সরকারি পাঠ্যপুস্তকে জঙ্গিবাদের বীজ
স্কুলের শিশুরাও নিরাপদ নয় জঙ্গিবাদের ছোবল থেকে
ফয়জুল্লাহ আমান
২০২০ইং শিক্ষাবর্ষের জানুয়ারিতে বিতরণ করা হয়েছে স্কুলের নতুন পাঠ্যপুস্তক। আমি আজ আলোচনা করছি তৃতীয় শ্রেণির শিশুর জন্য লেখা ইসলাম ও নৈতিকতা শিক্ষা বইয়ের একটি মৌলিক ভুলের দিকে। বইয়ের ১৪নং পৃষ্ঠায় ইবাদতের সংজ্ঞা লেখা হয়েছে নিম্নরূপ-
“ইবাদত অর্থ আমল করা, কাজ করা, গোলামী করা। আল্লাহ তায়ালা ও রাসূলের কথামতো কাজ করাকে ইবাদত বলে। যেমন-
আমরা মানুষের সাথে কথা বলি। কথা বলার সময় মিথ্যা কথা বলি না। কেননা আল্লাহ মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথামতো কাজ করলে সবকিছুই ইবাদত। এমনকি খাওয়াপরা, চলাফেরা, ঘুমানো সবই ইবাদত।’
এখানে ইবাদতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ করা হয়েছে। আভিধানিক অর্থ একদমই মনগড়া। ইবাদত অর্থ কাজ করা বা আমল করা নয়।
ইবাদত অর্থ উপাসনা করা। আমল মানে কাজ করা। ইবাদত আর আমলে সালেহ একটির সাথে আরেকটি গুলিয়ে ফেলেছেন বই প্রস্তুতকারকগণ।
আভিধানিক অর্থের ভুল তবু সহনীয়। বিস্ময়ের বিষয় পারিভাষিক অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে উগ্রবাদীদের জনক জামায়াতে ইসলামীর গুরু মওদূদীর কাছ থেকে।
আল্লাহ ও তার রাসূলের কথামতো কাজ করলে সবকিছুই ইবাদত। খাওয়াপরা, চলাফেরা, ঘুমানো সবই ইবাদত।” আলকায়দা, আইএস, জেএমবি, হরকতুল জিহাদ, ইখওয়ানুল মুসলিমিন, জামাআতুল মুসলিমীন, হুতি, আলশাবাবসহ সব উগ্রবাদী সংগঠন মওদূদীর এ সংজ্ঞা গ্রহণ করেছে। রাজনীতি, মিছিল মিটিং সভা সমাবেশ, পারস্পরিক লেনদেন মুআমালা মুআশারা সব কিছুকে যখন ইবাদত বানানো হয় তখন ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির সুযোগ তৈরি হয় খুব সহজেই।
সবকিছু ইবাদত হলে বলতে হয় বিসমিল্লাহ বলে বায়ু ত্যাগ করলে তাও ইবাদত হবে। মানবীয় প্রয়োজনের তাগিদে যেসব কাজ করা হয় সেগুলোকেও ইবাদতের আওতাভুক্ত দাবি করা জঙ্গিবাদীদের একটা বড় আলামত। মূলত ইবাদত বলা হয় সেসব আমলকে যেখানে দুটি বিষয় থাকে।
এক. নিজের বিনয়। দুই. আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশক হয় যে আমল। যথা নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত। সবকিছুকে ইবাদত বানানো কুরআন ও সুন্নাহর সাথে স্পষ্ট সাংঘর্ষিক। আল্লাহ তার প্রিয় নবীজীকে সম্বোধন করে বলেছেন, হে নবী আপনি যখনই দাওয়াত ইত্যাদি কাজ থেকে অবসর হবেন তখনই ইবাদতের জন্য নিমগ্ন হন। (ইবন কাসির)
সমস্ত কাজ ইবাদত হলে এই বিধান অর্থহীন হয়ে যায়। নবীজী একবার আম্মাজান আয়শার সাথে শায়িত ছিলেন। হঠাৎ উঠতে উঠতে বললেন, ছাড় আমাকে আমি আমার রবের ইবাদত করব। পাঠক বুঝতে পারছেন, সব কাজকেই ইবাদত বলা স্পষ্টই কুরান হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। উগ্রবাদীদের ব্যাখ্যা শিশুদের শিখিয়ে আমরা জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারব তো? কোন পথে অগ্রসর হচ্ছে স্কুল কলেজের ধর্ম শিক্ষা? নারায়ন চন্দ্র সাহাসহ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্তা ব্যক্তিদের মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অতি সত্তর এ ধরনের ভ্রান্তিগুলি দূর করুন। আমাদের শিশুদেরকে জঙ্গিবাদে দিক্ষিত হওয়া থেকে রক্ষা করুন।
লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ, ঢাকা।


