স্মৃতির এ্যালবামে আল্লামা আশরাফ আলী রহ,
মাওলানা আমিনুল ইসলাম :: ছাত্র জীবন থেকে আল্লামা আশরাফ আলী (কুমিল্লার হুজুর) এর নাম শুনতাম। সবচেয়ে বেশী শুনেছি, আমার প্রিয় উস্তাদ, মালিবাগ জামেয়ার শায়খে ছানী আল্লামা জাফর আহমাদ দামাত বারাকাতুহুম এর মুখে। তিনি যেন কথায় কথায় কুমিল্লার হুজুরের কথা তুলে ধরতেন। বহুবার শুনেছি জাফর সাহেবের মুখে কুমিল্লার হুজুরের কথা।
মাওলানা জাফর আহমাদ সাহেবের খাস উস্তাদ এবং মুরুব্বী ছিলেন আশরাফ আলী সাহেব। যার কারণে সব সময় তাঁর গুণগান শুনতাম। এরকম বহু আলেমের কাছ থেকে কুমিল্লার হুজুরের কথা শুনেছি। হুজুরের ইলম, বুজুর্গি সম্পর্কে জেনেছি তখন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তখন তাঁর সাথে আমার কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। শুধু আলেম- উলামার মুখে শুনে শুনে কুমিল্লার হুজুরের ভক্ত বনে গিয়েছিলাম।
২০০৯ সালের কথা। সেবার মালিবাগ মাদ্রাসার সাবেক মোহতামিম আল্লামা কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব রহ, হজব্রত পালন করেছিলেন। আমরা সেই জামাতে ছিলাম। সে সময়ে কুমিল্লার হুজুর আমাদের সেই জামাতে হজ পালন করার জন্য টাকাও জমা করেছিলেন। আমরা বড্ড খুশি হয়েছিলাম। কুমিল্লার হুজুরের কথা সব সময় শুনে থাকি, কিন্তু দেখা হয়নি কোনদিন, এবার হয়তো হুজুরের সাথে সাক্ষাত হবে।
দুঃখের বিষয়, পারিবারিক কারণে আর আমাদের জামাতের সাথে হুজুর যেতে পারলেন না। আমরা হুজুরকে না পেয়ে অনেক খানি দুঃখ পেয়েছিলাম তখন।
এরপরেও অনেক বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু কুমিল্লার হুজুরের সাথে আমার কোনদিন সাক্ষাত হয় না। ইতিমধ্যে মালিবাগ জামেয়ার মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস আল্লামা কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব ইন্তেকাল করলেন। কাজি সাহেবের সেই স্থানে কুমিল্লার হুজুরকে আনা হল। হুজুর মালিবাগে আসা যাওয়া শুরু করলেন। প্রতিদিন নয়। সপ্তাহে একদিন বা দুইদিন তিনি আসতেন। কিন্তু ঠিক ঐ সময়ে হয়ত আমার ঢাকা যাওয়া হত না। আমি থাকি রাজবাড়ি। ঢাকা থেকে রাজবাড়ি বেশ দূরের পথ। আবার নিজের ওপর তো মাদ্রাসার জিম্মাদারী। মনে চাইলে তো আর যাওয়া যায় না। তাই তাঁর সাথে সাক্ষাতটা অপুরনীয় হয়েছিল।
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আল্লামা আবুল ফাতাহ ইয়াহইয়া সাহেব রহ, তখন অসুস্থ। একদিন মালিবাগ মাদ্রাসায় গেলাম। তখনই মাদ্রাসার দফতরে আশরাফ আলী সাহেবের সাথে সাক্ষাত হয়ে গেল।
আমি এতদিন যা শুনে ছিলাম, হুবহু মিলে গেল। আপাদামস্তক বুজুর্গির ছাপ। চেহারা ফুটফুটে। শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। কথাবার্তা অতি সাধারণ। নিরহংকার একজর মানুষ।
জীবনের প্রথম সেদিন তাঁকে দেখেছিলাম। হৃদয়ে যেন আরো ভক্তি- ভালবাসা স্থান করে নিল। আগে ছিলাম শুনে শুনে আশেক, সেদিন সরাসরি সাক্ষাতে তাঁর খাঁটি প্রেমিক বনে গেলাম।
আলেম – উলামা ছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে আশরাফ আলী সাহেবের বুজুর্গির কথা শুনেছি। আমার একজন বন্ধু, যিনি একজন বড় ডাক্তার। দীর্ঘদিন যাবত কুমিল্লা শহরে ডাক্তারী করেন। বাসা তার কুমিল্লা কাসেমুল উলুমের পাশেই। সেই বন্ধুটির কাছ থেকেও কুমিল্লার হুজুরের বহু গুনগান শুনেছি।
আসলে একজন বে- মেছাল আলেম ও বুজুর্গ ছিলেন আল্লামা আশরাফ আলী সাহেব। হাজার হাজার মুফতি, মুহাদ্দিসের উস্তাদ তিনি। তাঁর হাতে হাজারো প্রতিভাবান আলেম তৈয়ারী হয়েছে।এদেশের বহু খ্যাতিমান আলেম তিনি নিজ হাতে গড়েছেন। আজকে যে সব আলেমদের সৌরভ দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে, এর সব কিছু আশরাফ আলী সাহেবের অবদান। নিজ হাতে গড়েছেন সে সব আলেমদের।
আশরাফ আলী সাহেবের অবদান এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার পরতে পরতে। কওমী মাদ্রাসাকে এক অনন্য উচ্চতায় নেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল তাঁর। বিশেষ করে কওমী সনদের স্বীকৃতির জন্য তাঁর মেহনত ছিল চোখে পড়ার মত। রাত দিন মেহনত করেছেন তিনি।
এছাড়াও এদেশের আলেম সমাজকে এক ফ্লাট- ফরমে নিয়ে আসা, আলেমদের কে ফেরাকে বাতেলা থেকে ফেরায়ে হক- হক্কানিয়্যাতের ওপর চালানো কোশেশ ছিল তার।
বাতিলের সাথে ছিলেন আপোসহীন। উম্মাহ এর দরদ নিয়ে কাজ করে গেছেন নিঃস্বার্থ ভাবে। তাঁর ইখলাস আর মেহনতের কারণে বাংলাদেশের সর্ব স্তরের আলেমদের মাঝে গ্রহন যোগ্যতা তৈয়ারী হয়েছিল। গোটা বংলাদেশ ভারত সহ এই উপমহাদেশের আলেমদের অন্যতম মুরুব্বী হিসেবে পরিগণিত হয়ে ছিলেন।
নিজের জন্য কিছু করেননি। দেশের জন্য, দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে এবং এদেশের মুসলিমদের ঈমান- ইসলাম হেফাজতের কাজ করেছেন।
মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব যখন অসুস্থ। ইন্তেকালের কয়েকদিন আগের কথা। সে সময়ে বহু মানুষ তাঁকে দেখতে গিয়ে ছিল। এমনকি রাষ্ট্রের কর্ণধর গণ ও তাঁকে দেখার জন্য হসপিটালে গিয়েছে। সেই অসুস্থ অবস্থায় তিনি দেশের মানুষের ঈমান হেফাজত করার কথা ভুলে যাননি।
হসপিটালের বেডে শুয়ে শুয়ে তিনি কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলনের কথা তুলে ধরেছেন। কাদিয়ানী সম্প্রদায়, যারা মুসলিমের ঈমান নিয়ে ছিনি মিনি খেলছে, তাদের অমুসলিম ঘোষণা করার দাবি করে গেছেন।
আসলেই একজন তাকওয়া বান ব্যক্তি ছিলেন তিনি। জীবন সায়াহ্নে এসে মানুষের ঈমান হেফাজতের ব্যাপারে ফিকির করেছেন তিনি। নিজের অসুস্থতা অসুস্থ মনে করেননি। দ্বীনের কাজে আজীবন নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন দ্বীন ইসলামের অকুতোভয় সৈনিক।
মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক


