ধর্মতলার সমাবেশে জাতীয় সংহতি অটুট রাখার আহ্বান

ধর্মতলার সমাবেশে জাতীয় সংহতি অটুট রাখার আহ্বান

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : একজন ভারতীয়’র জন্যও মাঠে-ময়দানে লড়াই করবে জমিয়তে উলামা হিন্দ। ৪ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় পশ্চিমবঙ্গের ধর্মতলা এন আর এভিনিউ’তে জমিয়তে উলামা হিন্দ পশ্চিমবঙ্গের বিশাল সমাবেশে একটি প্রস্তাবনা পেশ করে এ কথাই বলেছেন বক্তারা।

বিশাল এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী ও জমিয়তে উলামা হিন্দ পশ্চিমবঙ্গের সভাপতি মাওলানা সিদ্দীকুল্লাহ চৌধুরী।

এসময় জমিয়তে উলামা হিন্দ পশ্চিম বঙ্গের সহসভাপতি মাওলানা মঞ্জুর আলম সম্মেলনের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবে যা ছিল তা নিচে দেয়া হলো-

জাতীয় সংহতি ও সম্প্রীতিতে অবিচল থাকতে হবে। ইসলাম বলে সমগ্র মানবজাতি হলো আদি পিতা আদমের সন্তান মণ্ডলী।এ ভাবনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে, জাতীয় সংহতির বীজমন্ত্র। কিন্তু মনুষ্যসমাজের কিছু ভেদবুদ্ধি সম্পন্ন কিছু মানুষ এই ঐক্য ভাবনায় ফাটল ধরিয়ে নানা ভেদাভেদের প্রাচীর গড়ে তুলছে। এই শ্রেণিভেদের কারণ, নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করা। উঁচু জাত নিচুত জাত, সাদা কালো, নারী পুরুষ, ধনী গরিব, নানা রঙের বিভেদ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সমাজে।

ধর্মকেও একশ্রেণির মানুষ বিভেদের অস্ত্র করে তুলেছে। যদিও পৃথিবীর সকবল ধর্মই মানুষে মানুষে মিলনের কথাই বলে এসেছে। সমাজে নানা আঙিকে মানুষে মানুষে বিভেদ থাকলেও আজকের দুনিয়াতে ভাষা ও ধর্মগত বিভেদই প্রকট হয়ে উঠেছে। ভাষা ও ধর্মগত বৈচিত্র্যের নিরিখে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ অত্যন্ত শান্তির দেশ। ভারত হলো অত্যন্ত ছোট মাপের একটা পৃথিবী।

পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন বৈচিত্র্য নেই। অসংখ্য ভাষা ও ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করছেন এই দেশে যুগ যুগ ধরে। ভারতের সংস্কৃতি হলো বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সংস্কৃতি। তার মানে এই নয় যে, আমাদের দেশে জাতি ধর্ম ও জ্ঞাতির মধ্যে কোনো সংঘাত নেই। কিন্তু ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িক নিঃশব্দ বিরাগ প্রবাহ বয়ে চলেছে। তা আমরা সেভাবে খেয়াল করি না।

পাশাপাশি বসবাসকারী মানুষেরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে যে কাজ সম্পাদন করে তাতে বিভিন্ন পর্যায়ে অন্য প্রতিবেশীর সহযোগিতা তাকে নিতেই হয়। সেখানে প্রতিবেশীর জাতধর্ম বেছে নেয়া হয় না। তেমনি অন্তর থেকেও ঘৃণা করে না অনেকেই। এ কারণে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে ভুলে মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সম্প্রদায়কে উৎখাত করে দেশে শান্তি স্থাপনের চিন্তাটা একেবারেই অমানবিক ও অবান্তর। দুর্ভাগ্যের হলেও এ কথা সত্য, কিছু মানুষ আত্মা ও কুচক্রীদের প্রতিহত করেই সম্প্রীতি বজায় রেখেছে। এ কারণে মাননীয় মন্ত্রী ও প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই।

এর আগে বক্তারা বলেন, একজন ভারতীয়কে নিয়ে কেউ যদি প্রশ্ন তুলে জমিয়তে উলামা হিন্দ তাকে নিয়ে লড়াই করবে। এখানে আপসের কোনো সুযোগ নেই। আমরা বিদেশি শাসককে এখানে বরদাশত করিনি। আমরা কোনো স্বদেশি বন্ধুকে বিদেশি বানাতে দেবো না। কোনো স্বদেশি বন্ধুকে হয়রানি চক্রান্তের শিকার হতে দেবো না। সেসব বন্ধুদের জন্য মাঠে ঘাটে ময়দানে আদালতে জমিয়তে উলামা হিন্দ লড়াই করবে। আগামী দিনেও এ লড়াই আরও শক্তিশালী হবে।

শত বছরের জমিয়তের এগিয়ে চলায় কোনো বার্ধক্য আসেনি। এখনো নবযৌবন উদ্দীপ্ত এই জমিয়ত। শত বছরের ইতিহাস আমাদেরকে আরও সাহস যোগাচ্ছে। আরও সংঘবদ্ধ করছে। আরও ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানাচ্ছে।

এই শত বছরে আমরা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। সেই বিদেশি শক্তি তাদের শাসন স্থায়ী করার লক্ষ্যে আমাদেরকে ধর্মীয় বিভাজনের সুরসুরি দিয়েছিল। ডিভাইডেড এন্ড রোলের পলিসি চালু করেছিল। আমরা সেই বিদেশি শক্তির উত্থানকে লড়াই করে ব্যর্থ করে দিয়েছি।

জমিয়তে উলামা হিন্দ ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। এ দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ দেশে কোনো ধর্মীয় রাজনীতির আস্ফালন ঘটাতে দেয়া যাবে না।

জমিয়তে উলামা হিন্দ মনে করে ভারতে ধর্মীয় সুরসুরি দিয়ে এখানে রাজনীতি করা যাবে না। আমাদের মাদরাসা, মসজিদ, আমাদের জাতীয় সম্পদ রক্ষায় কাজ করে যাবো।

রাজ্য জমিয়তে উলার সহসভাপতি মাওলনা আবদুস সালাম রহীমী সম্মেলনের প্রস্তাবকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন। বর্ধমান জেলার সভাপতি মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমী এবং বর্ধমান সম্পাদকও প্রস্তাবনার সমর্থন করে তার বক্তব্য পেশ করেন।

অন্যদিকে দু’দিন পরই ”বাবরি মসজিদ ধ্বংস দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা উগ্র কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুেলার পায়তার চলেছই। আর তার পরদিন, অর্থাৎ ৭ ডিসেম্বর রাজ্যে শুরু হচ্ছে বিজেপি’র রথযাত্রা কর্মসূচি। ঠিক তার আগেই গেরুয়া শিবিরকে বার্তা দিতে মঙ্গলবার কলকাতার বুকে বড়সড় জমায়েত করে নিজেদের শক্তি জাহির করল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যাবিনেটের অন্যতম সদস্য সিদ্দিকুল্লা চৌধুরির সংগঠন জমিয়ত-ই-উলামায়ে হিন্দ।

দেশের সঙ্গে গোটা রাজ্যে সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানানোর নিদান দিলেও পরোক্ষে নরেন্দ্র মোদির দলের রাজ্য শাখার নেতৃত্বের প্রতি নির্দিষ্ট বার্তা দিতেই যে এই কর্মসূচি, সেটা এদিন বুঝিয়েছেন সিদ্দিকুল্লারা। শুধু তাই নয়, বড় জমায়েত দেখে উৎসাহিত হয়ে এদিন তাঁরা আগামী বছর ব্রিগেডে জনসভা করার কথাও ঘোষণা করেছেন। তবে সেই জনসভা লোকসভা ভোটের পরই হবে বলে জানিয়েছেন স্বয়ং মন্ত্রী।

মাওলানা সিদ্দীকুল্লাহ’র দাবি, এদিন সমাবেশে তাঁদের প্রত্যাশা ছাপিয়ে লক্ষাধিক মানুষ এসেছে। গোটা দেশ এবং এ রাজ্যে সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি রক্ষা করাই ন্যায়পরায়ণ মুসলিমদের কেন কর্তব্য, কোরান উল্লেখ করে সমাবেশে ব্যাখ্যা দেন সিদ্দিকুল্লা। পাশাপাশি এব্যাপারে মুসলিম জনতাকে সচেতন করতে তাঁরা শীঘ্রই সচেতনতা কর্মসূচিও গ্রহণ করবেন বলে জানান। তবে একইসঙ্গে প্রস্তাবিত রথযাত্রা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে কিছুটা হুঁশিয়ারির সুরে তিনি সতর্ক করে দেন বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারকে।

তিনি বলেন, বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার রাজ্যে রথযাত্রা কর্মসূচি পালন করবে বলে জানিয়েছে। যে কোনও রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় সংগঠনের নির্দিষ্ট কর্মসূচি পালনের অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু অন্য সম্প্রদায়কে আক্রমণ বা অসম্মান করে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হলে প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি দেখছেন। তাই বেশি কিছু বলছি না এনিয়ে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ব্যাপারে বাংলার একটা ঐতিহ্য রয়েছে। সারা দেশে যে বিদ্বেষের বিষ ছড়ানো হচ্ছে, তাতে বিজেপি’র এই কর্মসূচিতে রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও শান্তিপ্রিয় মানুষ কেউ যোগ দেবে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে বাংলার মহিলারা সেভাবে অংশই নেবেন না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *