পাথেয় রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনপ্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৯০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে এ দাবি জানিয়েছে সরকারবিরোধী জোটটি।
সেইসঙ্গে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ১৩টি চিঠি দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও জোটের সবচেয়ে বড় দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
২২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবের কাছে ওই কর্মকর্তাদের তালিকাসংবলিত চিঠি জমা দিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১৩টি চিঠি নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়।
চিঠি দেওয়ার পর মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা এমন আচরণ করছে, মনে হচ্ছে ভোট থেকে সরে যেতে বাধ্য করার জন্যই তারা তড়িঘড়ি করছে। আমরা অবিলম্বে সার্বিক বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সিইসির নির্দেশনা চেয়েছি, যাতে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে।’ তা ছাড়াও ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য পুলিশের দলবাজ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব না দেওয়া জন্য বলেছি। পুলিশের ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপারের মতো পদধারী ৬০ জনের বেশি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছি। যাঁরা সমতল মাঠকে অসমতল করার কাজে ব্যস্ত, তাঁদের নাম, পদবি, কর্মস্থলসহ সকল তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে দিয়েছি।’
বিএনপির প্যাডে মির্জা ফখরুলের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে দেওয়া একটি তালিকায় ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদসহ জনপ্রশাসনের কয়েকজন সচিব, জ্যেষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কয়েকজন জেলা প্রশাসকের নাম রয়েছে। আরেক তালিকায় পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৭০ জন কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তাঁদের অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
বিএনপির ওই ১৩ দফার মধ্যে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, অন্য এলাকার লোকজনকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, ‘দলকানা’ লোকদের পদায়ন, সার্কিট হাউজে ইসি সচিব ও মুখ্যসচিবের কথিত ‘রুদ্ধদ্বার’ বৈঠকের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
জনপ্রশাসন ও পুলিশের ‘দলবাজ’ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার, ‘পুলিশের তথ্য অনুযায়ী’ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ না দেওয়া, গণমাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিজ্ঞাপন ও সরকারের উন্নয়নের প্রচার বন্ধ করার দাবি রয়েছে।
চিঠিতে জনপ্রশাসন সচিব, ইসি সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগ, চট্টগ্রাম ও খুলনার বিভাগীয় কমিশনার; চট্টগ্রাম, ভোলা, কুমিল্লা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, ঝিনাইদহ, খুলনা, কুষ্টিয়া, নড়াইল, ময়মনসিংহ, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রাজশাহী ও সিলেটের জেলা প্রশাসকদের (রিটার্নিং অফিসার) প্রত্যাহার চেয়েছে বিএনপি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম তার চিঠিতে বলেছেন, এই কর্মকর্তারা ‘নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী’ হওয়ায় তাদের প্রত্যাহার করা দরকার। র্যাবের ডিজি ও ডিএমপি কমিশনারসহ পুলিশ প্রশাসনের ৭০ জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে তাদের ভোটের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, নাটোর, নওগাঁ, চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, খুলনা, ভোলা, বরিশাল, সিলেট, শেরপুর, ময়নসিংহ, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার পুলিশ সুপারের নাম রয়েছে ওই তালিকায়।
আলাল বলেন, ‘আমরা ঢালাও অভিযোগ করি না। আজকে লিখিতভাবে সব তথ্য প্রমাণসহ দিয়ে গেলাম।… ভবিষ্যতে যাতে এসব কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তারা এখনো নৌকার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা নির্বাচন আচরণবিধির লঙ্ঘন। এখনো গণহারে গ্রেপ্তার চলছে। গতকাল রাতেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়, যার মধ্যে আমাদের মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীরাও রয়েছে। এমন প্রার্থীও রয়েছে যারা মনোনয়ন বোর্ডে হাজির হতে পারেননি।’
মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘সিইসি আজ নিরপেক্ষ থাকার জন্য পুলিশকে আহ্বান জানিয়েছেন। আহ্বান জানানো মানে অনুরোধ করা। তিনি তো নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘সরকারের এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে তাঁদের কাছে দালিলিক কাগজপত্র উপস্থাপন করেছি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা যে কাজগুলো করতে পারেন না, সে কাজগুলো অনবরত করা হচ্ছে। তার কয়েকটি উদাহরণ তাঁদের কাছে তুলে ধরেছি এবং প্রতিকার চেয়েছি।’
ভবিষ্যতে যাতে এসব কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে বলে জানান মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা যেগুলো আমাদের চোখে পড়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি হলো মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। ওনার পুত্র বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী। বঙ্গভবনে এলাকার লোকজন নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং সেখানে তাঁদের রাষ্ট্রীয় খরচে আদর-আপ্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো প্রভাব বিস্তারের একটা অন্যতম উদাহরণ হিসেবে আমরা মনে করি।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এনটিএমসি ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) বিতর্কিত দলকানা কর্মকর্তা–কর্মচারীরা আছেন বলে মনে করেন মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিরা কিছুদিন আগে থেকেই কার্যক্রম শুরু করেছেন। তারেক রহমানের স্কাইপ কথোপকথন বন্ধ করেছেন। গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের আশপাশে ইন্টারনেট কার্যক্রম বন্ধ করেছেন, যেটাও আচরণবিধির লঙ্ঘন।
বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার এখনো চলছে। গতকাল রাতেও বিভিন্ন জায়গায় গ্রেপ্তার হয়েছে। তার মধ্যে আমাদের মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও রয়েছেন। পোস্টার, বিলবোর্ডসহ প্রচারণাসামগ্রী সরানোর যে নির্দেশনা কমিশন থেকে দেওয়া হয়েছিল, তা কাজে আসেনি। এখনো ঢাকা শহরের বহু জায়গায় নৌকা ও লাঙ্গলের পোস্টার রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছি। উপরন্তু, সিটি করপোরেশন ও আরও কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সরকারের উন্নয়নকাজের নামে নৌকার পক্ষে প্রচারকাজ অবিরাম চালানো হচ্ছে। এটা বন্ধ করার দাবি করা হয়েছে।’
আলাল আরো বলেন, ‘আমি গতদিনও আপনাদের (সাংবাদিক) বলেছিলাম, খুলনার হরিনঘাটা থানার কিছু তথ্য আমাদের কাছে দালিলিকভাবে এসেছে। সেটাও আমরা আপনাদেরকে (সাংবাদিক) দেব। এখানে ওইভাবে নির্বাচন কর্মকর্তার নাম লিখে পাশে লেখা হয়েছে আওয়ামী লীগ, নাম লিখে পাশে লেখা হয়েছে বিএনপি, নাম লিখে পাশে লেখা হয়েছে জামায়াত। এটা করেছে পুলিশের বিশেষ শাখা। অর্থ্যাৎ স্পেশাল ব্রাঞ্চ। তারা সেই চিঠি আদান-প্রদান করেছে, সেটা কপি আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে।’
বিএনপির ঢালাও অভিযোগ আমলে নেওয়া হবে না- ইসি সচিবের এম বক্তব্যের পর বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট আলাদা চিঠিতে নাম ধরে ধরে এই অভিযোগ দিল। তবে এ বিষয়ে কমিশনের কোনো বক্তব্য এখনও সাংবাদিকদের জানানো হয়নি।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর ভোট হবে। তার আগে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত।


