পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ভারতে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িকতা ও ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধে রাজপথে আন্দোলনের পন্থা পরিহার করে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার পথ অবলম্বন করতে পরামর্শ দিয়েছেন দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষাপ্রধান, জানেশীনে শাইখুল ইসলাম, ক্বায়িদে মিল্লাত হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানী।
শনিবার (২৮ মে) ভারতের দেওবন্দে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘এ কেবল আমার একার কথা নয়, এটা জমিয়তের পয়গাম, জমিয়তের পূর্বসূরী বুযুর্গদের পয়গাম।’
পূর্বসূরী আলেমগণের কর্মপন্থা তুলে ধরে মাওলানা আরশাদ মাদানী বলেন, স্বাধীনতার আগে-পরে ভারতীয় মুসলমানদের নানাবিধ সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে, কিন্তু আমি একথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমাদের পূর্বসূরী উলামায়ে কেরাম, আল্লাহ যাদেরকে প্রখর দূরদর্শিতা দান করেছিলেন, তাঁরা প্রশান্তচিত্তে সমস্ত সংকট মোকাবেলা করেছেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর সংখ্যালঘু মুসলমানদের যেসব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, সেসব সংকট মোকাবেলায় আমাদের পূর্বসূরী আলেমগণ কখনই রাজপথে আন্দোলন করেননি।
শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা তাঁদের ইতিহাস দেখুন, আমাদের পূর্বসূরী আলেমরা, যারা বৈপ্লবিক জীবনযাপন করেছেন, নিজের প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে সংগ্রাম করেছেন, স্বাধীনতার পর যখন বাবরী মসজিদ সংকট সামনে এলো, তাঁরা কিন্তু তখন রাজপথে আন্দোলন করেননি। স্বাধীনতার পরপর একবার ঈদুল আযহার সময়, কুরবানী দেয়ার উদ্দেশ্যে আমাদের দেওবন্দে যতগুলো গরু রাখা ছিলো, ঈদের আগের রাতে পুলিশ এসে এলাকার সবগুলো গরু নিয়ে গেল। কিন্তু আমাদের পূর্বসূরী আলেমগণ এর প্রতিবাদে মাঠে নামেননি।
আজ ভারতে প্রতিনিয়ত অহরহ এমন ঘটনা ঘটছে, এই দেশের আজ বড় দূর্ভাগ্য যে, এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে, আর এই সাম্প্রদায়িকতার পেছনে শক্তির জোগান থাকায় তারা ধর্মের ভিত্তিতে সমাজে বিভক্তি ও ঘৃণা সৃষ্টি করছে।
সম্প্রীতি ও ভালোবাসা হতে উৎসারিত পন্থাতেই আল্লাহর সাহায্য রয়েছে জানিয়ে আল্লামা মাদানী বলেন, পূর্বসূরী আলেমদের ইতিহাস সামনে রেখে আপনাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়াটা আমি আমার অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করছি যে, আপনি যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, হতাশ না হয়ে এই অবস্থার মোকাবেলা করুন। কিন্তু এর মোকাবেলায় রাজপথে না নেমে বরং সম্প্রীতি ও ভালোবাসায় সবাইকে সিক্ত করুন। যদি আপনি এই পন্থায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন, তবে বিশ্বাস রাখুন, আপনি সফলতা লাভ করবেন। আল্লাহ তাআলার নুসরত ও সাহায্য আপনার সাথেই থাকবে।
আন্দোলনপন্থীদের প্রতি নিন্দা জানিয়ে আল্লামা মাদানী বলেন, যারা মনে করছেন যে, রাজপথে নেমে এই সংকট মোকাবেলা করবেন, তারা বিরাট ভুলের মাঝে আছেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ, মুসলমানদের ভবিষ্যৎ বরবাদ করে দিচ্ছেন। তাদের এধরণের পদক্ষেপ সাম্প্রদায়িকতাকেই উল্টো শক্তি জোগাচ্ছে।
তিনি বলেন, এটা সত্য যে, সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিরা দুনিয়াবী শক্তিতে বলিয়ান, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে, আমার-আপনার এক্ষেত্রে কী করা উচিৎ? যদি আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বার্তাকে, কুরআনের আয়াত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেয়া ফরমান সমূহ, যেসব ফরমানে মানুষের ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে নয় বরং ইনসানিয়াত ও মানবিকতার ভিত্তিতে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
আমরা মুসলমানরা যদি আল্লাহর তাওফীকে এই শিক্ষাগুলো আপন করে নেই এবং দৃঢ়তার সাথে ধারণ করি এবং কোন ব্যক্তির দ্বীন-ধর্ম কী —এ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রেখে আমরা সম্প্রীতি ও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেই, একে-অপরের সাথে ঘনিষ্ঠতা অর্জন করি, তবে আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি, সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক আল্লাহর সাহায্য আমাদের সাথেই থাকবে।
ইসলামোফোবিয়া দূর করণে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্প্রীতি ও ভালোবাসা তৈরিকেই প্রধান সমাধান চিহ্নিত করে আল্লামা আরশাদ মাদানী বলেন, ”সংকটের মোকাবেলা করতে হলে এভাবেই করতে হবে। ইনশাআল্লাহ আমরা সফল হবো, আর অগ্নিসংযোগকারীরা নিজেদের লাগানো আগুনে নিজেরাই বিলীন হয়ে যাবে। ‘পেয়ার ও মোহাব্বত’, সম্প্রীতি ও ভালোবাসা ছড়িয়ে দেয়া মানুষরাই জয়ী হবে ইনশাআল্লাহ।”


