হাটহাজারী সংকটে মাওলানা যাকারিয়া রহ. হতে পারেন অনুসরণীয়

হাটহাজারী সংকটে মাওলানা যাকারিয়া রহ. হতে পারেন অনুসরণীয়

হাটহাজারী সংকটে মাওলানা যাকারিয়া রহ. হতে পারেন অনুসরণীয়

মুহাম্মদ রবিউল হক ❑ মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরি রহ.। তিনি মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি র. এর খলিফা। আবু দাউদ শরীফের ভাষ্যগ্রন্থ ‘বযলুল মাজহুদ’ এর লেখক মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুরের মহাপরিচালক এবং শায়খুল হাদিস। ১৩৪৪ হিজরিতে হজব্রত পালনের মনস্থ করলেন তিনি। এজন্য মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলবি রহ.-কে সদরুল মুদাররিসীন নিযুক্ত করলেন। তখন পর্যন্ত ‘বযলুল মাজহুদ’-এর রচনা সম্পূর্ণ হয়নি। মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলবি হযরত সাহারানপুরি র.-এর কাছে বিনীত নিবেদন করলেন, হযরত তাহলে ‘বযলুল মাজহুদ’ রচনার কী হবে? [হযরত সাহারানপুরি বযলুল মাজহুদের তাকরির লিখে দিতেন আর যাকারিয়া র. তার মুসাবিদা ও চূড়ান্ত কপি করতেন।]

হযরত সাহারানপুরি রহ. বললেন, আমি ও তাই ভাবছি। শায়খ যাকারিয়া বললেন, তাহলে আমিও আপনার সাথে হজ্বে চলি। হযরত সাহারানপুরি বললেন, সফরের ব্যয় ভারের কি হবে? হযরত যাকারিয়া বললেন, ঋণ নিয়ে নিবো। হযরত সাহারানপুরি বললেন, হ্যাঁ! তোমার বেতনও তো কয়েক মাসের বাকি আছে। শায়খ বললেন, আমি তো অনেক আগেই বেতন গ্রহণ করার চুক্তি বাতিল করে দিয়েছি। হযরত সাহারানপুরি বললেন, চুক্তি এক পক্ষ থেকে বাতিল হয় না।

হযরত সাহারানপুরির আদেশে শায়খ তাঁর বকেয়া বেতন গ্রহণ করলেন। বকেয়া বেতন ৯৪০ বা ৯৪২ টা হয়। যদিও শায়খুল হাদিস এই সফর থেকে ফিরে এসে পরবর্তী বর্ধিত টাকাসহ মোট ২৭১৭ টাকা মাদরাসায় পরিশোধ করে দেন।

উল্লেখ্য যে, এই সফরে শায়খুল হাদিস ইমামে দারুল হিজরত হযরত মালিক ইবন আনাস রহ.-এর মুয়াত্তা শরীফের ভাষ্যগ্রন্থ ‘আওজাযুল মাসালিক’ রাসূল সা.-এর রওযা মুবারকের পাশে বসে লেখা শুরু করেন। যা ১৫ খন্ডের বিশাল কলেবরে প্রকাশিত এবং মালেকি মাযহাবের বিশ্বকোষ হিসেবে সমাদৃত।

এই সফরে হযরত খলিল আহমদ সাহারানপুরি ‘জান্নাতুল বাকী’তে অন্তিম শয্যায় শায়িত হতে মদীনায় স্থায়ী থেকে যাওয়ার সংকল্প করেন। তিনি একটি পত্রে শায়খকে ‘শায়খুল হাদীস’ উপাধি ও নায়েবে নাযিম (ভাইস প্রিন্সিপাল) পদে নিয়োগপত্র লিখিতভাবে দিয়ে দেন। শায়খ যাকারিয়া রহ. এতে খুব বিব্রতবোধ করেন। অনেক অনুনয় বিনয় করে এবং হযরত আব্দুল কাদির রায়পুরীর মাধ্যমে নায়েবে নাযিমের পদ থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। খলিল আহমদ সাহারানপুরি আবেগঘন পরিবেশে শায়খকে ইজাযত ও নিজের পাগড়ি পড়িয়ে দেন।

বিস্তারিত জানতে শায়খুল হাদীস যাকারিয়ার আত্নজীবনী গ্রন্থ ‘আপবীতী’ (যাকে শায়খ ‘তারিখে কবির’ হিসেবে উল্লেখ করতেন) এবং সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রচিত ‘হায়াতে শায়খুল হাদীস যাকারিয়া কান্ধলবি রহ.’ পাঠ করা যেতে পারে।

১৩৪১ হিজরীর শাওয়াল মাসে (১৯২৩ ইং) দরস শুরু করেন ১৩৮৮ হিজরী (১৯৬৮ ইং) পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। চোখে পানি আসার পর দরস প্রদান থেকে অব্যাহতি নেন কিন্ত গ্রন্থ সংকলনের কাজ এবং ‘মুসালসিল’ ইজাযত দানের কাজ শেষ পর্যন্ত অব্যাহত রাখেন।

পদ-পদবি বা দায়িত্ব হতে অব্যাহতি নেওয়া অনেক বড় উদারতার কাজ। এটা তো সায়্যিদুনা হাসান ইবন আলী রা. এর সুন্নত।

আমাদের আকাবিরদের কর্মপন্থা এমনটিই ছিলো। তারা পদ-পদবি গ্রহণ করাকে কখনো গুরুত্ব দেন নি। বরং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বকে আমানত মনে করতেন এবং এর কোন প্রকারের খিয়ানত না হয় সে ব্যাপরে সচেষ্ট থাকতেন। আমরা যদি তাদের এই কর্মপন্থা অনুসরণ করতে পারতাম তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। কোন দায়িত্ব, পদ-পদবি নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিতো না। পদ-পদবি বা দায়িত্ব হতে অব্যাহতি নেওয়া অনেক বড় উদারতার কাজ। এটা তো সায়্যিদুনা হাসান ইবন আলী রা. এর সুন্নত।

ইদানীং দেখা যায় কোন মাদরাসার পরিচারক নিয়োগ কেন্দ্র করে উক্ত মাদরাসা শুধু নয়, সকল মাদরাসার ছাত্ররা আলোচনা সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। কোন এক পক্ষের সম্পর্কে বেফাঁস মন্তব্য করতে থাকে। পক্ষে বিপক্ষে কাঁদা ছোড়াছুড়ি চলতে থাকে। এসব কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হওয়ার কারণে নিজেদের গণ্ডির বাহিরে চলে যায়। সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌছে যায়। যা কোন ভাবেই কাম্য হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যমপন্থা ও ভারসাম্যপূর্ণ মন্তব্য করা উচিৎ।

১৩৮০ হিজরী (১৯৬০ সালে) দারুল উলুম দেওবন্দ এবং ১৩৮২ হিজরীতে (১৯৬২ সালে) সাহারানপুর মাদরাসায় ছাত্ররা ধর্মঘট শুরু করে। ১৩৯০ হিজরী (১৯৭০ সালে) দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায়ও ছাত্ররা ধর্মঘটের ডাক দেয়। তখন শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. খুব মর্মাহত হোন এবং এ জাতীয় ধর্মঘটে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের সাথে সবধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেন। মুসালসাল সনদ ও বা’য়াত প্রদানের পূর্বে ঘোষণ করতেন যারা কোন মাদরাসার ধর্মঘটের সাথে সম্পৃক্ত তারা এর অন্তর্ভুক্ত হবেন না।

শায়খ এই নাযুক পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে ‘রাসায়েলে স্টাইক’ নামে একটি ছোট পুস্তিকা রচনা করেন। আর সবাইকে কাসিম নানুতবী রহ. এবং রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি রহ.-এর জীবনী পড়ার নসিহত করতেন। পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে আকাবিরগণ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়লে রচনা করেন ‘আল ই’তিদাল ফি মারাতিবির রিজাল’ বা ইসলামি রাজনীতি। (২৫৯ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি মূলত এক তরুণের চিঠির জবাব।)

মুজাদ্দিদে আলফ ছানীর বিদআত বিরোধী চেতনা, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবির জারিকৃত হাদীস প্রচার-প্রসারের বাতিঘর, এই কওমী মাদরাসাগুলো। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা মাদরাসাগুলো আমাদের আকাবিরদের রুহানি বাগান। এগুলো সংরক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের।

এই সব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকগণ ইখলাস, তাকওয়া, লিল্লাহিয়াত এবং ত্যাগ তিতিক্ষার মূর্ত প্রতিক হবেন। আর শিক্ষার্থীদের হতে হবে জ্ঞানপিপাসু, পরিশ্রমী এবং আনুগত্যের প্রতিচ্ছবি। তবেই টিকে থাকবে দ্বীনের এই মোহাফেজ খানাগুলো।

লেখক : শিক্ষক, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *