লেবাননে বিদ্রোহের বিস্তার
#চৌধুরী আতিকুর রহমান
লেবাননে গত প্রায় এক বছর ধরে আন্দোলন চলছিল। মূলত সরকারের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই আন্দোলন ছিল অবিশ্বাস্য রকমের শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর। ঠিক ২০১১-র ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সিরিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ের আন্দোলনের মত।
কিন্তু সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের পর মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গেছে। লেবাননের বেইরুতে বিস্ফোরণটা ভূমিকম্পের রিখটার স্কেলে ৪.৫ এসেছে এবং ১ কিলোটন মানে ছোটখাটো পারমাণবিক বোমার মতো শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে। ১০ কিমি জায়গা ধুলিসাৎ। এখনও পর্যন্ত ১৬০ জন মারা গেছে, নিখোঁজ আরও বেশি, ৬০০০ জন আহত। ৬২০০ টি অট্টালিকা ধ্বংস হয়ে গিয়ে বহু মানুষকে গৃহহীন করেছে।
পুরো বিস্ফোরণটিই ঘটেছে বন্দরে মজুত মারাত্মক বিস্ফোরক অ্যামেনিয়াম নাইট্রেটে। এ ছাড়াও একটি বিদেশি জাহাজ বিস্ফোরক নিয়ে বছর খানেক ধরে বন্দরে সরকারি আধিকারিকদের ঘুষের দাবি না মেটানোয় ঠায় দাঁড়িয়েছিল। সেখানেও বিস্ফোরণ হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার।
শনিবার রাত থেকে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশও পাল্টা রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস ছুঁড়েছে। একজন পুলিশ মারা গেছে। এমনিতেই লেবানন ব্যাংকের দেউলিয়া ও আর্থিক দুর্গতিতে ভুগছে। জনতা দুর্নীতি, আর্থিক দুর্গতি ও বিস্ফোরক সবকিছুর জন্যই বর্তমান সরকারকে দায়ী করেছে। জনতা পররাষ্ট্র, অর্থ, পরিবেশসহ একাধিক মন্ত্রণালয় দখল করে নিয়েছে। শনিবার দিন সকালে জনতা পররাষ্ট্র মন্ত্রকের ভবনটি দখল করে নিয়ে আন্দোলনের প্রধান দপ্তর ঘোষণা করে। নথিপত্র থেকে পাওয়া গেছে কয়েক বছর ধরে ২৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু কোন কথাই কানে তোলা হয়নি। ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশন ভবন দখল করে নিয়েছে। সেখানকার ফাইল এবং রেকর্ড জানালা এবং বারান্দা দিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, ‘হয় পদত্যাগ কর নয়তো ফাঁসিতে ঝোল’।
স্বজনহারা, গৃহহীন, দেউলিয়া মানুষদের এই আন্দোলন সম্ভবত অনেক দূর গড়াবে। এত বড় একটা ঘটনা, যার কারণ হিসেবে সবাই সরকারের অযোগ্যতাকেই দায়ী করছে, তার পরে সরকার যদি আন্দোলনকারীদের উপর বল প্রয়োগ করে, ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সরকারের অন্যান্য অংশ পিছু হটলেও সরকারের অন্যতম অংশ হেজবু যে সহজে পিছু হটবে না, সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।
লেবাননের পলিটিক্যাল স্ট্যাটাস কো হয়তো এই ঘটনার পুরাপুরি পাল্টে যাবে। কিন্তু সেটা আরো কত সহিংসতার পরে, কে জানে?
লেবাননের মারুনীয় খ্রিস্টান প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন। ১৯৯০-এ সাদ্দামের বিরুদ্ধে যে আরব কোয়ালিশন হয় তার বিরুদ্ধে ছিলেন আউন। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে মার্কিনবিরোধী হলেও সিরীয় হাফেজ আল আসাদ মার্কিন পক্ষ নেয়। আউন লেবাননে সিরীয় সামরিক উপস্থিতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। এর জন্যে তাঁর উপর হামলাও হয় এবং বহিস্কৃতও হন। তবে সাদ হারিরির পিতা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি নিহত হলে সিরীয়, হেজবু, ইরানের যোগসাজসের অভিযোগে ২০০৫-এ সিরীয় ফৌজ লেবানন থেকে বিদায় নেয়। এরপরই আউন লেবাননে ফিরে আসেন।
আন্দোলন শুরু হলে সুন্নি প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি জানুয়ারীতে পদত্যাগ করেন। তাঁকে সৌদি বান্ধব বলা হয়। লেবাননের নিয়মানুযায়ী অপর সুন্নি হাসান দিয়াব প্রধানমন্ত্রী হন। তবে তিনি হেজবু নিয়ন্ত্রিত ব্লক দ্বারা সমর্থিত হন।
নাবিহ বেরি একজন শিয়া স্পিকার যিনি হেজবু বান্ধব বলেই সুপরিচিত।
প্রায় পুরো মন্ত্রীসভাটিই হেজবু নিয়ন্ত্রিত। এই মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে আন্দোলন মানে হেজবু, ইরান, সিরিয়া রেজিম জোটের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তাই হেজবু তা কিভাবে মুকাবিলা করে তা দেখার।


