স্বাস্থ্য। ডা. এম মামুন
সুস্থ কিডনি : সবার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা
কিডনি মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। এই অঙ্গ ছাড়া দেহের কাজ চলে না। পিঠের নিচের দিকে মেরুদণ্ডের দুই পাশে একটি করে দু’টি শিম বিচির আকৃতির অঙ্গটিই কিডনি বা বৃক্ক, যার আকৃতি ৮ থেকে ১২ সেন্টিমিটারের মতো। প্রতিটি কিডনির ভিতরে লাখ লাখ কোষ থাকে, যা নেফ্রন নামে পরিচিত। এই নেফ্রনগুলো শরীরের রক্ত ছেঁকে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বিপাকীয় আবর্জনাগুলো বের করে দেয় তাই কিডনিকে আমাদের শরীরের পরিশুদ্ধির অঙ্গ বলা চলে।
প্রতিবছর ১২ মার্চ বিশ্ব কিডনি দিবস পালন করা হয়ে থাকে। কিডনি রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাই এই দিবসটির মূল লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক নেফরোলজি সোসাইটির উদ্যোগে ২০০৬ সালের পর থেকে প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বৃহস্পতিবার কিডনি দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। “Prevention to Detection and Equitable Access to care” যার বাংলা ভাবার্থ করা হয়েছে, কিডনি স্বাস্থ্য সবার জন্য সর্বত্র প্রতিরোধ, সনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় সমান সুযোগ।
কিডনি রোগ কখনও আগাম জানান দিয়ে আক্রমণ করে না। তাই কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং এ জন্য নিয়মিত পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। কিডনি রোগ প্রতিরোধযোগ্য। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা। প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগের কারণ নির্ণয় করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনি বিকল হওয়া প্রতিরোধ করা যায়। কিডনি অকোজো হলে শরীরে দূষিত পদার্থ জমে যায়, ফলে নানান উপসর্গ দেখা দেয়। কিডনি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং শরীরে রক্ত তৈরি করতে সহায়তা করে। তাই কিডনি অকেজো হলে শরীরে রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং রক্তচাপ বেড়ে যায়। এছাড়া কিডনি আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যেমন- ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ইত্যাদি পদার্থগুলো সমতা রক্ষা করে, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং কিডনির কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনির রোগ নিরাময় করা সম্ভব এবং কিছু পদক্ষেপ নিলে কিডনি রোগের প্রতিরোধ সম্ভব। একজন কিডনি রোগী তার শরীরের দু’টি কিডনিই যখন ৬০ থেকে ৭০ ভাগ বিকল হয়ে পড়ে তখনই তিনি এ রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। এ কারণে রোগ ধরা পরার পর রোগী চিকিৎসার জন্য খুব কম সময়ই পান। দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমূল্যের ডায়ালিসিস করানোর মাধ্যমে কিডনিকে সচল রাখা যায়। তবে এর খরচ ব্যয়বহুল হওয়ায় বেশির ভাগ রোগীর পক্ষেই এর চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া কিডনি পাওয়া সাপেক্ষে কিডনি প্রতিস্থাপনের খরচ কমবেশি হলেও ৫-৭ লাখ টাকা এবং পাশাপাশি সারা জীবন ঔষধের খরচ চালাতে হয়।
বর্তমান বিশ্বে হু হু করে বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যা। তবে এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা সঠিকভাবে গণনা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ২৪ বছর আগে পৃথিবীতে কিডনি রোগীর অবস্থান ছিল ২৭তম। ২০২০ সালে এর অবস্থান ৬ষ্ঠ। অনুমান করা হচ্ছে ২০৪০ সালে ৫ম স্থানে জায়গা করে নেবে কিডনি রোগের অবস্থান। বিশ্বে ৮৫ কোটির অধিক লোক কিডনি রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশে ২ কোটির অধিক লোক কিডনি রোগে আক্রান্ত।
যাঁদের ডায়াবেটিস আছে অথবা যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিস আছে, যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে বা পরিবারের কারও কিডনি সমস্যা আছে, তাদের বছরে অত্যন্ত এক বার কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কিডনি অকার্যকর হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো ডায়াবেটিস, নেফ্রাইটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনিতে জীবাণুর আক্রমণ, সিসটিক ডিজিজিস, বিশৃঙ্খল জীবন-যাপন। আর ভেজাল ও কৃত্রিম খাবারের এ যুগে বড়ো একটি সমস্যা হলো কিডনিতে পাথর। রক্তের ইউনিয়া ক্রিয়েটিনিন লেভেল পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম ইত্যাদির মাধ্যমে কিডনি সমস্যা পরীক্ষা করা যায়। রোগ ধরা পড়লে নিয়ম অনুযায়ী চলাফেরা ও খাওয়া দাওয়া করলে সুস্থ থাকা যায়। দৈনিক ৮-১০ গ্রাম পানি পান করা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা, নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম করার মাধ্যমে কিডনি রোগী স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে। মনে রাখতে হবে কিডনিকে সুস্থ রাখতে হলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
কিডনি রোগের মধ্যে সবচেয়ে জটিলতম হলো দু’টি কিডনি ফেইলিউর বা বিকল হওয়া। এ রোগকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। আকস্মিক বা এ কিউট কিডনি ফেইলিউর এবং দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রমিক কিডনি ফেইলিউর একিউট কিডনি ফেইলিউর রোগের চিকিৎসা কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করলেই ভালো হয়ে যায়। যেমন- ডায়রিয়া, বমি ও রক্ত আমাশয়ের কারণে রক্ত পড়ে ও লবণশূন্য হয়ে কিডনি বিকল হতে পারে। তাই দ্রুত খাবার স্যালাইন খেতে হবে। প্রয়োজনে শিরায় স্যালাইন দিতে হবে। রক্তক্ষরণ হলে শরীরে রক্ত দেওয়া কিংবা বিভিন্ন ইনফেকশনজনিত রোগের যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে একিউটি কিডনি রোগ নিরাময় করা সম্ভব। শিশুদের গলা ব্যথা, জ্বর ও ত্বকে খোস পঁচড়ার দ্রুত সঠিক চিকিৎসা করা উচিত কারণ এগুলো থেকে কিডনি প্রদাহ বা নেফ্রাইটিস রোগ দেখা দিতে পারে। আরো বেশি জটিলতা হলে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে। কিডনিতে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে, বিশেষ করে বয়স্কদের বেলায়। তাই প্রস্রাবের যে কোনো লক্ষণ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শুরুতে শনাক্ত হলে কিডনির ক্যান্সার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। কিডনিতে পাথর হতে পারে। সেক্ষেত্রেও প্রতিরোধ ও নিরাময় সম্ভব।
সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং কিছু নিময়কানুন মেনে চললে, কিডনি রোগ অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা যায়। তাছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত চেকআপ ডায়েট কন্ট্রোল, হাটাচলা বা ব্যায়াম, প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। কোনোক্রমেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের কিডনির কার্যকারিতা প্রতি ৬ মাস অন্তর পরীক্ষা করা উচিত। যাদের ঝুঁকি রয়েছে তাদের বছরে একবার হলেও নিয়মিত কিডনি ফাংশন টেস্ট করা উচিত।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রলজি ২০২৫ সালের মধ্যে আকস্মিক কিডনি বিফলের কারণে মৃত্যুর হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছে। কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও মিডফোর্ড হাসপাতাল কিডনি রোগ বিভাগ স্থাপিত হয়েছে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অভ্ কিডনি এন্ড নিউরোলজি কাজ করে যাচ্ছে। সরকার জনগণের সুচিকিৎসায় ব্যাপারে বদ্ধ পরিকর সরকার গ্রাম ও শহর পর্যায়ে অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপন করেছে। যাতে জনগণ স্বল্পমূল্যে তারা তাদের চিকিৎসা পায়।
কিডনি সচেতনতা নিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। পরিবার থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে কিডনি ভালো রাখার আলোচনা করা উচিৎ। শিক্ষকদের মাধ্যমে স্কুলে কিডনি রোগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা, সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের যথাযথ অংশগ্রহণ এমনকি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোও যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে।
সর্বোপরি কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যমে, চিকিৎসকসহ সমাজের সব সচেতন মানুষকে এগিয়ে আসা উচিত।
লেখক : কলামিস্ট
১১/০৩/২০২০


