বিবাহবিচ্ছেদ ও সন্তানের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে
এ এম মোতাহের হোসেন : উচ্চবিত্ত হোক আর নিম্নবিত্ত হোক, বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের ভাষা প্রায় একই। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সালিশি আদালতে জমা পড়া বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনে দেখা গেছে, মেয়েদের বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে: যৌতুকের জন্য নির্যাতন, অন্য নারীর সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক, দ্বিতীয় বিয়ে, স্বামী-স্ত্রীর মতের বনিবনা না হওয়া, শাশুড়ির সঙ্গে দ্বন্দ্ব, স্বামীর মাদকাসক্তি ইত্যাদি। আর পুরুষের আবেদনের প্রধান কারণগুলো হলো: অন্য পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক, সংসারে মানিয়ে না চলা ও স্বামীর কথা না শোনা।
বিবাহবিচ্ছেদে ইচ্ছুক স্বামী বা স্ত্রীকে তার সিদ্ধান্তের কথা লিখিতভাবে (তালাক নোটিশ) প্রথমে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকে জানাতে হয়। যাকে তালাক দিতে ইচ্ছুক, তাকেও সেই নোটিশ পাঠাতে হয়। কারও কাছ থেকে নোটিশ পাওয়ার পর মেয়র নোটিশটি সালিশি আদালতে পাঠিয়ে দেন। এই আদালতে মেয়রের পক্ষে স্পেশাল ম্যজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলাজজ) নিযুক্ত থাকেন। আদালত বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর করার আগে স্বামী-স্ত্রী দু’পক্ষকে তিনমাসে তিনবার নোটিশ দেন। দুই পক্ষের কোনো পক্ষ বা দুইপক্ষই হাজির হলে আদালত সমঝোতার চেষ্টা চালান। সমঝোতা না হলে আইন অনুযায়ী ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়ে যায়।
সাধারণত বিবাহিত নারী-পুরুষের মধ্যে আত্মসচেতনতা অধিকহারে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নিজেদের মধ্যে যখন বনিবনা না হয়, তখন নিজে তারা আলাদা থাকে এবং আইন অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদ ঘটায়। যে কারণেই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটুক না কেন, তা পরিবার, বিশেষ করে সন্তানদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুদের মধ্যে সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়। ফলে ব্রোকেন ফ্যামিলির এসব শিশুরা জীবন এবং নিজের প্রতি হয়ে ওঠে বিতৃষ্ণ। বিষণ্নতা থেকে মাদকাশক্তিতে আক্রান্ত হয় এবং বিপথে পরিচালিত হয়ে ভয়ংকর অপরাধীতে পরিণত হয় এসব শিশুরা।
পরিবারে সন্তান সবার আগে। অনেক সময় এরাই আত্মহননের মতো জঘন্য কাজে উৎসাহিত হয়। আমাদের মনে রাখা উচিত, একজন স্বামীর হয়তো স্ত্রীকে প্রয়োজন নাও হতে পারে অথবা স্ত্রীরও প্রয়োজন নাও হতে পারে তার স্বামীকে, কিন্তু সন্তানদের মা-বাবা দুজনকেই প্রয়োজন। সন্তানদের মঙ্গলের জন্যই মা-বাবাকে সমঝোতা করে একে অন্যের ভুল ত্রুটি মেনে নিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া কর্তব্য। এটা যেমন সন্তানদের জন্য প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সমাজ, সংসার এবং জীবনের জন্যও। কাজেই বিবাহবিচ্ছেদ নয় আর কোনোভাবে এ হোক প্রতিটি পরিবারের আন্তরিক এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও সংকল্প।
লেখক : কলামিস্ট ও সমাজ বিশ্লেষক


