আদিল মাহমুদ : উজবেকিস্তান মধ্য এশিয়ার একটি প্রজাতন্ত্র। ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বের মুসলিমদের কেন্দ্রবিন্দু হতে চায় উজবেকিস্তান। মুসলিমদের আকর্ষণ করার মাধ্যমে দ্বিতীয় মক্কা হিসেবে পরিচিতি পেতে চায় দেশটি। উজবেকিস্তান এর পশ্চিম ও উত্তরে কাজাকিস্তান, পূর্বে কিরগিজস্তান, দক্ষিণ-পূর্বে তাজিকিস্তান, এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। উজবেকিস্তানের পশ্চিম অংশে দেশটির প্রায় ৩৭% এলাকা নিয়ে স্বায়ত্বশাসিত কোরাকালপোগ প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। উজবেকিস্তানের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তাশখন্দ দেশটির রাজধানী শহর এবং শিল্প ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। উজবেকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ উজবেক জাতির লোক। উজবেক ভাষা এখানকার রাষ্ট্রীয় ভাষা।
উজবেকিস্তানে শতশত মাজার আছে যেটি দেশি-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের মুসলিমদের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু হতে চায় উজবেকিস্তান। মধ্য এশিয়ার জনবহুল দেশ উজবেকিস্তানে রয়েছে বহু পুরনো মসজিদ এবং মাজার যেগুলো বেশ ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়। সামরকান্দ এবং বুখারা শহরে এসব মসজিদ ও মাজারের বেশিরভাগ অবস্থিত। উজবেকিস্তানের লাখ লাখ মানুষ এসব মসজিদ এবং মাজারকে বিশেষ পবিত্র জ্ঞান করেন। কিন্তু দেশটির সরকার মনে করে এসব স্থাপনার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে আকর্ষণীয় করা যায়। কয়েক দশক বিচ্ছিন্ন থাকা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর উজবেকিস্তান এখন উন্মুক্ত হয়েছে।
সামরকান্দ শহরে বেশ কিছু সমাধি রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে সম্রাট তামেরলেন, জ্যোতির্বিদ উলুংবেক এবং ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচাতো ভাই কুসাম ইবনে আব্বাস-এর সমাধি রয়েছে।
জানা যায়, সপ্তম শতকে তিনি এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটিয়েছেন। এছাড়াও সামরকান্দ-এ বহু বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা এবং বিজ্ঞানীদের সমাধী রয়েছে। সামরকান্দ-এ একটি সমাধী আছে যেটি অন্য সমাধিগুলোর চেয়ে একদম আলাদা। মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে পাহাড়ের চূড়ায় এ সমাধি অবস্থিত। প্রতিদিন সকালে হাজার-হাজার মানুষ সেখানে যায়। যারা সেখানে প্রার্থনা করতে যায় তারা শুধুই মুসলিম নয়। কারণ এ জায়গায় এমন এক ব্যক্তির সমাধি আছে যিনি ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে ঈশ্বরের একজন বার্তাবাহক বা নবী হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর নাম হচ্ছে দানিয়েল।
সমরখন্দের তরুণ পর্যটক গাইড ফিরদোভাসি বলেন, মুসলিম, খ্রিস্টান এবং ইহুদিরা এখানে এসে নিজেদের ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করে। ফিরদোভাসি বলেন, সেন্ট ড্যানিয়েল (দানিয়েল) ছিলেন একজন ইহুদি। কিন্তু আমাদের মুসলিমরা তাকে শ্রদ্ধা করে। কারণ তিনি আল্লাহর একজন নবী। দিলরাবো নামের এক নারী জানান, তিনি প্রায়ই এখানে আসেন দানিয়েল-এর জন্য প্রার্থনা করতে। দিলরাবো বলেন, তিনি (দানিয়েল) শুধু ইহুদির একজন নবী ছিলেন না, তিনি সকল মানবতার জন্য ছিলেন। আমার নাতির নাম তার নাম অনুসারে রেখেছি। দিলরাবো তার মেয়ে এবং নাতিকে নিয়ে এ সমাধিতে এসেছেন। প্রার্থনায় শেষ করার পর সমাধী কাছ থেকে দেখার জন্য তিনি দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। উজবেকিস্তান মুলত একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ। দর্শনার্থীদের বেশিরভাগ স্থানীয়। দানিয়েল-এর সমাধি একটি অনন্য স্থাপনা। প্রায় ৬৫ ফুট লম্বা এ সমাধি তৈরি করা হয়েছে বালুর রং-এর মতো ইট দিয়ে।
ইসলামের মধ্যযুগে যেসব স্থাপনা ছিল, সে আদলে এ সমাধি তৈরি করা হয়েছে। পৃথিবীর যে কয়েকটি জায়গায় বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসের মানুষ আসে, দানিয়েল-এর সমাধি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। দানিয়েল-এর সমাধিতে যারা আসেন তাদের সবাই পুরনো একটি গাছ ছুঁয়ে তাদের প্রার্থনা শেষ করেন।
ইসরায়েল থেকে আসা সুজান জানালেন, আমি একজন ইহুদি। আমি এখানে প্রার্থনা করতে পারি। একজন খ্রিস্টানও এখানে প্রার্থনা করতে পারে। এ জায়টি মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি করে। মস্কো থেকে আসা ক্রিস্টিনা জানালেন, তাঁর বন্ধুরা এখানে এসেছিল অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে। তারা এখন সুস্থ, জানালেন ক্রিস্টিনা।
উজবেকিস্তানের সংস্কৃতিতে অনেক মানুষ মনে করে রোগমুক্তি পাবার জন্য এসব মাজার কিংবা পবিত্র স্থানের জাদুকরী ভূমিকা আছে। দানিয়েল-এর সমাধি ১৮ মিটার লম্বা। অনেক মানুষ বিশ্বাস করে সেন্ট ড্যানিয়েল (দানিয়েল) হয়তো অনেক লম্বা ছিলেন, নতুবা তাঁর সমাধি প্রতিবছর লম্বা হয়েছে। দানিয়েল-এর কফিনের দৈর্ঘ্য নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত আছে। উজবেকিস্তানে অনেক সমাধি আছে যেগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মানুষ সেখানে যেতে পারতো না।
উজবেকিস্তানের অনেক মানুষ মনে করে সেন্ট্রাল এশিয়ায় ইসলাম অনেক নমনীয়। এখানে ধর্মকে সহিষ্ণু-ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। মাজার দেখতে যাওয়া এবং সেখানে প্রার্থনা করা উজবেকিস্তানের সংস্কৃতির একটি অংশ বলে মনে করেন ইয়োলডোশেভ, যিনি ধর্মীয় বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন। মাজারে যাওয়া কিংবা প্রার্থনা করার সাথে রাজনৈতিক ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
উজবেকিস্তানে সাবেক স্বৈরশাসক ইসলাম করিমভ-এর জামানায় ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার হয়েছে। তিনি প্রায় ২৬ বছর দেশ শাসন করেছেন। সে সময় অনেক মুসলিমকে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে।
উজবেকিস্তানের বুখারায় বিখ্যাত সিল্ক রোড শহরে বহু মসজিদ এবং মাজার আছে। কিন্তু এখন উজবেকিস্তান পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিওয়েভ ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২০১৬ সালে ইসলাম করিমভের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় আসেন।
১৯৯০’র দশকে উজবেকিস্তানের বহু তরুণ হতাশার বশবর্তী হয়ে তালিবান এবং আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দিয়েছিল। বর্তমান সরকার মনে করে, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ধর্মের উপর তারা নতুন করে যে জোর দিচ্ছে তাতে তরুণরা উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকবে না। উজবেকিস্তানে কতগুলো মাজার আছে সেটির সংখ্যা কেউ জানে না। তবে কিছু কর্মকর্তা ধারণা করছেন মাজারের সংখ্যা দুই হাজারের কম হবে না।
এর মাধ্যমে পর্যটন খাতকে লাভজনক করা যাবে বলে মনে দেশটির সরকার। সেজন্য উজবেকিস্তানের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী এবং পণ্ডিত ইমাম বুখারি এবং বাহাউদ্দিন নকসবন্দকে এখানে সমাধিস্থ করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং ভারত থেকে অনেক পর্যটক এখানে আসতে পারে, বলছিলেন উজবেকিস্তান ট্যুরিজম কমিটির উপ-প্রধান আবদুলাজিজ আক্কুলভ। উজবেকিস্তানে পর্যটনের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ১৪ শতকের সুফি নেতা বাহাউদ্দিন নকশবন্দ-এর বিশ্বজুড়ে ১০ কোটির বেশি অনুসারী আছে।
১৯২৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত উজবেকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীন উজবেক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯২ সালে সংবিধান সংশোধন করে এটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও সোভিয়েত আমলে প্রচলিত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন রূপ আজও দেশটির আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোয় রয়ে গেছে। যদিও সংবিধানে বহুদলীয় ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, দেশটির সাবেক রাষ্ট্রপতি ইসলম ক্যারিমভ এক ধরনের স্বৈরশাসনের প্রবর্তন করেছেন, যাতে বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শিত হয় না। করিমভ বাজার সংস্কারের ব্যাপারেও ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছেন। ফলে এখনও অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রে সরকারের শক্ত নিয়ন্ত্রণ আছে।
উজবেকিস্তান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে সংযুক্তকারী বিখ্যাত রেশম পথের উপর অবস্থিত। উজবেকিস্তানের জাদুঘরগুলোতে প্রায় ২০ লক্ষের মত প্রত্নবস্তু রয়েছে, যেগুলি মধ্য এশিয়ায় প্রায় ৭০০০ বছর ধরে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। অনেক পর্যটক এই সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্বন্ধে জানার উদ্দেশ্যে উজবেকিস্তান ভ্রমণ করেন। এছাড়াও যারা সক্রিয় পর্যটনে আগ্রহী, তাদের জন্য উজবেকিস্তানের পাহাড়গুলি চড়া এবং তুষারাবৃত পাহাড়গুলিতে স্কি করার সুব্যবস্থা আছে। উজবেকিস্তানের ২য় বৃহত্তম শহর সমরকন্দ রেশম পথের মধ্যস্থলে অবস্থিত এবং এটি বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি।
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানকার অধিবাসীরা মূলত তাজিক। ৩২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহান আলেকজান্ডার এটি বিজয় করেন। সমরকন্দের প্রধান আকর্ষণ রেগিস্তান নামের এলাকা, যার চারপাশ ঘিরে আছে অনেকগুলি প্রাচীন মাদ্রাসা। এছাড়াও এখানে অনেক বিখ্যাত মসজিদ ও স্মৃতিস্তম্ভ আছে।
বিবিসি ও ইন্টারনেট অবলম্বনে


