পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বার্ষিকীতে ০৬ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কোলকাতায় মিছিল ও মহাসমাবেশ হয়েছে। মুসলিম ও তপশিলি-দলিত-আদিবাসীদের সংগঠন যৌথভাবে ‘সংবিধান বাঁচাও সমিতি’র ব্যানারে সংবিধান প্রণেতা ড. বি. আর. আম্বেদকরের মৃত্যুদিবস ও বাবরী মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে ওই কর্মসূচি পালিত হয়।
এর আগে ০৬ ডিসেম্বর ”বাবরি মসজিদ ধ্বংস দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা উগ্র কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ব্যাপকভাবে সারা ভারতে এই সহিংস প্রচারণা চালিয়েছিল। তারই প্রতিবাদ প্রেক্ষিতে মুসলিম ও তপশিলি-দলিত-আদিবাসীদের সংগঠন যৌথভাবে ‘সংবিধান বাঁচাও সমিতি’র ব্যানারে কোলকাতায় এই মিছিল ও সমাবেশে করেছে। কোলকাতার ওই মহামিছিল ও সমাবেশ থেকে হাজার হাজার প্রতিবাদী জনতা ‘মোদি হটাও, দেশ বাঁচাও’ বলে স্লোগানে দেন।
সমাবেশে সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান তাঁর ভাষণে বলেন, ‘ধর্ম পালনের অধিকার, মসজিদে নামাজ পড়ার অধিকার আমার দেশে দেয়া হয়েছে, সেই অধিকারকে নরেন্দ্র মোদি সরকার কোনোভাবেই খর্ব করতে পারে না। কিন্তু বিজেপি বাবরী মসজিদ ভেঙে শহীদ করার মধ্যদিয়ে সেই অধিকারকে খর্ব করেছে। আজ বাবরী মসজিদের জায়গায় তারা রাম মন্দির তৈরি করতে চায়। কিন্তু বাবরী মসজিদের জায়গায় বাবরী মসজিদ নির্মাণ হওয়াটাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত দাবি। এই দাবি আমরা বিগত ২৬ বছর ধরে জানিয়ে এসেছি।’
এর আগে জাতীয় সংহতি ও সম্প্রীতিতে অবিচল থাকতে ৪ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় পশ্চিমবঙ্গের ধর্মতলা এন আর এভিনিউ’তে জমিয়তে উলামা হিন্দ পশ্চিমবঙ্গের বিশাল সমাবেশে একটি প্রস্তাবনা পেশ করে তার উপর বক্তব্য রাখেন বক্তারা।
বিশাল এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী ও জমিয়তে উলামা হিন্দ পশ্চিমবঙ্গের সভাপতি মাওলানা সিদ্দীকুল্লাহ চৌধুরী।
এসময় জমিয়তে উলামা হিন্দ পশ্চিম বঙ্গের সহসভাপতি মাওলানা মঞ্জুর আলম সম্মেলনের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবে যা ছিল তা নিচে দেয়া হলো-
জাতীয় সংহতি ও সম্প্রীতিতে অবিচল থাকতে হবে। ইসলাম বলে সমগ্র মানবজাতি হলো আদি পিতা আদমের সন্তান মণ্ডলী।এ ভাবনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে, জাতীয় সংহতির বীজমন্ত্র। কিন্তু মনুষ্যসমাজের কিছু ভেদবুদ্ধি সম্পন্ন কিছু মানুষ এই ঐক্য ভাবনায় ফাটল ধরিয়ে নানা ভেদাভেদের প্রাচীর গড়ে তুলছে। এই শ্রেণিভেদের কারণ, নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করা। উঁচু জাত নিচুত জাত, সাদা কালো, নারী পুরুষ, ধনী গরিব, নানা রঙের বিভেদ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সমাজে।
ধর্মকেও একশ্রেণির মানুষ বিভেদের অস্ত্র করে তুলেছে। যদিও পৃথিবীর সকবল ধর্মই মানুষে মানুষে মিলনের কথাই বলে এসেছে। সমাজে নানা আঙিকে মানুষে মানুষে বিভেদ থাকলেও আজকের দুনিয়াতে ভাষা ও ধর্মগত বিভেদই প্রকট হয়ে উঠেছে। ভাষা ও ধর্মগত বৈচিত্র্যের নিরিখে আমাদের দেশ ভারতবর্ষ অত্যন্ত শান্তির দেশ। ভারত হলো অত্যন্ত ছোট মাপের একটা পৃথিবী।
পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন বৈচিত্র্য নেই। অসংখ্য ভাষা ও ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করছেন এই দেশে যুগ যুগ ধরে। ভারতের সংস্কৃতি হলো বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সংস্কৃতি। তার মানে এই নয় যে, আমাদের দেশে জাতি ধর্ম ও জ্ঞাতির মধ্যে কোনো সংঘাত নেই। কিন্তু ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িক নিঃশব্দ বিরাগ প্রবাহ বয়ে চলেছে। তা আমরা সেভাবে খেয়াল করি না।
পাশাপাশি বসবাসকারী মানুষেরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে যে কাজ সম্পাদন করে তাতে বিভিন্ন পর্যায়ে অন্য প্রতিবেশীর সহযোগিতা তাকে নিতেই হয়। সেখানে প্রতিবেশীর জাতধর্ম বেছে নেয়া হয় না। তেমনি অন্তর থেকেও ঘৃণা করে না অনেকেই। এ কারণে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে ভুলে মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।
দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সম্প্রদায়কে উৎখাত করে দেশে শান্তি স্থাপনের চিন্তাটা একেবারেই অমানবিক ও অবান্তর। দুর্ভাগ্যের হলেও এ কথা সত্য, কিছু মানুষ আত্মা ও কুচক্রীদের প্রতিহত করেই সম্প্রীতি বজায় রেখেছে। এ কারণে মাননীয় মন্ত্রী ও প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই।


