- কাজী আবুল কালাম
ইসলাম অর্থনৈতিক সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠালগ্নে কোনো অবস্থায় অপচয় অনুমোদন করে না। বরং অপচয় রোধে সর্বোতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তার অনুসারীদের উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআনের সূরা মুমিনের ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ্ অপচয়কারী ও মিথ্যাবাদীকে পথ প্রদর্শন করেন না।’
একজন কবি এ সম্পর্কে বলেছেন,
যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি,
আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ ভাতি।
অর্থাৎ আজ যে অপচয়কারী ও বিলাসী, কাল সে ভিখারী ও পরমুখাপেক্ষী। এটা ব্যক্তি জীবনের মতো রাষ্ট্রীয় জীবনেও সত্য।
সব মিলিয়ে ইসলাম মানুষকে ভারসাম্য রক্ষা করে চলার উপদেশ দেয় এবং ঐশী অনুগ্রহের ব্যাপারে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন ও অর্থ-সম্পদের সদ্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। মিতব্যয় মানুষের সম্পদকে বৃদ্ধি করে এবং অন্যকে সাহায্য করার পথ উন্মুক্ত রাখে। মিতব্যয়ীরা কখনোই নিঃস্ব হয় না। অপচয় ও অপব্যয়ের কারণে মানুষ ইহকাল ও পরকাল দুটোই হারায়। আমরা যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ ইসলামের ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মনীষীদের জীবন প্রণালী বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব তাদের সবাই সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। তারা কখনোই ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়েননি। অর্থ-সম্পদ অপচয় ও অপব্যয় না করে মানুষকে বেশি বেশি দান করেছেন।
বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কলিন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ছোট ছোট ব্যয় সম্বন্ধে সাবধান হও। একটি ছোট ছিদ্র মস্তবড় জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে।’ মিতব্যয়ী হলে সঞ্চিত অর্থ যেমন দুঃসময়ে অনেক বড় কাজে আসতে পারে, তেমনি অপচয়ে সম্পদের পাহাড়ও নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। তাই বলে মিতব্যয়িতা মানে কৃপণতা নয়। আয়েশি বা ভোগবিলাসী জীবন যাপন না করে আগামীর জন্য সঞ্চয় রেখে প্রয়োজনীয় খাতে খরচ করাই মিতব্যয়িতা।
পরিবার ও জাতির কল্যাণে মিতব্যয়ী হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর সারা বিশ্বে একই সঙ্গে পালিত হয় ‘বিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস’। ১৯২৪ সালে ‘মিলানে’ অনুষ্ঠিত বিশ্বের বিভিন্ন সঞ্চয় ব্যাংকের প্রতিনিধিদের প্রথম বিশ্ব কংগ্রেসে গৃহীত এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিবসটি পালন শুরু হয়। সেই থেকে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনে শিশুদের হাতে একটি ব্যাংক উপহার দিয়ে বলা হয় প্রতিদিন তার বাড়তি খরচ থেকে কিছু সঞ্চয়ের জন্য।
মূলত মিতব্যয় ও সঞ্চয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশেও সরকারিভাবে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয় এবং জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তর এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। জাতীয় উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধি অতি গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের দুটো বিকল্প পন্থা রয়েছে। যথা: ১. স্বেচ্ছায় সঞ্চয় এবং ২. কর সংগ্রহের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সঞ্চয়। অর্থনীতিবিদদের অভিমত অনুযায়ী স্বেচ্ছায় সম্পদ যত বৃদ্ধি পাবে কর বা রাজস্ব আয়ের উপর নির্ভরশীলতা তত হ্রাস পাবে। এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো তাদের উন্নতি সাধন করেছে। সমৃদ্ধি ও সম্পদের জন্য সঞ্চয়ের মনোভাব মানবজীবনে একটি অপরিহার্য বিশিষ্টগুণ।

বর্তমান বিশ্বায়নের এই প্রযুক্তি নির্ভর যুগে সঞ্চয় এখন আর সনাতনী ধারণায় সীমাবদ্ধ নেই। যে কোন হালাল পন্থার সঞ্চয়ই অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। একটি প্রচলিত ইংরেজি প্রবাদের বঙ্গানুবাদ হলো, অর্থ আয় করা কঠিন কিন্তু ব্যয় করা সহজ। মানুষ আয়েশি জীবন যাপনের জন্য কিছু অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করে, যা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলকর নয়। আমরা আমাদের চারপাশে খোলা চোখে যদি তাকাই তাহলে আমাদের নজরে আসে এমন কিছু অপ্রত্যাশিত দৃশ্য যা সত্যিই বেদনাদায়ক। দেখা যায় কেউ জীবন দিয়ে পরিশ্রম করেও দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খেতে পায় না। আবার কেউ কেউ মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও গৃহহীন বা ভূমিহীন। কেউ বেকার ও সহায়সম্বলহীন। তারপরও মানুষ বেঁচে থাকার নিদারুণ অভিলাষে নানাভাবে বিভিন্ন কৌশলে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক বা মহাজন কর্তৃক উচ্চহারে সুদ দেয়ার নিমিত্তে এখনো ঋণ দানের প্রবণতা বিদ্যমান। এসব বিষয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঋণগ্রস্ত হয়ে অসংখ্য পরিবার সর্বস্ব হারানোর দৃষ্টান্ত রয়েছে। আর এই দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি। কেননা এই সব দেশের একটি বৃহৎ অংশ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। অশিক্ষিত লোককে ঠকানো যেমন সহজ, তেমনি তাদের কম বা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করিয়ে নেওয়াও সহজ। আবার কর্মক্ষেত্রের অপ্রতুলতার ফলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার অবমূল্যায়নও হচ্ছে। অথচ ক্ষুদ্র সঞ্চয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের জীবন পরিচালনা অসম্ভব নয়।
কৃপণতা হলো, যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ব্যয় না করা। এ কারণে ইসলামে অপচয় ও অপব্যয়ের মতো কৃপণতাও নিষিদ্ধ।
অপরদিকে সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে আছে সীমাহীন অর্থ। তারা এমন সব যথেচ্ছ ব্যয় নিয়ে মশগুল থাকে যা খুব সহজেই পরিহার করা যায়। আমোদ-প্রমোদ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজার হাজার অতিথি আপ্যায়ন প্রভৃতির ব্যয়ভারে প্রচুর অর্থের ব্যাপক অপচয় সাধিত হয়। অন্য যে কোনো হাতেরই হোক তার অপব্যয় রোধ ও সঞ্চয় ব্যক্তি, সমাজ এবং সর্বোপরি জাতির জন্য কল্যাণকর। এই সঞ্চিত অর্থ ব্যবহৃত হতে পারে যে কোন উন্নয়নমূলক কাজে, যা দিতে পারে স্বনির্ভরতা। স্বনির্ভরতার জন্য অপব্যয় পরিহার ও সঞ্চয় অপরিহার্য। সঞ্চয়ের মনোভাব একটি মানুষের অত্যন্ত ভাল গুণ। হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে সঞ্চয় করার অভ্যাস গড়ে তুলেছে। এটি অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে এখনো অনেকেই লালন করছে।
ইসলামী অর্থনীতিতে অপচয় ও অপব্যয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অপচয় বা অপব্যয় শুধু যে আর্থিক ক্ষতিই ডেকে আনে তা কিন্তু নয়। অপচয়ের কারণে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও আরও অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে মানুষের। মানুষের আয়ু নির্দিষ্ট। একজন মানুষ সর্বোচ্চ ১২০ থেকে ১২২ বছর বেঁচে থাকে। আর মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর। কাজেই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই অতি মূল্যবান। কেউ যদি তার এই সময়টাকে সঠিকভাবে কাজে না লাগিয়ে তা অবহেলায় কাটিয়ে দেয়, তাহলে এর চেয়ে ক্ষতিকর আর কিছুই হতে পারে না। বর্তমানে আমরা নানাভাবে সময় অপচয় করছি। বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলোর বড় বড় শহরের মানুষজনের এখন প্রতিদিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কাটে ট্রাফিক জ্যামে পড়ে। এ জন্য ব্যক্তির চেয়ে সরকারের অব্যবস্থাপনাই বেশি দায়ী। তবে জনগণের যেহেতু ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচনের অধিকার রয়েছে, সে কারণে কেউই এর দায় এড়াতে পারবে না। অনেকে কম্পিউটার গেম খেলে, ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং টেলিভিশন দেখে সময় কাটাতে দেখা যায়। অনেকে এক্ষেত্রে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রতিটি মানুষই বিনোদনের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু মাত্রতিরিক্ত কোনো কিছুই শুভকর নয়। আসলে মানুষের জীবনের একেকটি মুহূর্ত একেকটি সুযোগ। কারোরই উচিত নয় একটি মুহূর্তও অপচয় করা।
মানব সম্পদ ও শক্তিকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার না করাও এক ধরনের অপচয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন ব্যক্তি যে কাজে অধিক পারদর্শী তাকে দিয়ে সে কাজ না করিয়ে অন্য কাজ করানো হচ্ছে অথবা অধিক পারদর্শী লোককে উপযুক্ত কাজে নিযুক্ত করা হচ্ছে না। এর মাধ্যমে অপব্যয় ও অপচয় বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে অনুপযুক্ত স্থানে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিরা অনিচ্ছাকৃতভাবে সম্পদ অপচয় করছে। পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক না হওয়ার কারণে প্রতি বছর ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। এছাড়া অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে প্রতিদিনই বহু খাদ্য ও জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে।
কৃপণতা মানুষকে জান্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
ধূমপানসহ সব ধরনের নেশাই মারাত্মক অপচয়। এর ফলে স্বয়ং ধূমপায়ী বা মাদকসেবীর পাশাপাশি তার আশেপাশের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাভাবিক ভাবেই যা কিছু মানুষের জন্য ক্ষতিকর তার সবই অপচয় ও অপব্যয় হিসেবে গণ্য। আরেকটি বিষয় এখানে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি আর তা হলো, মিতব্যয় আর কৃপণতা কিন্তু এক নয়। মিতব্যয় হচ্ছে যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু ব্যয় করা ও সম্পদের অপচয় না করা। কিন্তু কৃপণতা হলো, যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ব্যয় না করা। এ কারণে ইসলামে অপচয় ও অপব্যয়ের মতো কৃপণতাও নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ক্ষুধার্তকে খাদ্যদান, বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান, অভাবগ্রস্তকে সাহায্য প্রদান, অনাথ-ইয়াতিমদেরকে লালন-পালন, নিঃস্ব ব্যক্তিদের উপার্জনের ব্যবস্থা করা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করাকে মুসলমানদের কর্তব্য বলে ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু কৃপণতা তা করে না। এ কারণেই কৃপণতা মানুষকে জান্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সূরা আল মুদ্দাসসিরের ৪২, ৪৩ ও ৪৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘কি কারণে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে? তারা বলবে, আমরা নামাজ পড়তাম না এবং আমরা অভাবগ্রস্তদের আহার্য দিতাম না।’
আসলে কৃপণ ব্যক্তিরা এমন এক গাধার মতো যার পিঠে থাকে মনি-মাণিক্যের বোঝা এবং পেটে থাকে শুধু শুকনো খড়।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের নাগরিকদের জন্য মিতব্যয়িতা অত্যাবশ্যক। এদেশে অপচয়ের অভ্যাস সাধারণতই বেশি পরিলক্ষিত হয়। অপচয়কারীরা নিজের জন্য তো নয়ই বরং সমাজ, পরিবার ও জাতির জন্যও কিছু করতে পারে না। উল্লেখ্য, সঞ্চয়ের জন্য প্রয়োজনের নেই। প্রত্যেক মানুষের একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন থাকে। এই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় প্রত্যয়। দৃঢ় প্রত্যয় থেকেই গড়ে ওঠে হালাল সঞ্চয়ের প্রবণতা।


