আমার চেতনার বাতিঘর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

আমার চেতনার বাতিঘর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

আমার চেতনার বাতিঘর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

আল আমীন মুহাম্মাদ ● বন্ধু মহলে আমি অতোটা চটপটে নই। কথার ফুলঝুরিতে কাউকে তেমন মুগ্ধও করতে পারি না। তবে আমি বিশ্বাস করি, যে গুণটা আমায় তাদেরর কাছ থেকেও খুব কাছে নিয়ে গেছে তা হলো ‘উদার মনমানসিকতা’। এই মহামূল্যবান সম্পদ যে আমার আগ থেকেই পুঞ্জিভূত ছিল এমনটা নয়; বরং সুনির্দিষ্ট বয়সব্দি আমার ভাবনার জগৎ ছিল একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। একচেটিয়া মনোভাব মনে-প্রাণে চরমভাবে জেঁকে বসেছিল। চাইলেই ভাবনালোকে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় ডানা ঝাপটে সুনীল আকাশে উড়তে দিতে পারতাম না। আমার পদক্ষেপে জোর দেখলেই এক অদৃশ্য শক্তি পিছন থেকে টেনে থামিয়ে দিত আমায়। এককথায় সর্বক্ষেত্রে আমার চিন্তা ছিল সঙ্কুচিত। তবে এই শূণ্যতায় বশীভূত হয়ে আমি যে হাঁটু গেঁড়ে বসে ছিলাম এমনটা কিন্তু নয়; বরং চেতনা বিশুদ্ধিকরণের অনুসন্ধান ছিল অব্যহত। কোথায় বিশুদ্ধ চেতনার ফেরিওয়ালার তালাশ পাওয়া যায় এই চিন্তায় সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত ছিলাম। অনূকূল কোন পরিবেশ তো পাচ্ছিলামই না বরং আশেপাশের মানুষজন আমার চেতনাকে দিনদিন রুক্ষ থেকে আরো রুক্ষ করে তুলছিল।

তাঁর সাথে মুসাফা করতে পারলে হৃদয়ে কেমন যেন স্বর্গীয় এক প্রশান্তি অনুভব হতো। কি অদ্ভুত এক মানুষ! এতবড় ব্যক্তি হয়েও যেই মুসাফা করতে আসুক; ছোট কিম্বা বড়, আলেম কিম্বা গায়রে আলেম সবার জন্যই হুজুরের মুখে একচিলতে হাসি ছিল বরাদ্দ।

পরবর্তীতে শ্রদ্ধেয় এক শিক্ষকের পরামর্শক্রমে রাজধানীর জামিআ ইকরা বাংলাদেশে ভর্তি কার্য সম্পাদন করলাম। উদ্বোধনি ক্লাসে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের দিকনির্দেশনামূলক বয়ানে তাঁর চিন্তা চেতনার সাথে কিছুটা পরিচিত হওয়ার সুযোগ হলো। সেইদিনের আলোচনা আমার হৃদয়ে চরমভাবে রেখাপাত করেছিল। মনে হচ্ছিল, এখানেই নিহিত আছে আমার চেতনাকে প্রস্ফুটিত করার অন্যতম উপকরণ। এখান থেকে মণিমুক্তা হীরাপান্নার চেয়েও দামী কিছু আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ইকরার পেটার্ন পূর্ণ বুঝে উঠার সময় লাগছিল আমার। শ্রদ্ধেয় শায়েখ ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব প্রথম দিনই বলেছিলেন, ‘ইকরায় থাকতে হলে আমার চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করেই থাকতে হবে। না’হলে তেমন ফায়দা হবে বলে মনে হয় না।’ তখন থেকেই ইকরার ধুলো কণায় নিজের সত্বাকে মিশিয়ে নিয়েছি।

প্রায়ই হুজুর মাদরাসায় আসতেন। দাওরায় ঘন্টা করিয়ে আবার চলে যেতেন। হুজুরের আগমন-প্রত্যাগমন উভয়টাই লক্ষ্য রাখার চেষ্টা করতাম। তাঁর সাথে মুসাফা করতে পারলে হৃদয়ে কেমন যেন স্বর্গীয় এক প্রশান্তি অনুভব হতো। কি অদ্ভুত এক মানুষ! এতবড় ব্যক্তি হয়েও যেই মুসাফা করতে আসুক; ছোট কিম্বা বড়, আলেম কিম্বা গায়রে আলেম সবার জন্যই হুজুরের মুখে একচিলতে হাসি ছিল বরাদ্দ। এই হাসির মধ্যে রয়েছে অদৃশ্য এক শক্তি লুকানো। কত রুক্ষ হৃদয় যে এই হাসিতে কপোকাত হয়েছে এর কোন ইয়ত্তা নেই!

অন্য মাদরাসা থেকে ইকরায় পড়তে আসা সহপাঠিদের অনেকেই হুজুরকে নিয়ে নানাবিধ কানাঘুঁষা করতো। বলতো, তিনি নাকি উলামা লীগের সভাপতি। কেউ বলতো, নাস্তিকদের সহযোগি, আবার বলতো, সরকারি আলেম, আওয়ামীলীগের দালাল ইত্যাদি অদ্ভুত ট্যাগে হুজুরকে ট্যাগান্বিত করত। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, তাদের এই উক্তিগুলো সবই ছিল শুনা কথা। কোন বিশ্বস্ত সূত্র বা প্রমাণ চাইলে কখনোই তারা দিতে পারত না।

আমি কসম করে বলতে পারি, হুজুর একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, বুজুর্গ আল্লাহওয়ালা মানুষ। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, হজুর কখনো হুজুগে চলেন না। স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন না।

ছোট থেকেই অনুসন্ধান প্রিয় একজন মানুষ আমি; শুনা কথায় কখনোই কান দিতাম না। যদি সেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো; যতটুকু সম্ভব যাচাই করার চেষ্টা করতাম। সত্য হলে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করতাম। অসত্য হলে এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয় মনে করতাম। অনেকসময় বন্ধুদের মিথ্যা শুনা কথায় প্রতিবাদ করতাম। সেই খবরের সত্যতা জানতে চাইলে বিশ্বস্ত কোন সূত্র তো তারা দেখাতে পারতই না বরং উল্টো আমায় দোষারোপের রোষানলে ফেলে ‘হাড্ডি পাছলে তুর দে’র মতো অবস্থা করে ছাড়ত। কারণ তারা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। সংখ্যাগরিষ্ঠের মিথ্যে অহমিকার আস্ফালনে আমায় দগ্ধ করতে চাইত। জানতে চাইলে সবাই বলতো, অমুক আলেমের কাছ থেকে শুনেছি, তমুকে এটা বলেছে। কিন্তু বিশ্বস্ত কোন সূত্র বা প্রমাণ উপস্থিত করতে পারত না।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, একটা সময়ে এসে ইকরার মেজাজ তথা আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের চেতনার সাথে তাদের চেতনা একীভূত হওয়ার দৃশ্য আমায় বড়ই আবিভূত করতো। হুজুরের আশপাশে থাকতে পারাকে পূণ্যের কাজ মনে করতো। অথচ কিছুদিন আগেও তারা চরম বিরোধিতায় মত্ত ছিল।

ইকরার সাথে দীর্ঘ ৬ বছর যাবৎ সম্পর্ক আমার। হুজুরের গতিবিধি, চিন্তা-চেতনা সেই প্রথম থেকেই লক্ষ্য করছি। আমি কসম করে বলতে পারি, হুজুর একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, বুজুর্গ আল্লাহওয়ালা মানুষ। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, হজুর কখনো হুজুগে চলেন না। স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন না। দিলের তাকাজায় সামনে এগোন না। বরং দ্বীনের তাকাজায় সামনে অগ্রসর হন। তিনি নীতি ও আদর্শের ব্যাপারে কখনোই আপোষ করেননি। তাইতো তাঁর জীবনে কোন ব্যর্থতা নেই। যে কাজে হাত দিয়েছেন সবগুলোতে মহান আল্লাহ হুজুরকে সফল করেছেন। তাই যারা মানুষের শুনা কথায় হুজুরের বিরোধিতা বা তাঁকে মিথ্যে দোষারোপ করে বেড়াচ্ছেন তাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আসুন ইকরায়। হুজুরের সোহবতে কিছুদিন থাকুন। তারপরে না হয় যা করার করবেন। যা বলার বলবেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *