সপ্তম নৌবহর আসার আগেই বিপর্যস্ত পকিস্তানি বাহিনী

সপ্তম নৌবহর আসার আগেই বিপর্যস্ত পকিস্তানি বাহিনী

যৌথ বাহিনীর অগ্রাভিযান

সপ্তম নৌবহর আসার আগেই বিপর্যস্ত পকিস্তানি বাহিনী

মানজুম উমায়ের : ১৯৭১ সালের এদিনে বিভিন্ন রণাঙ্গনে অব্যাহত থাকে যৌথ বাহিনীর অগ্রাভিযান। মূলত: বড় শহরে-নগরে ঘেরাও হয়ে পড়ে যুদ্ধে বিপর্যস্ত পাকিস্তানি বাহিনী। এই দিনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মুলতবি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব তৃতীয়বারের মতো সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর ফলে বাতিল হয়ে যায়।

এদিকে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী ঢাকার পতন দ্রুততর করার প্রয়োজনে যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে। কেননা ঢাকার পতন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পরাজয় চূড়ান্ত হবে। তাই সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের উপকূলে পৌঁছানোর আগেই পতন চূড়ান্ত করতে চাইছিল যৌথবাহিনী। তবে এত দ্রুত যে, ঢাকা আক্রমণ করা সম্ভব হবে এটা ধারণাতেও ছিল না ভারতীয় সেনাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াইয়ের কারণেই দ্রুত মিত্রবাহিনী ঢাকার দিকে এগুতে পারছে এ কথা প্রত্যেক ভারতীয় সামরিক অফিসারই স্বীকার করেন। প্রশংসা করেন মুক্তিবাহিনীর।

একাত্তরের এই দিনে পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে মিত্রবাহিনী ঢাকার প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। ৫৭ নম্বর ডিভিশনের দুটো ব্রিগেড এগিয়ে আসে পূর্ব দিক থেকে। উত্তর দিক থেকে আসে জেনারেল গন্ধর্ব নাগরার ব্রিগেড এবং টাঙ্গাইলে নামায় ছত্রীসেনা। পশ্চিমে ৪ নম্বর ডিভিশনও মধুমতি নদী পার হয়ে পৌঁছে যায় পদ্মার তীরে। রাত ৯টায় মেজর জেনারেল নাগরা টাঙ্গাইল পৌঁছেন। ব্রিগেডিয়ার ক্লের ও ব্রিগেডিয়ার সান সিং সন্ধ্যা থেকে টাঙ্গাইলে অবস্থান করছিলেন। রাত সাড়ে ৯টায় টাঙ্গাইল ওয়াপদা রেস্ট হাউসে তারা পরবর্তী যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বসেন। এই দিন লে. কর্নেল শফিউল্লাহর ‘এস’ ফোর্স ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে ঢাকার উপকণ্ঠে ডেমরা পৌঁছায়। সৈয়দপুরে এই দিনে আত্মসমর্পণ করে ৪৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়কসহ ১০৭ পাকিস্তানি সেনা।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্বার আক্রমণের মুখে দেশের নানা প্রান্তের বিভিন্ন এলাকা একে মুক্ত হতে শুরু করে। যৌথ বাহিনীর অগ্রবর্তী সেনাদল শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী অতিক্রম করে ঢাকার পাঁচ-ছয় মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। বালু নদীর পূর্বদিকে পাকিস্তানি বাহিনী এক শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এই দিনে বগুড়ায় মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দল মহিমাগঞ্জের দুলুর নেতৃত্বে ও সিহিপুরের বাবলু, খালেক, হামিদ, খলিল, নূরুল, শুকু, ফিনু, জগলু, হাল্লু, লিন্টু এবং আরো অনেকের সহযোগিতায় সুকানপুকুর রেল স্টেশনের কাছে সিহিপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহী একটি স্পেশাল ট্রেন ডিনামাইটের সাহায্যে ধ্বংস করে দেয়। এতে প্রায় দেড়শ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।

মুক্তিবাহিনী কুমিল্লায় চাওড়া এলাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। এই সংঘর্ষে দুই জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও তিন জন আহত হয়। ৮ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনী একদল পাকিস্তানি সেনাকে রাজাপুর নামক স্থানে এম্বুশ করে। এই এম্বুশে পাকবাহিনীর চার জন সেনা নিহত ও দুই জন আহত হয়। মুক্তিবাহিনী কুষ্টিয়া জেলার প্রতাপপুর এলাকায় এম্বুশ করলে পাকিস্তান বাহিনীর ১১ জন সেনা নিহত ও চার জন আহত হয়। ২ নম্বর সেক্টরে সুবেদার মেজর লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে এক প্লাটুন যোদ্ধা লক্ষীপুর রাজাকার ঘাঁটি আক্রমণ করলে বহু রাজাকার হতাহত হয়।

৬ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সহায়ক সেনাদের সম্মিলিত বাহিনীর বীর যোদ্ধারা ভূরুঙ্গামারী পাকিস্তান সেনা অবস্থানের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। এই যুদ্ধে বহু পাকিস্তানি সেনা নিহত ও তিন জন পাঞ্জাবি সেনা বন্দি হয় এবং ভূরুঙ্গামারী থানা মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *