সাক্ষাৎ । জুবায়ের হাসান জিহাদ
মধ্যরাতে এক জ্ঞান-সাধকের দরবারে
জ্ঞান ও জ্ঞানী৷ সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে এই দুই-ই সমরেখা ধরে চলছে৷ জড়িয়ে আছে আষ্ঠেপৃষ্ঠে৷ আলাদা করা কঠিন৷ সম্মান ও মর্যাদা শুধু জ্ঞান তথা ঐশী আলোকবর্তিকা ধারণকারীর জন্যেই৷ সকল সমাজে, সর্বযুগে ছিল জ্ঞানের কদর৷ আছে আজঅব্দি৷ যখন আল্লাহ আদম আ.কে সৃষ্টি করলেন তখনও তাঁকে সম্মানিত করেছেন কেবলই জ্ঞানে মহিমান্বিত করে৷ অন্যান্য আসমানি কিতাব ও পবিত্র কুরআনকে তিনি অন্যকিছু নয়; বানিয়েছেন জ্ঞানের আঁধার৷ প্রতিজন নবি ছিলেন সেকালের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী৷ সুতরাং আমরা বলতে পারি, নবিগণ সম্মানিত এ কারণে যে, তাঁরা জ্ঞানী৷
জ্ঞানপিপাসু যারা তারা ছাত্র৷ ক্ষুধার্ত যেমন উদরপূর্তির বিস্রস্ত তাড়নায় তাড়িত থাকে সব সময় তেমনি জ্ঞানের সাধককে সদা উৎকর্ণ থাকতে হয়— এই বুঝি কিছু হারিয়ে ফেললাম! যাচ্ছে বুঝি কিছু চলে! ফলে ঘুরতে হয় জ্ঞানীদের দরবারে৷ করতে হয় এমন আরো অনেক কিছু৷ এমনটি না-হলে হয়ত বা পুঁথিবিদ্যা অর্জন হবে কিন্তু জ্ঞানের যে অন্তর্নিহিত শক্তি বা কামনা বা চাওয়া —তা অর্জন হবে না৷ হতে পারে না৷ একই সাথে জ্ঞানীকে সম্মান জানানোর ফেরেশতাজাত গুণ থাকাটাও একজন আদর্শ ছাত্রের জীবনে অপরিহার্য৷ এ না-হলে সে পথ হারাবে বৈকি৷
আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ৷ একটি ঐশ্বর্যপূর্ণ নাম৷ একটি অনির্বান ইতিহাস৷ তাঁর জাতীয় সত্ত্বা এক আপাত ভিন্নরূপ-বাস্তবতায় চলমান সময়ে আলোচিত৷ ক্ষেত্রবিশেষে সমালোচিত৷ আমি এখানে কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পক্ষপাতদুষ্টুতার আশ্রয় না নিয়ে যদি বলি, তাহলে একথা বলা কখনোই দৃষ্টতাপূর্ণ কোন কথা নয় যে, তিনি এদেশের একজন বড় আলেম৷ যিনি তাঁর মেধা ও যোগ্যতায় উপমহাদেশে ইলমচর্চা ও অর্জনের নিষ্ঠাবান প্রতীক হয়ে জ্বলজ্বল করবেন আরো অনেকদিন৷ তবে তাঁর শুরুর সময়ের ধারা ও প্রচলিত সমাজের বর্তমান প্রবণতা পুরো বিপরীত একটা প্রেক্ষাপট৷ এদেশের মানুষ তাঁর কর্মপদ্ধতির বিচার করবার জায়গায় গিয়ে আসলেই দ্বিধান্বিত৷ যদিও সুপ্রকাশ্যে আমরা তাঁর বিরোধীগুষ্ঠিই দেখি বেশি কিন্তু পর্দার আড়াল বলেও তো কিছু আছে! সেসব অস্বীকার করবার সুযোগ কই?
ময়মনসিংহের একজন তালিবে ইলম হিসেবে এই শহরে যেকোন আলেম, অ-আলেম জ্ঞানী ব্যক্তির শুভাগমন ঘটলে নিজ চোখে তাঁকে অবলোকন— মনে করি, জীবনের অভিজ্ঞতার জন্য প্রয়োজনীয়৷ তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল রাতে দেখা করেছিলাম উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে বাঙালির কৃতিত্বের স্মারক— মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের সাথে৷ রাত তখন এগারোটা৷ এ সময়ও তাঁকে ঘিরে আছে স্পেশাল জনাবিশেক মানুষ৷ জামিয়া আশরাফিয়ার মেহমানখানায় তিনি অবস্থান করছেন তখন৷ চতুর্দিকে পুলিশ, গোয়েন্দা ও অন্যান্য সরকারি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রটোকল দিচ্ছেন৷ কম করে হলেও ৩০-৪০ জন হবেন৷ আমি আমার ছোট্ট জীবনে কাছে থেকে দেখেছি বাংলাদেশের দু-জন মন্ত্রীকে৷ তাঁরা আমার প্রতিবেশি ছিলেন৷ একজন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ৷ যার সাথে একাধিক ছবিও আছে আমার৷ সে এক ভিন্ন আলাপ৷ আরেকজন সাবেক ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান৷ কিন্তু এতটা পুলিশি প্রটোকল আমি তাদের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখেছি৷ ভালো লাগল একজন আলেমের শান দেখে৷ যদিও অনেক এবং অনেক কথা আছে এর পেছনে৷ থাকবেই৷ তবে একথা না-বলে উপাই নেই যে, সময়ের আবর্তে যেমন আমাদের চিন্তা-চেতনা পাল্টেছে তেমনি নানারকম বাস্তবতা তথা (হালের ভাষায়) পরিস্থিতির শিকার বলেও কথা আছে৷ এখন আপনার ইচ্ছে৷ চশমার কোন লেন্সকে এখানে কার্যকর করবেন৷
যাক, এই ভিড় ও প্রটোকল ঠেলে যেতে পেরেছি হুজুরের প্রেস সচিব মাওলানা মাসউদুল কাদির সাহেবের স্নেহধন্য ভালবাসার সুবাদে৷ দেখলাম ফরীদ সাহেব হুজুর ফোনে কথা বলছেন৷ সম্ভবত দেশের বাইরে৷ কথায় যা বুঝলাম দাম্মাম হবে হয়ত৷ কথা শেষ হলে সামনে এগিয়ে দিলেন শ্রদ্ধেয় মাসউদুল কাদির সাহেব৷ সালাম দিলাম, মুসাফাহা করলাম৷ পেছন থেকে মাসউদ ভাই বলে দিলেন, আমি তাঁকে কখনো দেখিনি তো! দেখা করতে এসেছে৷ তিনি হাসলেন৷ বললেন— কীসে পড়? বললাম৷ এরপর জিজ্ঞাসা করলেন বাড়ি কোথায়? বললাম৷
এদিকে পাশেই ছিলেন প্রখ্যাত বক্তা মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ সাহেব৷ আমি যাকে তখনো চিনতে পারিনি৷ বললেন— তোমার বাড়ি এখানে অথচ হুজুরকে এখনো দেখোনি? কীভাবে এটা হতে পারে? মজা করলেন আরকি! পরে ফরীদ সাহেব বললেন— আমার সাথে কি দেখা করবা? উনি (ইহইয়া মাহমুদ সাহেব) বড় হুজুর৷ আমি তাঁর সঙ্গেও মুসাফাহা করলাম৷ এরপর পেছনে সরে এসে বেরিয়ে এলাম৷ খুব পুলক বোধ হল৷ এত বড় আলেমের সাথে দেখা করতে পারব এত সহজে ভাবিনি আগে! মন থেকে কৃতজ্ঞ হলাম যার সুবাদে এটি সম্ভব হয়েছে৷ আমার পরম শ্রদ্ধেয় মুরুব্বি৷ লাইফ মেন্টর৷ উস্তায লাবীব আব্দুল্লাহ৷
আল্লাহ এদেশের এবং বিশ্বের সব উলামায়ে কেরামকে কবুল করুন৷ ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জু আঁকড়ে ধরে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দিন৷ আমীন৷
লেখক : সম্পাদক, দৃষ্টিকোণ


