাম। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলাম কি কোনো নির্দিষ্ট দলের? এমন একদলদর্শিতার নীতি অবলম্বন করে ইসলামের ফায়েদাটা কি হয়েছে? আপনিই একমাত্র ইসলামের খেদমত করার ঠিকাদার নন, যার দ্বারা যা যতটুকু সম্ভব তাকে দিয়ে তা করিয়ে নেওয়াও ইসলামি আন্দোলনের প্রকৃত তাকাযার মধ্যেই পড়ে।

লেখক : রাজনীতিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *