হিন্দু গৃহবধুর সৎকারে সামিল হল গ্রামের মাওলানা থেকে বহু মুসলিম যুবক
পাথেয় টোয়েন্টিপোর ডটকম : ভারতে এনআরসি, সিএস ও এনপিআর নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যতই মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরীর চেষ্টা করুক না কেন বাঙালিরা যুগে যুগে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে যে সম্প্রীতির বাঁধন তৈরি করেছে তা কোনদিনই নষ্ট করতে পারবে না। তা আবারো প্রকাশ্যে এলো মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা থানার মৃদাদপুর গ্রামের এক ঘটনায়। ৫-৬ টি গ্রাম মিলে প্রায় দশ হাজার লোকের বসবাস। তার মধ্যে রয়েছে একটি মাত্র হিন্দু পরিবার। প্রতিবেশী কয়েকজন হিন্দু থাকলেও তারা বহুদিন আগে চলে গেছে শহরে। কিন্তু গুরু পদ রবিদাসের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছে এই গ্রামে। গুরু পদ রবি দাসের বাবা, মা, দাদু-দিদা সবার মৃত্যু হয়েছে এই গ্রামে। কিন্তু হিন্দু পরিবার বলে কেউ তাকে উপেক্ষা করেনি বরং পাশে থেকেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকশো পরিবারের মানুষ। আশে পাশে যত মুসলিম পরিবার রয়েছে প্রত্যেকের অতি আপন ছিল এই গুরুপদ রবিদাসের পরিবার। বুধবার গুরুপদ রবিদাসের স্ত্রী রাজকুমারী রবিদাসের মৃত্যু হয়। রাজকুমারী গ্রামের প্রত্যেক মানুষের কাছে দাইমা নামে পরিচিত ছিল। আর এই দাইমার মৃত্যুতে এলাকার মানুষের শোকের ছায়া।
বুধবার সকাল থেকেই রাজকুমারী রবিদাসের বাড়ির সামনে কয়েক শো পুরুষ মহিলা বসে রয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই এক পলক দেখার জন্য অধীর আগ্রহে বসে রয়েছেন। গুরুপদ রবিদাসের স্ত্রীর মৃত্যুতে সৎকার করার জন্য এগিয়ে এসেছেন মাওলানা আব্দুল হক, আব্দুল লতিফ, ইব্রাহিম সুমুরুদ্দিন ,শাজাহান সেখ, মেরাজ শেখ-এর মত অনেকেই।আর গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায় মানুষকে নিজের আত্মীয় ভাবেন গুরুপদ রবিদাসের পরিবার।গ্রাম থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে দুটো বড় গাড়ি এবং একটা টাটা সুমো ভাড়া করে সৎকার করতে বের হলেন গ্রামের মানুষেরা। আর তাতে নেতৃত্ব দিলেন মাওলানা আব্দুল হক এর মত অনেকেই।
মাওলানা আব্দুল হক বলেন, আমরা ছোট থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি গ্রামের শেষ প্রান্তে বাস করেন এই গুরু পদ রবিদাস পাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি মুসলিম পরিবার প্রত্যেকে খবর রাখেন এই গুরু পদ রবিদাসের পরিবার কেমন আছে। কিন্তু গুরু পদোর স্ত্রীর অসুস্থতার খবর শুনে নিয়মিতই খবর রাখতেন গ্রামবাসীর।
মাওলানা আব্দুল হক বলেন, অত্যন্ত দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী এই পরিবারের জন্য গ্রামের মানুষ সব সময় সহযোগিতা করে এসেছে তাই আজ গুরুপদোর স্ত্রীর মৃত্যুতে সৎকারের জন্য গ্রামবাসী এগিয়ে এসেছে। গোটা গ্রামবাসী মিলে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা তুলে গাড়ি ভাড়া করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। প্রাথমিক কাজকর্মের জন্য চাঁদা তোলা হয়েছে। মৃতার বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের এসেছে তাই গ্রামবাসী মিলে খাবারের ব্যবস্থা করেছে তারা। ফলে এই দুস্থ পরিবার টির পাশে রয়েছে গোটা গ্রাম। আর সৎকার করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এই গোটা গ্রামেরই মানুষ।
তিনি বলেন, আমরা বাঙালি যারা একে অপরের সুখ দুঃখে সবসময় পাশে থেকেছি, তাতে কোনো মতেই আমাদের মধ্যে কেউ বিভেদ তৈরি করতে পারবে না। আর এই বিভেদ তৈরি করতে পারবে না বলেই এক হিন্দু মহিলার মৃত্যুতে শত শত মুসলিম পাশে দাঁড়িয়েছে। সব যাত্রায় শ্মশান পর্যন্ত গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে হাজির হয়েছেন আবদুল হক, ইব্রাহিম ,শাজাহান ,মেরাজ, আব্দুল লতিফ এর মত গ্রামের মানুষেরা। তাদের একটাই কথা আমাদের মধ্যে হিন্দু মুসলিম কোন বিভেদ নেই। দেশের শাসক দল যতই হিন্দু-মুসলিম বিভেদ তৈরি করুক না কেন আমাদের সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকবে আগামী দিনেও।
– ভারতে থেকে আবদুল ওদুদ


