মাসউদুল কাদির :: সুনির্দিষ্ট কিছু শর্তের বাধ্যবাধকতায় প্রাইভেটাইজেশন বা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল সরকারি ১৩৪টি বস্ত্র ও পাটকল; কিন্তু শর্ত মেনে চালু রাখা তো দূরের কথা, রীতিমতো হরিলুট করে পৈতৃক সম্পত্তির মতো মিলের জায়গা বেচাবিক্রির ঘটনাও ঘটেছে একাধিক পাটকলের ক্ষেত্রে। যুগান্তরের এক খবরেই উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এ চিত্র। কারখানা বন্ধ রাখা যাবে না, এর ধরন বদলান যাবে না, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের সব পাওনা পরিশোধ করতে হবে, জমি, গাছপালা ও যন্ত্রপাতিসহ যে কোনো সম্পদ বিক্রি বা মালিকানা পরিবর্তন করতে হলে সরকারের অনুমতি লাগবে- এসব শর্তে ৩৫ বছর আগে সরকারি পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে ছাড়া হয়। কিন্তু সরকারের ১৩শ’ কোটি টাকা পাওনা পরিশোধ তো করা হয়ইনি, উল্টো কারখানা বন্ধ রেখে সরকারি জমিগুলো বিক্রি করে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির কাছে। এমনকি সেগুলোতে আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন তুলে ভাড়া দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আমরা মনে করি, চুক্তি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মিলগুলো ফের চালু করা দরকার।
আশার কথা, এরই মধ্যে নিয়ম লঙ্ঘনকারী ৬৯টি বস্ত্র ও পাটকল সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। যে ক’টি পাটকলে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে অন্যতম হল চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলিতে অবস্থিত ঈগল স্টার টেক্সটাইল মিলস। বিটিএমসির পাওনা পরিশোধ না করেই মিলটি বন্ধ রেখে আইপিও এবং সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে এর মালিকানা পরির্তন করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, কারখানাটির ২৫.৮৭ একর জায়গার মধ্যে ২১.৯৪ একরই একাধিক হাউজিং ও আবাসন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। ১১ মে মিলটি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বিটিএমসি। আমরা মনে করি, পর্যায়ক্রমে শর্তভঙ্গকারী অন্য কারখানাগুলোও বিটিএমসি ও বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফের চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি পাওনা আদায় ও অন্যান্য শর্ত লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ার বিকল্প নেই।
বর্তমানে পাটের সুদিন ফিরছে। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে সোনালি আঁশের হারানো গৌরব ফিরে আসছে। এরই মধ্যে পাটের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারের মাধ্যমে অর্থকরী ফসলটির ওপর আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাট থেকে চা উৎপাদনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সফলতা পেয়েছে। এমতাবস্থায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতে ছাড়ার পর চুক্তি লংঘিত হওয়া বস্ত্র ও পাটকলগুলো আবার চালুর উদ্যোগ ফলপ্রসূ হতে পারে। এছাড়া চালু অবস্থায় লোকসান দেয়া পাটকলগুলোর দিকেও নজর দেয়া প্রয়োজন। একটা বিষয় আমাদের বোধগম্য নয়, কেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছাড়া অন্যরা কোনো কাজ করতে পারেন না। হাজার ব্যস্ততার পরও তাকেই যদি সবকিছু দেখতে হয়, তবে অন্য পদস্থ ও দায়িত্বশীলদের কাজ কী?
অস্বীকার করার উপায় নেই, এক সময় পাট ও পাটজাত পণ্যে আমাদেরই নেতৃত্ব ছিল সারা বিশ্বে। পাটের নানামুখী ব্যবহার এখন বেড়েছে বিধায় সেই অবস্থান ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলা যায়। বেসরকারি খাতে দেয়া চুক্তি লঙ্ঘনকারী, বন্ধ হয়ে যাওয়া ও রুগ্ন সরকারি পাটকলগুলো ফের চালু করার মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি ও রফতানি আয় বাড়ানোর সুযোগ এসেছে। ‘সোনালি আঁশের দেশ’র গৌরব ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।


