শিশুধর্ষণ ও আমাদের করণীয়

শিশুধর্ষণ ও আমাদের করণীয়

সচেতনতা | শাহ আলম বাদশা 

শিশুধর্ষণ ও আমাদের করণীয়

শিশুধর্ষণ ভয়াবহ এক ব্যাধির নাম। পৃথিবীব্যাপী এর অগ্রায়ন বিদ্যমান। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে বাংলাদেশের ৩৯৯টি শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে । দেশের ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদের ভিত্তিতে ৭ জুলাই ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)’ এ তথ্য তুলে ধরেছে। ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ)’ও একই সময়ে সারাদেশে ৪৯৬টি শিশুধর্ষণের তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ‘শিশু অধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর তথ্য অনুযায়ী, গত ছয়মাসে ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার হওয়া ৩৯৯টির শিশুর মধ্যে ছেলেশিশু ছিল আটটি। ধর্ষণপরবর্তীতে একজন ছেলেশিশুসহ ১৬টি শিশু মারা গেছে । ৩৯৯টি শিশুর মধ্যে ধর্ষণচেষ্টা চালানো হয়েছিল ৪৪শিশুর ওপর। এছাড়া যৌনহয়রানির শিকার হয়েছে ৪৯টি শিশু। যৌনহয়রানির ঘটনায় আহত হয়েছে ৪৭টি মেয়েশিশু এবং দুটি ছেলেশিশু। সংস্থাটির হিসেবে, এর আগে ২০১৮ সালে ৩৫৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এরমধ্যে মারা গিয়েছিল ২২জন এবং আহত হয়েছিল ৩৩৪জন ।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) এর প্রতিবেদনমতে জুন পর্যন্ত, ছয়মাসে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। এরমধ্যে গণধর্ষণ হয়েছে ৫৩টি। ২৭টি প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষিত হয়েছে। ধর্ষণের পর ২৩টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। মোট ২০৫জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আর যৌনহয়রানির শিকার হয়েছে ১২০জন শিশু। প্রতিবেদনানুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে এপ্রিলমাসেই সর্বাধিক ১২২টি শিশু ধর্ষিত হয়। জুনমাসে ধর্ষিত হয় ১১৯টি। ছয় মাসে শিশুহত্যার চেষ্টা হয়েছে ২৮টি। তবে ৯৩টি শিশুর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এরমধ্যে ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০টি, চুরি হয়েছে ১২০টি আর হারিয়ে গেছে ৭২টি শিশু। এরমধ্যে ২৪জনকে মৃত এবং ২২জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আবার অপরিচিত নবজাতক শিশুর মৃতদেহ পাওয়া গেছে ১৬টি। অপরিচিত নবজাতক পাওয়া গেছে ১২টি। এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮৬টি শিশু মারা গেছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৩৫, চিকিৎসার অবহেলায় ১১, বর্বর পিতামাতার হাতে ১৮ এবং অন্যান্য দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৫৪জন শিশু। এছাড়া এসিড সহিংসতার শিকার ২, বাল্যবিয়ের শিকার ৮ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আহত হয়েছে ২৭টি শিশু। তবে গত ছয়মাসে ৯টি শিশুহত্যা, আটটি ধর্ষণ ও চারটি যৌনহয়রানি মামলার রায় হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।

অনেক সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শিশুধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে নানাকারণ উল্লেখ করেছেন । এব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনবিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান পর্নোগ্রাফির অবাধ প্রবাহকে শিশুধর্ষণের প্রধানতম কারণ বলে মনে করেন। তার মতে, ‘মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষ ভোগবাদী। নৈতিকতা, ধর্ম ও আইন এই ভোগবাদকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু নৈতিকতার অধঃপতনের পাশাপাশি আইনেরও যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং বিচারহীনতার এমন অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে দাবি জানান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিমও অল্পকথায় ধর্ষণ ও হত্যার মূলকারণ হিসেবে ‘নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি এবং বৈধভাবে জৈবিক চাহিদাপূরণের সুযোগ না থাকাকে চিহ্নিত করেছেন। যা এখন বিকৃতির পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বর্তমানে শিশুধর্ষণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গবেষক ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির পরিবর্তনও এর পেছনে দায়ী শুধু আইন করে ধর্ষণের মতো অপরাধ কমানো যাবে না। এজন্য প্রয়োজন প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা আরও জোরদার করা।

ধর্মীয় শিক্ষার অভাব নৈতিকতা এবং চারিত্রিক অবক্ষয়ের কারণে সমাজে এ অবক্ষয় এবং বিকৃতি। এর পেছনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে অবাধ পর্নগ্রাফি। টিভি, সিনেমা-নাটক ইত্যাদির পাশাপাশি মোবাইল, কম্পিউটারে, সিডি-ডিভিডি, ইত্যাদির মাধ্যমে পর্নগ্রাফির প্রসার ও সহজলভ্যতা এ বিকৃতিকে আরো উস্কে দিচ্ছে। এমন মানসিক বিকৃতির চিকিৎসা তাই শুধু জেল-জরিমানা ও শারীরিক শাস্তি হতে পারে না। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে শুধু প্রতিবাদসভা এবং মিছিল কার্যকর মাধ্যম হতে পারে না। ধর্ষকদের দ্রুতবিচার ও শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি মানসিক বিকৃতির মূলোৎপাটনে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক চর্চা এরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাভিত্তিক ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থা। সকলপ্রকার অশ্লীলতা ও পর্নভিত্তিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার সাথে সাথে এবং ব্যাপক গণসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের নৌতিকতা ও জীবনবোধকে উন্নত করা এখন সময়ের দাবী।

সরকার ইতোমধ্যে হাজার-হাজার পর্নসাইট ব্লক করেছে, যদিও এখনো এ ধরনের সবগুলো সাইট এখনো বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এসব পর্ণসাইট দ্রুত ব্লক করতে পারলে মোবাইলের মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়া যৌনবিকৃতির প্রকাশ অনেকটাই কমে যাবে। ২০১৮ সালে হাইকোর্ট কর্তৃক দেশের সকল পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট ব্লক করার নির্দেশের প্রেক্ষিতে সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টিকারী পর্ন ও জুয়ার সাইট বন্ধ করার কাজ চলছে পুরোদমে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানান গত কয়েকমাসে ২২ হাজার পর্নসাইট বন্ধ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী পর্নসাইট, বিশেষত শিশুপর্নগ্রাফি সাইটগুলো বন্ধ করার পর বাংলাদেশেও সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফেসবুকের পর্নপেজ ও গ্রুপছাড়াও ইমো (Imo), হোয়াটস-অ্যাপ (Whats App), বিগো (Bigo), ইয়ালাসহ কিছু চ্যাটিং-সাইট আছে, যেখানে অর্থের বিনিময়ে প্রকাশ্যে আপত্তিকর কার্যক্রম চলে। এতে যুবকশ্রেণী মারাত্মকভাবে বিকারগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামাজিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে যাচ্ছে।

চরিত্র অমূল্য সম্পদ। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ রয়েছে, when money is lost, nothing is lost; when health is lost some thing is lost; when character is lost, everything is lost’- শুধু আইন প্রণয়ন বা ধরপাকড় করে তা বন্ধ করা যাবেনা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে মূল্যবোধ এবং নীতি নৈতিকতার চর্চাই পারে কেবল বিকারগ্রস্থতা থেকে আমাদের রক্ষা করতে। আমাদের শিশু, কিশোর ও তরুনদের অবক্ষয়ের জোয়ার থেকে তুলে আনতে স্বচ্ছ, সুন্দর, পবিত্র জীবনের স্বাদ দিতে এখনই সময় সকলের সচেতন হবার। আর তা না হলে , প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অপব্যবহারে সর্ব্বোচ্চ ধ্বংসের দিকে ভেসে যাবে আমাদের জীবন ।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *