সুচিশুদ্ধতা এবং শব্দহীন বেদনার ডাক

সুচিশুদ্ধতা এবং শব্দহীন বেদনার ডাক

ফাতাহ যুবাইদ ● আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ইতিহাস খুবই করুণ! কেউ না বুঝলে অন্তত আমরা বুঝি পরাধীনতার অভিশাপ কতটা বেদনাদায়ক। একান্ন থেকে একাত্তরের বীভৎস চিত্র এখনো ইতিহাসের গায়ে মোড়ানো। সেদিনের ৭১ ও ১৭- এর যেন অপয়া, অশুভ বার্মিজ বর্বরতা দুই মেরুর অভিন্ন শক্তি। যেখানে পাকিস্তান-মিয়ানমার একাকার।

২০১৭ সালটি পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে মিয়ানমারের কলঙ্ক নিয়ে। প্রশ্ন জাগে সভ্য পৃথিবীতে এখনও মানুষ এতটা অসভ্য, বর্বর হয় কীভাবে? কথিত বৌদ্ধ ধর্মের কথিত ধর্মীয় বিদ্বেষের ‘বিষ’ আজ পৃথিবীকে অস্থির করে তুলেছে। বিশেষত মুসলিম দেশগুলোকে। খুনি এ মানুষগুলো জানে না এই পৃথিবীতে সব মানুষের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে? পৃথিবীর শৃঙ্খলার জন্য পৃথিবীটাকে নানা দেশে ভাগ করা হয়েছে। গায়ের রং মুখের ভাষা এবং ধর্মের জন্য নির্দিষ্ট এ জাতিগোষ্ঠী তথা রোহিঙ্গাদের উপর চলমান বর্বরতা চলতে পারে না। অন্তত সভ্যতার দাবিদার এ পৃথিবীতে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদেরকে ধীরে ধীরে সেদেশ থেকে বিতাড়ণের এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তাদের পদচিহ্নও যেন সে দেশে না থাকে এর জন্য যা যা করা দরকার সবই করছে তারা। মিয়ানমার মিলিটারী ও সরকারের দাবি হলো- তারা সে দেশের নাগরিক না হত তাদের এ দাবি যেন পাহাড়দ্বীপ ও বাতাস দলিলের মতো। পক্ষান্তরে ইতিহাস সাক্ষি দেয় যে, এ রোহিঙ্গারা সে দেশের-ই নাগরিক।

১৪৩০-১৭৮৪ ঈ. পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল বিশিষ্ট রোহিঙ্গা স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। রাজা নারা মেখলা ১৪৩০-১৪৩৪ঈ. পর্যন্ত রাজা হিসেবে রাজ্য পরিচালনা করেছেন। পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং বাংলার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আরাকানে বাংলার ইসলামী স্বর্ণ মুদ্রা চালু করেন। ১৪৩৩ সালে সুলতান জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ শাহের মৃত্যু হলে রাজা নারা মেখলার উত্তরসূরীরা ১৪৩৭ সালে রামু, ১৪৫৯ সালে চট্টগ্রাম দখল করে। ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানের দখলে ছিল। সর্বপ্রথম বার্মিজ রাজা বোদাওয়ায়া আরাকান রাজ্য দখল করলে আরাকান রাজ্য বৌদ্ধদের দখলে চলে যায়। ১৭৮৪ সালে বার্মা তথা মিয়ানমার আরাকান রাজ্য দখল করে নেয়। তখন থেকে আরাকানে মুসলমানদের প্রতিকূল অবস্থা শুরু হয়। পরে ১৮২৬ সালে মিয়ানমারের সাথে বৃটিশদের যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। বৃটিশরা মিয়ানমারকে বৃটিশদের অধীনে নিয়ে আসে। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার বৃটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এতে আরাকানে মুসলমান তথা রোহিঙ্গাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়; ১৯৬২ সালে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে রোহিঙ্গাদের প্রতি ধীরে ধীরে নির্যাতন চালাতে থাকে। তাদের নির্যাতনের সে ধারাবহিকতা ২০১৭ সালে এসে পৃথিবীর চরম পৈশাচিকতায় রূপ নেয়।
আরবীতে একটি প্রবাদ আছেÑ কামা তাদিনু তুদানু- যেমন কর্ম তেমন ফল। মিয়ানমারের হয় তো জানা আছে ইতিহাস কখনো কাউকে ছাড় দেয় না।

খবরের ভাষ্য অনুযায়ী বর্তমানে মিয়ানমারের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সাধারণ জনতা দলমত নির্বিশেষে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যা খুবই প্রসংশার দাবি রাখে। কিন্তু এ রোহিঙ্গা মুসলিমদের স্থায়ী সমাধান নিয়ে সরকারসহ পুরো দেশকে এখনই ভাবতে হবে। আরাকানের মুসলমানদের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতঃ বিশ্ব ঐক্য গড়ে তোলার বিকল্প কোন পন্থা নেই। ভয়ের কথা হলো- চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক এ রোহিঙ্গা শরণ ার্থী শিবিরগুলোতে কোন মিশনারীর ধর্মান্তরিত করার অশুভ কর্মপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে সযতœ ও সতর্ক থাকা জরুরি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারসহ সচেতন মুসলমান, আলেম উলামাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অশুভশক্তি এই সুযোগে পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদান বানানোর পাঁয়তারা করবে নাÑ এমন ধারণা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

নাফ নদীর তীরে হত্যাকরা মানবতাকে বাঁচাতে হলে অতি ভদ্র সু চি’র শুদ্ধতা এখন সময়ের দাবি। নতুবা শব্দহীন বেদনার ডাকে প্রকম্পিত হবে পৃথিবী। ভস্ম হয়ে যাবে শান্তির কালোচেয়ার।

● অক্টোবর ২০১৭, মাসিক পাথেয়, প্রবন্ধ

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *